খোলা জানালালাইফস্টাইল

হায়দ্রাবাদ-হীরা মুক্তা কিংবা বিরিয়ানী!

তানিয়া এ্যানি

বর্তমান ভারতবর্ষের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী এবং ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম শহর হায়দ্রাবাদে একসময় শাসন ছিলো কুতুবশাহী মোঘল নিজামদের।১৫৯১ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ কুলী কুতুবশাহ গোড়াপত্তন করেন এই শহরের।১৬৮৭-১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দ অব্দি ছিলো মোঘল শাসনের অধীনে।তারপর ১৭২৪-১৯৪৮ অব্দি ছিলো নিজামী শাসন। ইতিহাস আর স্থাপত্যের পাশাপাশি হায়দ্রাবাদ বিখ্যাত তার বিরিয়ানীর নামে।হায়দ্রাবাদ শব্দের সাথে আমরা মানে ভোজন রসিক বাঙালীরা সম্ভবত প্রথম পরিচিত হই এই বিরিয়ানীর নামেই।

নিজামী শাসন আমলের শাসক স্যার মীর উসমান আলী খান সিদ্দিকি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের হায়দ্রাবাদ এবং বেরার রাজ্যের শেষ শাসক। যিনি ছিলেন সেই সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।১৯৩৭সালে টাইমস ম্যাগাজিনে ছাপা হয় তার ছবি।যে ছবির নিচে ক্যাপশন দেয়া ছিলো দ্যা রিচেস্ট ম্যান ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড। এই ভদ্রলোককে নিয়ে নানা তর্ক বিতর্ক থাকলেও হায়দ্রাবাদ ভারতের অংশ হওয়ার পর ভারত সরকারকে আর্থিক সহায়তা করা সহ নানা মুখী সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে তার সহায়তা স্পষ্ট।দিল্লীর হায়দ্রাবাদ হাউস ,ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়,স্টেট ব্যাংক অফ হায়দ্রাবাদ সহ বেশকিছু সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা তার মাধ্যমেই।

আর এই নিজামীদের রন্ধনশালা থেকেই তৈরি আজকের বিশ্বখ্যাত হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি।বলা হয়ে থাকে মুঘল এবং ইরানী মশলার সংমিশ্রনেই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি হয় এই বিরিয়ান।

হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানীর আসল স্বাদ  নিতেই মূলত হায়দ্রাবাদ যাত্রা হলেও নিজামী আর মুসলমানী স্থাপত্যশৈলীর আধিপত্যের ছাপ না দেখেতো ফেরা যায় না!দুপুরের খাবারে তাই স্থানীয় মানুষের সহায়তায় জানা গেলো হায়দ্রাবাদের বেশ পুরনো এবং বিখ্যাত বিরিয়ানি হাউস ‘ক্যাফে বাহার’। বিশাল লম্বা লাইন!নাম রেজিষ্টেশন করিয়ে নিয়ে এবার অপেক্ষা প্রায় বিশ মিনিট পর সিরিয়াল পাওয়া গেল ভেতরে ঢুকার। ভেতরে ঢুকে আবার অপেক্ষা সেখানেও একটা ছোট্ট সিরিয়াল।পাঁচমিনিট পর টেবিল খালি পাওয়া গেলো।উফফফ……প্রচন্ড ক্ষুদা আর অপেক্ষা মিলিমিশে আর সইছিলো না যেন।চিকেন বিরিয়ানির সাথে চিকেন কালমি কাবাব এবং ‘কুবানি কা মিঠা’ নামে মিষ্টান্ন।আর খাওয়ার পর অবধারিত ‘চা’।

বিরিয়ানি মুখে দিতেই,চোখ ছানাবড়া!অসাধারন স্বাদ আর মশলার অসাধারন মিশ্রন।খাবার শেষ করতে লাগেনি কয়েকমিনিটও! এবং সত্যি বলতে দেশে আমরা যে হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি খেয়ে অভ্যস্ত হায়দ্রাবাদে বসে আসল হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানী খাওয়ার পর কেু আর সে মুখী হবে কিনা সন্দিহান! আপাতত আমার হাতে দুদিন সময়,সুযোগ থাকলে সকালের নাস্তাতেও আমি বিরিয়ানীই খেতাম!

