রাঙামাটিলিড

স্কুলে যোগ না দিয়ে বদলী ঠেকাতে জেলা পরিষদে তদবির এক প্রধান শিক্ষকের !

আরমান খান,লংগদু

সেচ্ছায় বদলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে পছন্দের বিদ্যালয়ে বদলি করা হলেও যোগদান করেনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক। এদিকে বদলীর আদেশ প্রত্যাহার করে আগের বিদ্যালয়ে বহাল রাখার দাবীতে তদবির করছেন ওই শিক্ষকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকরা। এমনই ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস গত ১৪ আগস্ট লংগদু উপজেলার প্রধান শিক্ষকদের বদলির একটি আদেশ জারি করেন। যেখানে মোট আটজন প্রধান শিক্ষকের বদলির আদেশ রয়েছে।  সেখানে চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হককে দক্ষিন সোনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং গুলশাখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন কে চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। ইতোমধ্যে চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন। তবে প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক এখনো দক্ষিন সোনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেনি।

এ বিষয়ে দক্ষিন সোনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনন্ত চাকমা জানান, আমাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদটি দীর্ঘদিন যাবত শূণ্য রয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস  প্রধান শিক্ষকদের বদলির একটি অফিস আদেশ দিয়েছেন যেখানে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মঞ্জুরুল হককে পদায়ন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি যোগদান করেননি। কিন্তু কেন করেননি সে বিষয়ে উপজেলা অফিস কোনো কিছু জানায়নি আমাদের। তবে শুনেছি প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক বদলি বাতিলের চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হকের সাথে। মঞ্জুরুল হক জানান, আমি গত তিন বছর আগে চাইল্যাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে যোগদান করি। বিদ্যালয়টিতে  অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার শতাধিক। তবে শিক্ষক আছে মাত্র পাঁচজন। শিক্ষক স্বল্পতার কারনে স্থানীয় অভিভাবক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সহযোগীতায় আরো পাঁচজন অতিথি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এখানে শিক্ষার্থীদের পাঠ কার্যক্রমে গতি এসেছে।

তিনি আরো জানান, উপজেলা পর্যায়ে আমাদের বিদ্যালয়ের ফলাফল অনেক ভালো। তবে নানা বিষয়ে সহকারি শিক্ষকদের সাথে মতের মিল না হওয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে নানা সময়ে জেলা শিক্ষা অফিসে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে। এসব বিষয়ে মর্মাহত হয়ে আমি সেচ্ছায় বদলির আবেদন করি। গত ১৪ আগস্ট আমাকেসহ আরো কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের বদলির একটি অফিস আদেশ পাই। কিন্তু স্থানীয় অভিভাবকরা আমাকে এই বিদ্যালয় থেকে যেতে দিতে চাইছেন না। তারা আমার বদলি ঠেকাতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে গণস্বাক্ষরসহ আবেদন করেছেন। আমিও চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে দেখা করে বিস্তারিত জানাই। তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান এবং মৌখিকভাবে আমাকে যোগদান করতে নিষেধ করেন। তাই আমি এখনো দক্ষিন সোনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করিনি।

প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক সম্পর্কে বেশ কিছু অভিযোগের দাবী করেন স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি ও ইউপি সদস্য ইসমাইল হোসেন। তিনি জানান, বর্তমানে আমি সভাপতি পদে নাই। কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন শিক্ষা কর্মকর্তা এডহক কমিটির দায়িত্ব পালন করছেন। আমি সভাপতি থাকাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক কমিটির কোনো পরামর্শ শুনতেন না। তিনি নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতেন। বিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে ঘর তৈরী করে থাকেন। ছাত্রছাত্রীদের গাইড বই নির্ভর করতে প্রকাশনা কোম্পানীর নিকট থেকে অর্থ আদায় করেন। বিদ্যালয়ের কোনো বিষয়ে তিনি কমিটির সহযোগীতা নেন না। এমনকি সহকারি শিক্ষকদের সাথেও তার সম্পর্ক ভালো না। এরকম নানা বিষয়ে একাধিক অভিভাবক বিভিন্ন সময়ে  উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করেছে। কিন্তু আজ অবধি কোনো বিষয়ে সুরহা হয়নি। এখন তার বদলির আদেশ বাতিল করার জন্য তদবির করছেন বলে শুনেছি।

প্রধান শিক্ষকের বদলির আদেশ বাতিল করে পুর্নবহালের জন্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ভাসান্যাদম ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব প্যাডে আবেদন করেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. হযরত আলী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক অত্যান্ত মেধাবী ও কর্মচঞ্চল একজন শিক্ষক। উনি তার অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সব সময় তিনি আন্তরিক। ওনার মতো দায়িত্ববান প্রধান শিক্ষকের এই বিদ্যালয়ে খুবই প্রয়োজন। আমরা চাই উনিই এখানে থাকুক। আশা করি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহোদয় বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় কর্তৃক জারিকৃত অফিস আদেশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট ২০২২ তারিখে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষা বিষয়ক কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লংগদু উপজেলার মোট আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের বদলি করা হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয় ৩০ আগস্টের মধ্যে প্রধান শিক্ষকদের বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় ৩১ আগস্ট ২০২২ তারিখ হইতে কর্মবিমুক্ত বলে গণ্য করা হইবে।

অফিস আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে লংগদু উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এমকে ইমাম উদ্দিন জানান, জেলা থেকে প্রাপ্ত অফিস আদেশ অনুযায়ী বদলিকৃত শিক্ষদের আদেশের কপি পাঠানো হয়েছে। আমার জানামতে সবাই যোগদান করেছেন। তবে দক্ষিন সোনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলিকৃত প্রধান শিক্ষক মো. মঞ্জুরুল হক এখনো ( ১২সেপ্টেম্বর) যোগদান করেনি। তবে কি কারণে তিনি যোগদান করেনি তা জানানো হয়নি। তিনি যদি তার বদলির আদেশ বাতিল করাতে পারেন তাহলে আইনগত কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু আদেশ বহাল থাকলে তাকে অবশ্যই বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 − 4 =

Back to top button