পাহাড়ের রাজনীতিব্রেকিংরাঙামাটিলিড

স্বাস্থ্যবিধি ‘উপেক্ষা’ করে ছয়শ গাড়ীর ‘শো-ডাউন’ রাঙামাটি শহরে

প্রথম দিনেই ‘নিয়ম ভাঙ্গলেন’ নতুন চেয়ারম্যান !

করোনার কারণে বড় ধরণের জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে সরকার,কিন্তু রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে সোমবার লংঘিত হয়েছে সরকারি সেই নির্দেশনাই !

করোনা’য় সরকার নির্দেশিত ‘স্বাস্থ্যবিধি’ উপেক্ষা করে ‘শত শত দলীয় নেতাকর্মীর’র গাড়ী বহর আর শো-ডাউনে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন অংসুই প্রু চৌধুরী।
সোমবার সকালে তার নিজের উপজেলা কাউখালী থেকে কয়েকশ মোটর সাইকেল আর কার,মাইক্রো,জিপসহ বিভিন্ন গাড়ীতে শত শত নেতাকর্মী আর রাঙামাটি শহর থেকে যুক্ত হওয়া নেতাকর্মীরা মিলে জেলা পরিষদ চত্বরকে উৎসবমুখর করে তোলেন। এসময় মিছিলে শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠে পুরো চত্বর। তবে এইসব আয়োজনে ছিলোনা স্বাস্থ্যবিধি পালনের ন্যুনতম কোন চিহ্ন,কারো কারো মুখে মাস্ক থাকলেও সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিলো থুতনির নীচে ঝোলানো !

কাউখালী থেকে আসা কয়েকশ মানুষের এই মোটর সাইকেল ও গাড়ী বহরটি শুধু জেলা পরিষদ চত্বরে এসেই থামেনি,শহর প্রদক্ষিন করে শহীদ মিনারেও নিয়ে যায় চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরীকে। পুরো ঘটনায় বিস্মিত রাঙামাটি শহরবাসি। সচেতন মহল দাবি করছেন, এই ধরণের ঘটনা অনভিপ্রেত এবং অন্যদের ‘মাস্ক পরিধান না করা’ ও ‘স্বাস্থ্য বিধি মেনে না চলা’য় উৎসাহিত করবে।

নতুন কিংবা বিদায়ী,কোন চেয়ারম্যানের মুখেই নেই মাস্ক ! মাস্ক নেই সেখানে থাকা রাঙামাটির পৌর মেয়র ও কাউখালি উপজেলা চেয়ারম্যানের মুখেও !

এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করলে কাউখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দোহা চৌধুরী বলেন, প্রায় ৫০০ মোটর সাইকেল এবং বেশ কিছু অন্যান্য গাড়ী নিয়ে নেতাকর্মীরা এসেছে। আমরা কাউকে আসতে বলিনি,তারা নিজ উদ্যোগেই চলে এসেছেন। আসলে আবেগের কারণেই তারা এসেছেন। তবে সবাই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখেছেন,চেষ্টা করেছেন স্বাস্থ্য বিধি মানার।’

কাউখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এরশাদ সরকার বলেন-কাউখালিবাসির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করার একটি বেশি আবেগি হয়ে গিয়েছিলেন নেতাকর্মীরা। আমরা অর্গানাইজ করিনি,এরা হঠাৎই এসে গেছে,প্রায় ছয়শ গাড়ি ছিলো। আমরা অর্গানাইজ করলে আরো কয়েক হাজার মানুষ হতো। তবে এত মানুষের জমায়েত হওয়াটা ঠিক হয়নি,এটা ঠিক।’

মাস্ক পড়ার যেনো বালাই নেই নবনিযুক্ত সদস্যদেরও

বিষয়ক ‘বিব্রতকর’ মন্তব্য করে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর বলেন- আসলে হঠাৎই এটা হয়ে গেছে, অতি আবেগের কারণে,এটা ঠিক হয়নি। আমিও সবার প্রতি অনুরোধ করব,সবাই যেনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন।’

তবে আওয়ামীলীগ নেতারা পুরো বিষয়টি ‘হঠাৎ হয়ে গেছে’ দাবি করলেও বাস্তবতা হচ্ছে,রাঙামাটি থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরের কাউখালি থেকে একযোগে ছয় শতাধিক শতাধিক গাড়ির শো-ডাউন করে আসা ‘হঠাৎ’ কোন ঘটনা নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। সকাল সাড়ে দশটায় শহরে উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে প্রবেশ করা গাড়ী বহরটি বিকাল সোয়া চারটায় শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরূপা অতিক্রম করতে দেখা যায়,একইভাবে উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে,শো-ডাউন করেই।

মুখ ও নাকে নয়, সবার থুতনিতেই ঝুলছে মাস্ক !

রাঙামাটির সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সুপরিচিত, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি(দুপ্রক) এর সাধারন সম্পাদক ললিত চন্দ্র চাকমা বলেছেন,‘ বিষয়টি দু:খজনক। সরকার যখন কোভিড-১৯ এর এই ভয়াবহ সময়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে নানাভাবে প্রানান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে,সেইসময় এই ধরণের মোটর শোভাযাত্রা ও রাজনৈতিক শো-ডাউন অনাকাংখিত, অনভিপ্রেত ও অপ্রয়োজনীয় কাজ। এটা না হলেই ভালো হতো।’

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদেরই অধস্থন প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই স্বাস্থ্য বিভাগের রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা’র কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইরকম কিছু আসলে আমি জানিনা। আসলে সবারই সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। আমরা সেই অনুরোধই করি সবাইকে।’

নব নিযুক্ত দুই নারী সদস্যর মাস্ক কোথায় ?

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেছেন, প্রত্যেককেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে,এটাই সরকারের কঠোর কঠিন এবং স্পষ্ট নির্দেশনা। কোনভাবেই এর ব্যত্যয় হতে পারবে না।’ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণের দিনে এর ব্যত্যয় হয়েছে জানালেন জেলা প্রশাসক বলেন- ‘আমি এখনো কিছু জানিনা। বিষয়টি অবশ্যই খোঁজ নিব।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি প্রতিবারই ফোনকল কেটে দিয়েছেন। পরেও তিনি আর ফিরতি ফোনকল না করায় এই বিষয় সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে পারেনি পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম।

শহর দাপিয়ে বেড়ানো মোটর সাইকেল বহর !

এদিকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। অংসুই প্রু চৌধুরী রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের বিদায়ী চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা’র স্থলাভিষিক্ত হলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর জেলা পরিষদের সম্প্রদায় ভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ১৪ জন সদস্য যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করেন। যোগদান অনুষ্ঠান শেষে বিদায়ী চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা রাঙ্গামাটি জেলার উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। নবনিযুক্ত পরিষদবর্গ যোগদান শেষে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও রাঙ্গামাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শ্লোগানে শ্লোগানে পরিষদ চত্বর উত্তাল করে রাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা,যাদের অধিকাংশেরই মুখে ছিলোনা মাস্ক

প্রসঙ্গত, গত ১০ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমার নেতৃত্বাধীন ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ বাতিল করে পরিষদের বর্তমান সদস্য অংসুই প্রু চৌধুরীকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভিত্তিক ১৫ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ নিয়োগ দেয়। সরকারের এই আদেশ অনুসারে নবনিযুক্ত রাঙামাটি জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন ১৫ সদস্যের পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে সোমবার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button