পেটপুঁজোতো হলো,এবার চোখ পূঁজোও সাড়তে হয়ে।হায়দ্রাবাদ শহরেও পেয়ে গেলাম সেই সুবিধা।ঘন্টাব্যাপি ভাড়া করা অটো।এইক্ষেত্রে সম্ভবত আমার ভাগ্য খুব ভালো অটো ড্রাইভার হিসেবে কিছু অসাধারন মানুষ পেয়ে যাই বরাবরই।চালক জাব্বার ভাইকে নিয়ে যাত্রা শুরু…

হায়দ্রাবাদ শহরে গরম বেশ ভালোই,জ্যামটাও। ডিসেম্বরের শীতেও গরমে ঘামে একাকার।মুসী নদীর পাড় ঘেষে গড়ে উঠা হায়দ্রাবাদ শহরের গল্প শুনাতে শুনাতে চালক জাব্বার ভাই নিয়ে চলেছেন যেকোন শহরের অবশ্যই দেখা মিউজিয়ামে।একটা জাতী একটা অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্য বৈচিত্র্য জানতে এরচেয়ে সহজ মাধ্যম আর কিছু হয়না।

সালার জাং মিউজিয়াম– মুসী নদীর দক্ষিন তীরে রয়েছে এই সালার জাং মিউজিয়াম।ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম মিউজিয়াম।নানা দূষ্পাপ্য এবং অমূল্য জিনিস সংগ্রহের নেশা থেকেই নিজাম বংশের সালার জাঙ্গ পরিবারের নবাব মীর ইউসুফ আলী খান ১৯৫১ সালে প্রতিষ্টা করেন এই সংগ্রহশালা।পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা সব জিনিস তিনি রেখে গেছেন এই মিউজিয়ামে।এই মিউজিয়ামে রয়েছে ৩৮টি গ্যালারি।স্বল্প সময়ে দেখে শেষ করা কঠিন।এখানে রয়েছে কোরআনের বেশ কিছু দূর্লভ পান্ডুলিপি। কোন জাদুঘরে ইসলামিক গ্যালারি হিসেবে ভারতে এটাই প্রথম। এছাড়া এই মিউজিয়ামে রয়েছে রয়েছে চীন-জাপানসহ প্রাচ্য-পাশ্চাত্য থেকে আনা অসংখ্য দামি মণি-মুক্তো,পর্সেলিনের পাত্র, মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ফল কাটার ছুরি, সম্রাট আওরঙ্গজেবের ‘অ্যাওয়াকেনিং অব গালাতিয়া’ মণিমুক্তো-শোভিত ছোরা, টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার, হাতির দাঁতের তৈরি নানা দামি উপকরণ,

হায়দ্রাবাদ শহরে কবুতরের অবাধ বিচরন সর্বত্র।ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর দেখা পাওয়া যায় সবখানেই।হায়দ্রাবাদের আর একটা বিষয় লক্ষনীয় মেট্রো স্টেশন থেকে মোটামুটি সমস্ত সাইনবোর্ডে নাম লিখা থাকে তিনটি ভাষায় তেলেগু, ইংলিশ এবং উর্দু!হিন্দীতেও বেশ পারদর্শী এই অঞ্চলের মানুষজন।

মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে গন্তব্য হুসেইন সাগর ।

হুসেইন সাগর ১৫৬৩ সালে ইব্রাহীম কুলি কুতুব শাহী মুসী নদীর সাথে সংযোগ রেখে হৃদয় আকৃতির এই লেক তৈরি করেন মূলত পানি সংরক্ষনের উদ্দেশ্যে।এই হৃদের মাঝখানেই রয়েছে গৌতম বুদ্ধের এক সুবিশাল মূর্তি।এই লেকটি মূলত হায়দ্রাবাদকে আলাদা করে তার পাশের শহর সেকান্দারাবাদ থেকে।লেকের দুপাশে সুন্দর রেলিং করে দেয়া।বিকেলের আড্ডা কিনবা সূর্যাস্ত দেখার আমেজটাই ভিন্ন এর পাড়ে দাঁড়িয়ে।

লেকের পাড়েই বেলা গড়িয়ে এলো।মুক্তোর শহরে এসে মুক্তো না খুঁজলেই নয়!

