ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

সাজেক : মৃত্যু আর জিঘাংসা যেখানে হানা দেয় বারবার

পার্বত্য জনপদের পর্যটন উপত্যকা সাজেক। বলা হয় এ বাংলার ‘দার্জিলিং’। নয়নাভিরাম এই পাহাড়ী উপত্যকা মন কাড়ে পার্বত্যবাসির তো বটেই,দেশ বিদেশের অজ¯্র মানুষের। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের পদভারে মুখর এই জনপদ এককালে পাংখো জনগোষ্ঠির চারণভূমি হিসেবে খ্যাত থাকলেও বিগত এক দশকে এই এলাকা থেকে উৎখাত হয়েছেন তারা। পর্যটন শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে এই এলাকায় অসংখ্য পর্যটন স্থাপনা যেমন গড়ে উঠেছে,তেমনি এখানে ভূমি হারিয় দূরে থেকে দূর পাহাড়ে সরে গেছে পাংখোরা আর সেই স্থানে ক্রমশ সংখ্যায় আর দাপটে বেড়েছে চাকমা জনগোষ্ঠি আর বাঙালি পর্যটন ব্যবসায়ি। ফলে বদলে যাওয়া সাজেক এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও বেশ রমরমা।

কিন্তু সুন্দরী সাজেকের পেছনেও আছে বেদনার গল্প। নয়নাভিরাম অপরূপা সাজেকের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রন পর্যটন ব্যবসায়িদের হাতে দেখা গেলেও বাস্তবতা হলো,এখানকার রাজনীতি আর অর্থনীতির নিয়ন্ত্রন নিতে মরিয়া হয়ে উঠে পাহাড়ের চার আঞ্চলিক দলই। ফলে সাজেক যে উপজেলায় অবস্থিত সেই বাঘাইছড়ি উপজেলাটিই পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৫ টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র উপজেলা যেখানে আঞ্চলিক চারটি দলেরই কমবেশি নিয়ন্ত্রন আছে ! এই নিয়ন্ত্রনের বলি হয়েছে অন্তত দেড়শত তরুণ রাজনৈতিক কর্মী। সাজেক এবং বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রন নিতে প্রায়ই সংঘাতে লিপ্ত হয় চারটি দল। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন অনেকটা নিজেরাই ভাগ করে নিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রনের বাইরেও তাদের ব্যতিক্রমী আর ভিন্নরকম নিয়ন্ত্রন তৈরি করেছে পৃথক এক শাসন ব্যবস্থাও। ফলে একই উপজেলার বাসিন্দা হলেও আপনি চাইলেই এর যেকোন ইউনিয়নে যেতে পারবেন না।

স্থানীয়সূত্রগুলো জানিয়েছে,আয়তনে দেশের সবচে বড় এই উপজেলাটির সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নিয়ন্ত্রন রয়েছে সারোয়াতলি ইউনিয়ন,খেদারমারা ইউনিয়নের পাবলাখালি,দোসর,মধুভাঙ্গা ও সদর ইউনিয়নের কিছু অংশ, ইউপিডিএফ এর নিয়ন্ত্রিত এলকা হলো বঙ্গলতলি ও সাজেক,পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’ ও ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক)’র নিয়ন্ত্রনে রয়েছে রূপকারি,বঙ্গলতলির কিছু অংশ,তুলাবান এবং বাঘাইছড়ি সদর। এই চারটি দলের নেতাকর্মী বা সমর্থক সবার জন্য নিষিদ্ধ অন্য এলাকায় প্রবেশ। নিশ্চিত মৃত্যু ছাড়া আর কোন উপায় নেই ফেরার।

এই চারদলের বিবাদ আর বিরোধে গত দুই দশকে এই উপজেলায় নিহত হয়েছেন অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী। সর্বশেষ গত কয়েকমাসেও নিহত হয়েছেন বেশ কজন। এদের মধ্যে গত ৭ মার্চ বঙ্গলতলিতে নিহত হন ইউপিডিএফ নেতা গভীন চাকমা,১৩ মার্চ নিহত হন উদয় বিকাশ চাকমা চিক্কোধন, ৩ জানুুয়ারি মারা যান জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র জ্যোতি চাকমা। ২০১৮ সালের ২৮ মে সাজেকে হামলায় একসাথে নিহত হয় ইউপিডিএফ এর তিন নেতা স্মৃতি বিকাশ,অটল চাকমা ও সজীব চাকমা। সাম্প্রতিক সময়ের এই ঘটনাটি ছাড়াও ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর একটি বৈঠকে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন সন্তু লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির উপজেলা সভাপতি শশাংক মিত্র চাকমা,সাংগঠিনক সম্পাদক নন্দ কুমার চাকমাসহ ৩ নেতা। এসব হত্যা পাল্টা হত্যার ঘটনায় পৃথক পৃথক একাধিক মামলাও আছে এই উপজেলার প্রধান দুই দলের শীর্ষ দুই নেতা বড়ঋষি চাকমা ও সুদর্শন চাকমার বিরুদ্ধে। উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েও জেলে ছিলেন বড়ঋষি চাকমা।
বাঘাইছড়ি আর সাজেকের মনকাড়া সৌন্দর্য যেমন মন কাড়ে,তেমনি এই উপজেলার হত্যা,খুন,অপহরণ আর জিঘাংসার রাজনীতি ক্রমেই ম্লান করে দিচ্ছে এর অপার সৌন্দর্য্য আর সম্ভাবনাকে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button