খোলা জানালাপর্বতকন্যাপাহাড়ের সচলচিত্রব্রেকিংরাঙামাটিলিড

সামাজিক হওয়ার প্রেরণা দেয় ‘বিজু’

চৈত্র মাসটা এলেই পাহাড়ে এক ধরণের আনন্দ খেলা করে! পাহাড়ে ফোটে নানা ধরণের সুগন্ধি ফুল; তাদেরও আবার একেকটার আবেদন একেক রকম! বিভিন্ন গানে,কবিতায়,গল্পে,পজ্জনে সেইসব ফুলের রোমান্টিক বর্ণনা রয়েছে! চৈত্র মাসের শেষ দু’দিন এবং পহেলা বৈশাখ মোট তিন দিন পাহাড়ে চৈত্র সংক্রান্তি এবং বর্ষ বরণ উৎসব হয়!

এই উৎসব পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির  কাছে একেক নামে পরিচিত! চাকমারা একে বিজু উৎসব বলে! মারমা’দের কাছে এটি সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরাদের কাছে এটি বৈসুক! তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠির কাছে এটি বিষু! আবার মূলতঃ বৈসুক,সাংগ্রাই ও বিজু এর অদ্যাক্ষর নিয়ে এটাকে সংক্ষেপে বলা হয় বৈসাবি! চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনকে চাকমারা ফুল বিজু বলে! এই দিন ভোরে উঠে ফুল তুলে নদীতে ভাসানো হয়! মূলতঃ জীবনে পানি’র অবদানকে স্বীকার করার জন্য, পানির প্রতি কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ এটি! এর পাশাপাশি পানির যত উৎস আছে সেখানেও ফুল দেওয়া হয়! যেমনঃ কুয়া,ছড়া, ঝর্ণা,ঝিরি যা থাকে পানির উৎস!

২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল ফুলবিজুতে তোলা ছবি

গ্রামে গবাদি পশুদের জন্য খাবার চাল,গম,ভাত ছিটানো হয়! যাতে পশুপাখিরা খেতে পারে! ঠিক একই ভাবে সূর্য ডোবার সাথে সাথে পানির উৎসে (ছড়া,নদী,কুয়া,ঝর্ণা,ঝিরি) এবং সবুজ বৃক্ষের নীচে মোমবাতি জ্বালানো হয় প্রকৃতিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য! যে প্রকৃতি আমাদেরকে সারা বছর ফুল,ফল দেয় সেই প্রকৃতিকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য! এই দিনে পরিবারে এবং গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করানো হয়!

মূলতঃ আগেকার দিনে পানির উৎস দূরে হওয়ায় তাঁরা নদীতে যেতে পারেন না বলেই এ আয়োজন! তবে এখনও এ ঐতিহ্যবাহী প্রথাটা চালু রয়েছে! এখন শহর অঞ্চলে আয়োজন করেই এ রীতিটা চালু রয়েছে!

ফুল বিজু’র দিনে ফুল দিয়ে ঘর সাজানোও একটা ঐতিহ্য! সাথে থাকবে নিমপাতা! প্রতিটি বাড়ীতে বুদ্ধকে ফুল দিয়ে পূজা করা হয়! ফুলবিজু’র দিনে ভোরে উঠে স্নান করার একটা রীতি আছে! বিশ্বাস যে আগে স্নান সারবে সে বিজুগুলো পাবে! এটা মূলতঃ শারীরিক শুদ্ধতাকে উদ্বুদ্ধ করে! পরিচ্ছন্নতাকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস! এরপর চৈত্র মাসের শেষদিনকে চাকমারা মূলবিজু বলে! এ বিজুর দিন নানা ধরণের খাবারের আয়োজন করা হয়!

তবে বিজু’র মূল আর্কষণ পাজন! পাজন হলো বহু সবজী মিশ্রিত এক পদের খাবার! এই পাজনে সর্বনিম্ন ১৮ থেকে সর্বোচ্চ পদের সবজী মেশানো হয়! বিশ্বাস সারা বছর যেহেতু জুমে/পাহাড়ে উৎপাদিত খাবার খেয়েই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাই বিজুর দিন নানা পদের সবজী মিশ্রিত পাজন খেয়ে শরীরে এর গ্রহনযোগ্যতা তৈরী করা! এবং প্রচলিত বিশ্বাস সর্বনিম্ন সাতটা বাড়ীর পাজন খেতে হয়! এটা আসলে একটা সামাজিকীকরণ এর বিষয়! এবং এও প্রচলিত আছে বিজু’র দিন কোনভাবেই ঘুমানো যাবে না! বিজুর দিন যে ঘুমাবে সে আগামী জন্মে শুকর হয়ে জন্মাবে! মোটকথা বিজু একজনকে সামাজিক হওয়ার প্রেরণা দেয়!

বিজু’র দিন পাজনে দেওয়ার জন্য ফুলবিজুর দিন’ই গাছের কাঁঠাল, আম,নারিকেল ইত্যাদি পারা হয়! সাধারণতঃ গাছের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের জন্য বিজু’র দিন কোন গাছ থেকে ফল,পাতা পারা হয় না! ফুলবিজু’র দিনের মতই বিজু’র দিনও সবুজ গাছের নীচে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ! এরপর পরেরদিন নও বজর! অর্থ্যাৎ নতুন বছর! পহেলা বৈশাখ! এদিনকে চাকমারা গজ্জ্যপজ্জ্যে দিন বলে! অর্থ্যাৎ ‘অবসরের দিন’!

তবে চাকমা’দের কাছে এ দিনটিরও আলাদা তাৎপর্য আছে! নিজেদেরকে পুনঃউজ্জীবিত করার দিন এটি! এইদিন ভোরে উঠে সিয়োং(বিহারের ভিক্ষুদের আহার) রাঁধে! এরপর সবাই বিহারে যাই! যাতে করে সারা বছর ধর্মীয় আদর্শে চলতে পারে সেজন্য এই দিনে বিহারে গমন করে! এবং সন্ধ্যায় ফুলবিজু এবং মূলবিজু’র মতই গাছের নীচে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে! এই দিনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য গুরুজনদের বাড়ীতে এনে নিমন্ত্রণ খাওয়ানো! আগামীবছর হয়তো বিজুতে তাঁরা নাও থাকতে পারেন তাই তাঁদেরকে সম্মান জানানো হয়! আর অল্প কিছুক্ষণ পরেই এবছরের জন্য পাহাড়ে বিজু’র ক্ষণটি আসবে! তবে করোনার কারণ এ বছর কোন আনুষ্ঠানিকতা হবে না! তবুও আমাদের সবার হৃদয়ে বিজু’র ছোঁয়া লাগুক! সবাই বিজু’র তাৎপর্যে উজ্জীবিত হোক;

সবাইকে বিজুর শুভেচ্ছা; শুভ বিজু-২০২০;

লেখক : উন্নয়ন কর্মী

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button
Close