নীড় পাতা / পাহাড়ের সংবাদ / আলোকিত পাহাড় / সুদিন এসেছে পানছড়ির রিপন ত্রিপুরার জীবনে

‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে

সুদিন এসেছে পানছড়ির রিপন ত্রিপুরার জীবনে

রিপন ত্রিপুরা। পয়ত্রিশোর্ধ বয়সের এই যুবক থাকেন খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার আদি ত্রিপুরা পাড়ায়। আজ থেকে কয়েকবছর আগেও নিদারুণ কষ্টেই দিনমান খেটে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতেন। একটা সময় পুরো বেকার হয়ে যান। সেই জীবন থেকে উত্তোরণের জন্য কিছু একটা করার পথ খুঁজছিলেন। পুুঁজির সমস্যায় করা হয়ে উঠছিলো না। এই সময় দারিদ্র বিমোচনের জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ নামের একটি প্রকল্পের অধীনে গ্রামে সমিতি গঠিত হয়। সমিতির সদস্য হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।

ভাগ্য বদলের ‘স্বপ্ন’ কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত টাকার কিছু সঞ্চয় করে তহবিলে কিছু টাকা জমা করেন। সমিতির অন্যান্য সদস্যগণও তহবিল গঠনের লক্ষ্যে সঞ্চয় করতে থাকেন এবং এরই মধ্যে সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত কল্যাণ অনুদান ও আবর্তক তহবিল সমিতির নিজস্ব পুঁজির সাথে যোগ হলে সদস্যদের ঋণ প্রদান শুরু হয়। প্রথম দফায় তিনি ১০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে ঘরের কাজে লাগান। ঋণ পরিশোধের পর আবারও ঋণ নেন। পরে শুরু করেন ব্যবসা । ধীরে ধীরে ঘুরে যায় তাঁর জীবনের চাকা। সেই ঋণ পরিশোধ করে পর্যায়েক্রমে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। ব্যবসার কাজে সহায়তা করেন তাঁর স্ত্রী। এক মেয়ে নিয়ে এখন তাঁর সুখের সংসার। এখন মোটামুটি স্বচ্ছল মানুষের মতোই সুখ-শান্তিতে চলতে পারছেন রিপন।

রিপনের সাথে আলাপ হয় এই প্রতিবেদরকের। তিনি অকপটে বলেন, ‘ব্যাংকসহ অন্যান্য এনজিওর চেয়ে এই প্রকল্পটি অনেক বেশি জনবান্ধব। একসময় মাইক্রো ক্রেডিট ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল এই এলাকার মানুষজন। চাপ ছিলো সীমাহীন। সপ্তাহান্তে কিস্তি পরিশোধ করতে হতো; সুদও ছিলো বেশি। অথচ এর কোনকিছু নিয়েই এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের দুঃচিন্তা ভোগ করতে হয় না। মাসিক-বাৎসরিকভাবে ঋণ পরিশোধ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণে দরিদ্র মানুষের মাথা উঁচু করে সমাজে বেঁচে থাকার উপায় সৃষ্টি হয়েছে।’

রিপন ত্রিপুরার মত নালকাটা এলাকার ননা চাকমা, শান্তিপুরের কুলোদীপ চাকমা, সুনেন্দ্রিয় চাকমা, লৌগাংয়ের কান্দারা চাকমা, দমদমের তপুরা বেগম, সাহারা খাতুন, মোল্লাপাড়ার নাসিমা বেগম, মুসলিম পাড়ার আবুল বাশারের মতো বাকী সবাই প্রকল্প থেকে ঋণ নিয়ে কৃষি, ব্যবসা, গবাদিপশু পালনসহ নানা কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে সংসার চালাচ্ছেন।

কথা হয় তাদের কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা প্রশিক্ষণ-পরামর্শ পেয়েছি। জামানত ছাড়া ঋণ গ্রহণ ও সঞ্চয় করতে পারছি। ঋণগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেরা সম্মানজনকভাবে খেয়েপড়ে বেঁচে আছি। বর্তমান সরকারের ব্যতিক্রমী উদ্দ্যোগের কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে।’

