রাঙামাটি

১০৩বছর বয়সী যাত্রা শিল্পীকে সম্মাননা

ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা। কাপ্তাই সড়কের চন্দ্রঘোনা রেশমবাগান এলাকার পাহাড়ের উপরে অবস্থিত থেরওয়াদা বৌদ্ধ বিহারে শুভ কঠিন চীবর দান উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। হঠাৎ মঞ্চের পাশে দেখা মিলল বয়ঃজ্যোষ্ঠ এক লোককে। হাতে লাঠি নিয়ে প্রাণের টানে সু-উচ্চ পাহাড় ডিঙিয়ে উপভোগ করতে এসেছেন এলাকার ছেলে মেয়েদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তিনি হলেন ১০৩ বছর বয়সী রেশমবাগান এলাকার আপ্রুসী মারমা। এলাকার সকলে আপ্রুসী কার্বারী নামে তাঁকে বেশী চিনেন। এর চেয়ে তাঁর বড় পরিচয় হলো তিনি একজন স্বনামধন্য যাত্রা শিল্পী। পার্রত্যঞ্চলে যাত্রা শিল্পের একজন পথিকৃত। চলতি বছরের ৩ জুলাই কাপ্তাই উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে একজন যাত্রা শিল্পী হিসাবে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সম্মাননা প্রদান করেছেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় আপ্রুসী কার্বারীর। জানতে চাইলাম কতো বছর বয়স হতে আপনি যাত্রা পালায় অভিনয় শুরু করেছেন। বয়সের ভারে কিছুটা স্মরণ শক্তি লোপ পেলেও জানালেন ৬০ দশকে দিকে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলি পেপার মিলস লিমিটেড( কেপিএম) এর আয়োজনে চন্দ্রঘোনা কেপিএম এলাকায় মরহুম নাট্য ব্যাক্তিত্ব পরিচালক ও স্বনামধন্য অভিনেতা আমার নাট্য গুরু শেখ মতিউর রহমান এর পরিচালনায় তাঁর প্রথম যাত্রা পালায় অভিনয় শুরু। তবে সেই যাত্রার নাম বা কোন চরিত্র অভিনয় করেছেন সেই বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে না পারলেও তিনি জানান, এই পর্যন্ত তিনি ৫শত মতো যাত্রা পালা এবং মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন। তবে বেশী ভাগ যাত্রায় তিনি রাজা এবং সেনাপতির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি এবং তাঁর সাথে অভিনয় করেছেন সেই রকম কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাঁর অভিনিত বেশ কয়েকটি যাত্রা পালার নাম। বিশেষ করে ” আলো মতি প্রেম কুমার “, “রাজ সিংহাসন” , ” গরীবের মেয়ে” ” রুপবানের সংসার” ” মন্দিরে আযান”, ” গৌড়িমালা” ” জীবন্ত কবর” ” রাজমুকুট ” ” মানুষ অমানুষ ” জীবন্ত কবর” সহ অনেক যাত্রা পালায় তিনি দাপটের সাথে কখনো রাজা আবার কখনো সেনাপতির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। রাতভর হাজার হাজার দর্শক তাঁর প্রানবন্ত অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি আরোও জানান, একসময় গ্রামে গঞ্জে পাহাড়িদের উৎসব পার্বনে প্রচুর যাত্রা পালা হতো। বিশেষ করে কাপ্তাইয়ের চিৎমরম, নোয়াপাড়া, রাইখালী এবং বিলাইছড়ি, কাউখালি, রাজস্থলী উপজেলা, খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি, গুইমারা সহ বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে। আমরা সদলবলে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাত্রা পালা করতে যেতাম। আমি রাজা আর সেনাপতির চরিত্রে অভিনয় করতাম। রাতভর প্রচুর লোক সেই যাত্রাপালা উপভোগ করতো। এখন তেমন যাত্রা পালা হয় না, অনেক আগে আমি অভিনয় ছেড়েছি, বয়সের কারনে আর পারিনা। কাপ্তাইয়ের নাট্য জগতের একজন খ্যাতিমান অভিনেতা ও পরিচালক এস এম ইসমাইল ফরিদ তাঁর সম্পর্কে জানান, আপ্রুসী কার্বারী মঞ্চের একজন জাত শিল্পী। আমি ” রাজ সিংহাসন ” যাত্রা পালায় প্রথম তাঁর সাথে অভিনয় করার সুযোগ পাই। তিনি রাজার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। কাপ্তাইয়ের আরোও একজন মঞ্চের সফল অভিনেতা বেলাল আহমেদ জানান, আপ্রুসী কার্বারী আমার নাট্য গুরু। তিনি মঞ্চে আসলে অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তিনি মঞ্চ ছাড়াও মরহুম নাট্য পরিচালক শেখ মতিউর রহমান এর সাথে ” মেঘের অনেক রং ‘ এবং ” সেতু” চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। কাপ্তাইযের এই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা ও পরিচালক এবং কাপ্তাই উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির নাটক বিভাগের প্রধান আনিছুর রহমান জানান, আপ্রুসী কার্বারী হলো আমাদের প্রেরণার উৎস। তাঁদের দেখা পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − fourteen =

Back to top button