নীড় পাতা / ফিচার / অন্য আলো / স্বীকৃতি না পাওয়া এক মুক্তিযোদ্ধার কথা
parbatyachattagram

স্বীকৃতি না পাওয়া এক মুক্তিযোদ্ধার কথা

আমার বাবা স্বদেশ রঞ্জন বড়ুয়া বার বার একটি কথাই বলতেন ‘মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি দেশের জন্য, সনদ বা কোন সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়’। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য যেসব দলিল প্রমানাদী ছিল তিনি সেগুলো সব সময় লুকিয়ে রাখতেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে আমার বার বার আকুতির পর তিনি দলিলপত্র গুলো তিনি আমাকে দেন। দলিলপত্র গুলো দেখে আমি নিজেই হতবাক। মিজো জেলার দেমাগ্রীতে মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থী ক্যাম্পে দায়ীত্ব পালনকালীন সময়ে ভারত সরকারের সব দলিলই রয়েছে। আমার অনেক অনুরোধের পর ২০১৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রধান মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন। দূর্ভাগ্যবশত আবেদন করার এক বছর ৫ মাস পর ২০১৮ সালের ২৬ মে আমার বাবা স্বদেশ রঞ্জন বড়ুয়া অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। যে দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন সে মাতৃভূমির লাল সবুজের পতাকা তাঁর কফিনে স্থান পায়নি। একমাত্র কারণ মুক্তিযোদ্ধ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি না থাকা। জানি না আমার বাবার মতন স্বীকৃতি না পাওয়া দেশে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। কেউ মারা গেছেন বা কেউ জীবিত রয়েছেন। তাঁদের ভাগ্যেও হয়তো লাল সবুজের পতাকা কফিনে স্থান পাবে না। দেশে আবার ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও কম নয়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার দাপট আরো অনেক বেশী। জানি না প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা (যারা এখনো স্বীকৃতি পাননি) কখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। তবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অবশ্যই স্বীকৃতি পাওয়া পয়োজন, রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে।
আমার বাবার মুখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার গল্প শুনেছিলাম। যা শুনেছি তা তুলে ধরলাম। স্বদেশ রঞ্জন বড়ুয়া, পিতা- মৃত বিশ্ব নাথ বড়ুয়া, মাতা-মৃত সুপ্রভা বড়ুয়া, গ্রাম-কাঁঠালতলী পাড়া, পোষ্ট ও উপজেলা:- দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঠিকানা :- মহামুনি পাহাড়তলী, পোষ্ট ও উপজেলা :- রাউজান, জেলা:- চট্টগ্রাম। মুক্তিযোদ্ধাকালীন সময়ের বয়স ছিল ২২ বছর। ১৯৭১ সালে ম্যালেরিয়া অধিদপ্তরের রাঙামাটি জেলার বরকল থানায় সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তান সরকারের চাকরী ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য টেগামূখ পাহাড় পার হয়ে ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ দেমাগ্রী যুব ক্যাম্পে পৌঁছান। এবং তৎকালীণ আসাম রাজ্যের মিজো জেলার দেমাগ্রীর দায়ীত্বপ্রাপ্ত সহকারী ডেপুটি কমিশনার সি নাগের কাছে রিপোর্ট করেন। তাঁর সঙ্গীয় ছিল বরকল থানার তৎকালীণ সার্কেল অফিসার, পুলিশের কর্মকর্তা, ফরেষ্ট রেঞ্জার, পুলিশ সদস্য জবরদস্ত খাঁন, সুনীল বড়ুয়াসহ আরও অনেকে। তাঁর ভারতের রেজি নং-১৫০৮৫০। সে সময় তিনি স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাঁকে একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশী শরণার্থী ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ক্যাম্পের দায়ীত্ব পালনের জন্য বলা হয়। তিনি দেমাগ্রী ইয়থ ট্রানজিট ক্যাম্প ও সহকারী ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশনাক্রমে দেমাগ্রী ডিসপেনসারীর দায়ীত্বপ্রাপ্ত সহকারী সার্জন ডা. কে. এন শর্মার অধীনে মুক্তিযোদ্ধাকালীন সময়ে ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইংরেজী তারিখ পর্যন্ত দায়ীত্ব পালন করেন। দেমাগ্রীতে দায়ীত্ব পালনকালীণ সময়ে দীঘিনালা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক হারুণ অর রশিদ ও মৃত মুক্তিযোদ্ধা মিলন বড়ুয়ার সাথে তাঁর নিয়মিত দেখা স্বাক্ষাত ও কথা হতো। দেশ স্বাধীন হলে তিনি ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলার সরকারের নির্দেশনায় পুনঃরায় রাঙামাটি জেলায় ম্যালেরিয়া অধিদপ্তরে কাজে যোগদান করেন। এবং সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদেরকে ৯ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়। তিনিও নয় মাসের সরকারি বকেয়া বেতন পান। তিনি দীর্ঘ বছর চাকরি করার পর অসুস্থ্যতা জনিত কারণে ২০০২ সালে সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হতে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন সনদ ও সুযোগ সুবিধা নেননি।
ওপরের কথা গলো বললাম এই কারণে আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার যে স্মৃতিচারণ করেছিলেন তাঁর দলিল দস্তাবেজ আমি মিলিয়ে দেখেছিলাম। ওনার স্মৃতিচারণ গুলো ছিল দালিলিক প্রমাণসহ। আমার এই লেখার একটিই কারণ। তা হলো যারা প্রকৃতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাঁদেরকে যাচাইবাছাই করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হোক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যেন রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত না হয়। আমার বাবা স্বদেশ রঞ্জন বড়ুয়া হয়তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকায় মৃত্যুকালে সস্মান পাননি। আমার বাবার মতন অসংখ্য স্বীকৃতি না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তাঁরা যেন কোন ভাবেই মৃত্যু কালে রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত না হন। জয় বাংলা, বাংলার জয়।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

যুথবদ্ধ এক বিকেল রাঙামাটির স্বেচ্ছাসেবীদের

রাঙামাটির সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যুথবদ্ধভাবে পালন করছে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস ২০১৯। কাটিয়েছে নিজেদের মত …

Leave a Reply