ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

হঠাৎ পাহাড়ে কেন ছড়ালো হাম ?

পুরো পৃথিবী যখন মরণঘাতি করোনা ভাইরাস সামলাতে ব্যস্ত তখন বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের তিন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে হামসদৃশ্য রোগ । ইতোমধ্যেই পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৭ শিশু, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ১ শিশু এবং বান্দরবানের লামায় ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুধু রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় এখনো হাম সদৃশ্য এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ রয়েছে প্রায় ১৬১ শিশু।
কেন হাম ছড়াছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রাঙামাটি কার্যালয়ের মতে, এই রোগ সাধারণত বসন্তের শুরুর দিকে দেখা যায়। হাম একটি ছোঁয়াছে রোগ। একটি এলাকায় দুই একজনের হলে পুরো এলাকার শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে। যার জন্য আমরা প্রতিটি শিশুকে ৯ মাস বয়সে ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দিয়ে থাকি। পার্বত্য এলাকায় হামের টিকা দেয়া হলেও দুর্গমতার কারণে সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় হয়তো তা পৌছাঁয়নি। যদিওবা পৌঁছায় তা অনেক ক্ষেত্রে তাপমাত্রা জনিত কারণে টিকা দেওয়ার পরও অনেকক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না। এইসব দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যদি হেলিকাপ্টার ব্যবহার করা যেতো তাহলে হয়তো টিকা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হতো।
রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে যেখানে হাম ছড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে সেটি অত্যন্ত দুর্গম জায়গা। সাজেকের বিভিন্ন জায়গায় স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আগে হামের টিকা দেয়া হয়েছিল । সেখানে যারা বসবাস করেন তারা অনেকে এই টিকাটি নিতে চান না। আবার যারা নেন, তাদেরও অনেকের সারাদেশের মতো এখানেও কিছু টিকা কার্যকর হয় না।
তাদের মতে, কেউ টিকা নিতে না চাইলে তাদের জোর করে টিকা দেওয়া যায় না। আবার যেসব টিকা সেখানে পাঠানো হয় সেসব টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রেখে পাঠাতে হয়। যেহেতু দুর্গম জায়গা সেখানে যেসব টিকা যায়, তা দুর্গমতার কারণে পাঠাতে পাঠাতে অনেক সময় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে তাপমাত্রা নিদিষ্ট পরিমাণে না থাকার কারণে। যদি ছড়িয়ে পরা রোগটি হাম হয়ে থাকে তাহলে আমরা মনে করছি এই সকল কারণে টিকাগুলো কার্যকর হচ্ছে না।

রোগটি প্রতিরোধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে
ইতিমধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রাঙামাটি কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এই এলাকাটিতে হামের টিকা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। টিকা প্রদানকারীদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
রাঙামাটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যখন শুনেছি হামে উপসর্গ সংবলিত এই রোগ ছড়িয়ে পরেছে তখন আমরা মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে। সেখানে একটি অস্থায়ী মেডিকেল টিম অবস্থান করছে, তারা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত সকলে সুস্থ না হবে ততদিন তারা সেখানে থাকবে। আশার খবর গত ৬ দিনে কোন শিশু নতুন আক্রান্তের খবর নাই সেখানে। সবাই সুস্থ হয়ে গেলে আমরা সেখানে ১ বছর থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। যেহেতু সেখানে এখনো অনেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়নি তাই এখন দিতে পারছি না।
রাঙামাটি বাঘাইছড়ি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান হাবিব জিতু জানান, সাজেক ইউনিয়নের যেসকল পাড়ায় হামের পার্দুরভাব ছড়িয়ে পরেছে সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুইটি চিকিৎসক টিম সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে আক্রান্ত শিশুদের, পুরোপুরি সকল সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ করে যাবে।
রাঙামাটির বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার টিকা বিষয়ক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: জয়ধন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, আমরা বিষয়টি জানার পর থেকে তা মোকাবেলায় কাজ করছি। ইতোমধ্যেই সেই স্থানগুলোতে হামের টিকা প্রদানের জন্য কাজ করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহে হামের টিকা প্রদানের কাজ শুরু করা হতে পারে।
রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা জানিয়েছেন, বাঘাইছড়ি উপজেলার বেশ কিছু গ্রামে গত কয়েকদিনে যে কয়েকজন শিশু মারা গেছে তারা আসলে হাম রোগে মারা গিয়েছে কিনা সেটা আমরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত নই। আক্রান্ত শিশুদের থেকে আমরা ইতিমধ্যে নমুনা সংগ্রহ করে তা হাম নাকি, অন্যকোন রোগ তা পরীক্ষা করার জন্য ঢাকাই পাঠিয়েছি। সেখান থেকে রিপোর্ট আসলে বলতে পারবো সেটা হাম কিনা। তবে এটি হাম সদৃশ্য রোগ। আমরা এই রোগটিকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিয়েছি। সেখানে অস্থায়ী মেডিকেল টিম কাজ করছে।

প্রসঙ্গত, গত ২০মার্চ রাঙামাটির সিভিল সার্জনের দেয়া তথ্য মতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের শিয়ালদহে গ্রামে সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল ৫ শিশু। তখন সাজেক ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী তিনটি গ্রাম অরুনপাড়া, নিউথাং পাড়া এবং হাইচপাড়ায় হামের পাদুর্ভাব সংবলিত এই রোগে আক্রান্ত ছিল আরো শতাধিক শিশু। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় মারা গেছে আরো দুই শিশু। ইতিমধ্যে গত ২৫মার্চ বিকালে গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় পাঁচ শিশুকে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সহায়তায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) নেয়া হয়েছে। বর্তমানে এই পাঁচ শিশু সুস্থ রয়েছে বলেও জানা যায়।
তার আগে ১৩ মার্চ বান্দরবানের লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পুরাতন লাইল্যা মুরুং পাড়ায় হামসদৃশ রোগে দুতিয়া মুরুং(৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে একই রোগে আক্রান্ত হয় ঐই এলাকার আরো বেশ কিছু শিশু, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা পরবর্তী বর্তমানে তারা সুস্থ আছে বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ গত শনিবার (২৮মার্চ) খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার রথিচন্দ্র কারবারি পাড়ায় ধ্বনিকা ত্রিপুরা (৯) নামে এক শিশু মৃত্যু হয় হামসদৃশ আক্রান্ত হওয়ার কারণে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায় ঐই পাড়ায় আরো অর্ধশত শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button