দ্যা সিটি অফ পার্ল-হায়দ্রাবাদ কিন্তু পরিচিত ‘মুক্তোর শহর’ নামেও।মুক্তোর ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত এই শহর।হায়দ্রাবাদ শহরে এই মুক্তোর আবাসও গড়ে উঠে সেই কুতুব শাহী এবং আসাফ জাহীর প্রচেষ্টাতেই।যাদের ছিলো নামি দামি অলংকারে প্রতি অন্য রকম নেশা।তারপর তা আরো সমৃদ্ধ হই নিজামীদের আমলে। তখনকার সময় এই মনি মুক্তা জহরত আসতো ইরাক থেকে। হায়দ্রাবাদে প্রাকৃতিক এবং চাষের দু’ধরনেরই মুক্তো পাওয়া যায়।কিনতে চাইলে আসল নকলের পার্থক্য জেনে যাওয়াই ভালো।যদিও বড় বড় শপ গুলোতে তারাই দেখিয়ে দিয়েই বিক্রি করে।বৈশিষ্ট্যে হিসেবে দামের রকমফের রয়েছে।

দিনান্তের ক্লান্তি নিয়ে আবারো রাতের খাবারে বিরিয়ানি যুক্ত করে রুমে ফেরা।রুমে ফিরে পরের দিনের প্ল্যান তৈরি।একই অটো পরদিন এসে আবার নিয়ে যাবে।সেভাবেই কথা বলে রাখা।

পরের দিন সকাল,রাতেই যেহেতু ফেরার বাস।তাই সময় বাঁচিয়ে যতখানি দেখে নেয়া যায়।

সকালের প্রথম গন্তব্য –

গোলকোন্ডা ফোর্ট– কুতুবশাহীর আমলে রাজধানী শহর ছিলো গোলকোন্ডা।সে সময় গোলকোন্ডা ছিলো ডায়মন্ডের ব্যবসায়িক কেন্দ্র।পৃথিবীর নামি দামি সব ডায়মন্ডের দেখা মিলেছিল এখানে।কোহিনূর,ব্ল হোপ,দারিয়া-ই-নূর সহ নানা মুল্যবান ডায়মন্ডের খনি সংরক্ষন এবং বেঁচা বিক্রির কেন্দ্র ছিলো এই অঞ্চল।দৈর্ঘ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই দূর্গের কাঠামো এখনো বেশ মজবুত।

তবে এখন আর ডায়মন্ডের খনি পাওয়া না গেলেও এই দূর্গ প্রায়শই দেখা যায় বলিঊড তেলেগু সহ ভারতের নানা সিনেমায়। সালমান খানের বিখ্যাত তেরেনাম মুভির বেশ অনেকতা শুটিং  হয়েছিল এই ফোর্টের ভেতরেই। অজয় দেবগনের সিংগান রিটার্ন সিনেমার গানের শুটিং সহ ভু সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবে বেশ পরিচিত এই ফোর্ট। ফোর্ট ঘুরে দেখতে দেখতে অনেকখানি সময় গেলো,এবার গন্তব্য অন্য কোথাও।

বিরলা মন্দির– ২৮০ ফুট পাহাড়ের উপর ১৩ একর জায়গা জুড়ে নির্মিত এই মন্দির।মন্দিরের পাদদেশ থেকে শহরের চিত্র স্পষ্ট। শুভ্র সাদা রঙের এই মন্দির তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে দুইহাজার টনের অধিক সাদা মার্বেল পাথর।এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী যেমন সুন্দর রাতের বেলায়ও এই মন্দিরে দেখা যায় মোহনীয় আলোকসজ্জা।

