পাহাড়ের রাজনীতিব্রেকিংরাঙামাটি

সরকারি অফিসে ঢুকে হত্যা,কি ভাবছেন পাহাড়ের মানুষ ?

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে

অদিতি আফ্রোদিতি
পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ার কারণেই আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাস বন্ধ করা যাচ্ছেনা বলে মন্তব্য করেছেন রাঙামাটির বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। সরকারি অফিসে দিনেদুপুরে ঢুকে একজন জনপ্রতিনিধিকে হত্যার ঘটনায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তারা। উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সবচে গুরুত্বপূর্ণ অফিস উপজেলা পরিষদ,যেখানে নিয়মিত অফিস করেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সরকারের উপজেলা পর্যায়ের সকল কার্যালয়ের প্রধানরাই। সেখানে এমন ভয়ংকর হামলার ঘটনায় ভয়ে শিহরিত পার্বত্যবাসি।

রাঙামাটির প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলছেন, ‘উপজেলার সবচে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র অবস্থায় এইভাবে একজন জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা করে বীরদর্পে চলে যাওয়া কিসের আলামত বহন করে ? সরকারকে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে,এই সংকটের সমাধানসূত্র অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। আর অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে এই সংকট থেকে উত্তরন অসম্ভব।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর বলেন, ইতিপূর্বে একাধিক জনপ্রতিনিধিকে এইভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসীরা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছি। সরকারি দল হয়েও নানান কর্মসূচী পালন করেছি। যতদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এইসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারিরদের নিমর্ূূল করা যাবেনা,ততদিন এইসব নির্মমতা বন্ধ হবেনা। সেইসাথে পাহাড়ে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।’

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মোঃ শাহ আলম বলেছেন- ‘এটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা,বাঘাইছড়ির জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এইভাবে প্রকাশ্যে সরকারি অফিসে দিনেদুপুরে একজন জনপ্রতিনিধিকে হত্যা করার ঘটনা সরকারের নির্লজ্জ ব্যর্থতা। পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করা না হলে এসব তো চলতেই থাকবে।’

বাঘাইছড়ি পৌরসভার মেয়র জাফর আলী খান এই হত্যাকান্ডের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, ‘এইভাবে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করা কঠিন। সরকারের কাছে আমি দাবি জানাই,এইভাবে বারবার এমন ঘটনা ঘটে,আমরা প্রতিবাদ জানাই,কিন্তু অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এইভাবে আর কতদিন ? সরকারের প্রতি অনুরোধ,এইসব ঘটনায় যে বা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হোক।’

পার্বত্য নাগরিক পরিষদ রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি সাব্বির আহমেদ বলছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তির্ণ সীমান্ত অরক্ষিত। এইসব সীমান্তে যতদিন অবাধ ব্যবহার বন্ধ করে অবৈধ অস্ত্রের যাতায়াত পথ রোধ করা যাবেনা,ততদিন পাহাড়ে শান্তি ফিরবে না। সেই সাথে অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম চিরতরে স্তব্দ করে দিতে হবে।’

রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক জিএস এবং নাগরিক আন্দোলনের নেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলছেন, ‘পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর ভৌগলিক আধিপত্য বিস্তার আর চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রন নিয়ে সশস্ত্র বিরোধের মাশুল গুণছে পাহাড়ের মানুষ। এইভাবে পাখির মতো মানুষ হত্যার কোন মানে নেই। এসব বন্ধ করতে হবে।’

তবে আঞ্চলিক দলগুলোর এইসব সশস্ত্র লড়াই নিয়ে কথা বলতে কখনই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না পাহাড়ী সুশীল সমাজ কিংবা জনপ্রতিনিধিরা। ‘ভয়’ কিংবা ‘চাপ’র কথা বলে সযতনে এড়িয়ে যান প্রসঙ্গটি।

তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই আঞ্চলিক দলগুলোরও নিজেদের দায় নিতে অপারগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)র আইন বিষয়ক সম্পাদক ও বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বলছেন, আমরা তো আক্রমন করিনা,আক্রমনের স্বীকার। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। আমরা সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর সশন্ত্র হামলার শিকার হয়েছি বারবার।’

অন্যদিকে সন্তুলারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক ত্রিদিপ চাকমা বলছেন-‘আমাদের কোন সশস্ত্র শাখা বা কর্মী নাই। আমরা চুক্তি বাস্তবায়নে গনতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম করছি। পাহাড়ে হত্যা খুন গুমের কোন ঘটনার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।’

প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এর সংগঠক বাবলু চাকমা বলছেন-‘পাহাড়ে শান্তি বা অশান্তির দায় সরকার। সরকার চাইলে এসব বন্ধ হবে,না হলে হবে না। সরকারকেই এসব বন্ধ করতে হবে,কথায়,কাজে,দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।’

প্রসঙ্গত,বুধবার দুপুর একটায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ ভবনে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরনবী সরকারের অফিস কক্ষে বসে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করার সময় একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে উপজেলার রূপকারি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য সমর বিজয় চাকমা(৩৮) কে। নিহত সমর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র উপজেলা কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এই ঘটনায় নিহতের স্বজন বিনয় চাকমা বাদি হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির ১০ নেতার নাম উল্লেখ করে এবং আরো ৮/৯জনকে অজ্ঞাত রেখে বাঘাইছড়ি থানার একটি হত্যামামলা দায়ের করেছেন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button