উল্লেখ্য, যে প্রকল্পটিকে ঘিরে রিপনদের জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে সেটির নাম ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। বিগত কয়েকবছর আগেও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী পানছড়ি উপজেলায় বেশিরভাগ মানুষ ছিল দরিদ্র শ্রেণির। সরকারি রেশন আর বেসরকারি, বিদেশি সাহায্যে দিনাতিপাত করতে হতো তাদের! তবে কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতিতে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। দারিদ্র বিমোচনে বিভিন্ন উদ্দ্যোগ যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ধীরে হলেও পাল্টে যাচ্ছে পুরনো দিনের চিত্র।

‘শেখ হাসিনার উপহার, একটি বাড়ি একটি খামার, দিন বদলাবে তোমার আমার’ -এই স্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প অতীতের দৃশ্যপট বেশ বদলে দিয়েছে। ঋণের টাকা কেউ ব্যবসায়, কেউবা ছাগল-গাভী পালনে, আবার কেউবা ধান চাষ, পানের ক্ষেত করে আয়বর্ধক খাতে ব্যয় করেছেন। প্রকল্পটির অধীনে পানছড়ি উপজেলায় ১০৫টি সমিতির অধীনে ৪৩৭৭ জন দরিদ্র মানুষ উপকার ভোগ করছেন। তাদের জীবনমানে এসেছে পরিবর্তন। প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় শুরু থেকে মোট ৭ কোটি ৯ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করে, ৪ কোটি ৪১লক্ষ ৫২ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। আদায়ের হার ৬২.১৯ ভাগ। এরমধ্যে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লক্ষ ১৪ হাজার; এখনো পর্যন্ত আদায় ৮৮ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা।

‘পার্বত্য এলাকা হিসেবে নানান সমস্যার মধ্যেও এই হার বেশ ভালো’- জানান পানছড়ি উপজেলার ‘একটি বাড়ি একটি খামার’- পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সমন্বয়ক (ম্যানেজার) রফিকুল ইসলাম।

ওয়েব সাইট ও অফিসিয়াল বিভিন্ন বুলেটিন থেকে জানা গেছে, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন মাস মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এটি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া একটি প্রকল্প। সরকার পরিবর্তনের পর এটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে এটি আবার চালু করে। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার ৪৯০টি উপজেলার ৪হাজার ৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৯৫০টি ওয়ার্ডে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাক্কালিত ব্যয় প্রাথমিক অবস্থায় প্রায় ১২০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে তা ৮হাজার ১০ কোটি টাকায় এসে পৌঁছেছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের উদ্দ্যোগ নেয়া হয়।

চারটি মূল লক্ষ্য- ‘উৎপাদন বৃদ্ধি, সুষম বন্টন, কর্মসংস্থান ও গ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন’কে সামনে রেখে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রান্তিক পর্যায়ে স্থানীয় প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র নিরসন ও টেকসই উন্নয়ন করাই ছিল, এই প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই মূলত ২০২০ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্রতার হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এ প্রকল্পটি বাস্তায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ১১টি উদ্দেশ্য রয়েছে। সমিতি পরিচালনার জন্য রয়েছে ১১ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি। সমিতির সদস্যদের থেকেই এই কমিটি গঠিত হয়। মোট ৪৫টি খাতে ঋণ দেয়া হয়।

প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়ক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি ১বছর হয়। এরমধ্যে ৪৫টি সমিতি গঠন করেছি। একেকটি সমিতিতে কমপক্ষে ২০জন সদস্য থাকেন। কিন্তু, এখন আগের মতো কাজ চালাতে পারছি না। স্থানীয় সমস্যার কারণে ঋণ গ্রহীতাদের অনেকেই ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। উৎপাদন, বাজারজাত কার্যক্রমে এখানে যে অলিখিত অচলাবস্থা চলছে তা দূর হলে, সমিতির বাইরে থাকা প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এই সেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।’

আরো দেখুন

বিজয় উল্লাসে মেতেছে রাঙামাটি মারী স্টেডিয়াম

১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ৩০লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল সবুজের বাংলাদেশ। বিজয়ের ৪৭তম …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − nine =