চৌমহল্লা প্যলেস- চৌমহল্লা শব্দের অর্থ দাঁড়ায় চার মহলের সমন্বয়।এই প্রাসাদ ছিলো মূলত নিজামীদের অফিসিয়া আবাসস্থল।স্থাপত্যকলার এক অনন্য স্থাপনা এই প্রাসাদ।ভেতরে এখন মিউজিয়ামের মত করে সাজানো আছে তাদের ব্যবহৃত গাড়ি ,অস্ত্র নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম আসবাব পত্র, জামাকাপড়।বিশাল বাগান কৃত্রিম ঝর্না রয়েছে সামনে।আপনি চাইলে ছবি তুলতে পারবেন সেই সময়ের আদলে তৈরি জামা কাপড় পড়েই,প্রিন্ট ছবিও পেয়ে যাবেন দশ মিনিটেই।

নিজামীদের আবাস্থল এই প্রাসাদেও প্রায়শয় হয় নাটক সিনেমা গানের শুটিং।

আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে,বেলাও প্রায় গড়িয়ে পড়েছে।

চারমিনার- মিনার সংখ্যা চারের কারনে এর নাম চারমিনার।হায়দ্রাবাদের প্রতীক হিসেবেই চারমিনারের চিত্র বেশ স্পষ্ট।অফিসিয়ালি এটি তেলেঙ্গার প্রতীক হিসেবেও স্বীকৃত।এই চারমিনারের উপরের তলায় রয়েছে মসজিদ।গোলকোন্ডা থেকে হায়দ্রাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের পর কুতুব শাহ হায়দ্রাবাদে এই চার মিনার নির্মান করে। ৪০০ বছরেরও পুরনো এই চার মিনার দাঁড়িয়ে আছে হায়দ্রাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে।এর পাশ জুড়েই গড়ে উঠেছে নানা ধরনের মার্কেট ।একটু দূরেই রয়েছে ইন্ডিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ মক্কা মসজিদ।

লাদবাজার- হায়দ্রাবাদ শুধু মুক্তার জন্যেই নয় হায়দ্রবাদ বিখ্যাত নানা ধরনের পাথরের কারুকাজ সজ্জিত অলংকারের জন্য।লাদবাজার তেমনই এক বাজার যেখানে আপনি পেয়ে যাবেন নানা ধরনের পাথরের চুড়ি,গয়না শাড়ী এবং যাবতীয় বিয়ের সামগ্রী।বহু পুরনো এই বাজার এইখানেই গড়ে উঠেছে সেই কুতুব শাহ,নিজামীদের সময়কাল থেকেই।চারমিনারের মোটামুটি আশপাশ জুড়েই ব্যাপ্তি এই বাজারের।ভীড় লেগেই থাকে সবসময়।

পেটপুঁজো চোখপুঁজো শেষ করে টুকটাক শপিংও হয়ে গেলো।একটা আফসোস রয়ে গেলো রামোজি ফিল্ম সিটি!গিনেস বুকে জায়গা করে নেয়া পৃথিবীরে সবচেয়ে বড় শুটিং সেট!করোনার জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।আফসোস ভেবে আর কি হবে।যা পেয়েছি বরং তাতেই শান্তি।

ওদিকে বেলা ডুবে সময় একদম শেষ……দুদিন ধরে সাথেই থাকা জব্বার ভাই নামিয়ে দিলেন হোটেলেই।বাস স্টোপেজ কাছেই ছিলো তাই আর উনাকে আটকে রাখিনি।মনেহলো এইটুক রাস্তা হেঁটে গেলে রাতের হায়দ্রাবাদটাকে আরো খানিকটা জানা যাবে ,দেখা যাবে।জব্বার ভাইকে বিদায় জানালাম,অসম্ভব ভালো সরল মনের একজন মানুষ।এবং অতি অবশ্যই ওইযে ভাড়া যা ঠিক করে উঠেছিলাম সেটাই কোন বাড়তি চাওয়া চাইয়ি নেই।তবুও নিজের বোধের তাগিদের বাড়িয়ে দিলাম কিছুটা।বিদায় নিয়ে রুমে ফিরলাম……ফ্রেশ হয়েই বের হতে হবে,সময় কম।

রাতের হায়দ্রাবাদের পথ ধরে হাঁটছি,গন্তব্য বাস স্টেশন।কিছুটা ক্লান্তি কিছুটা বিষন্নতা আরো অনেকগুলো সুন্দর সময়।ফিরতে হবে…ফিরতেতো হবেই না হয় নতুন গল্প পাবো কি করে!

লেখক : ব্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় উচ্চতর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button