ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

সম্প্রীতির কাপ্তাইয়ে হঠাৎ রক্তপাত !

পার্বত্য রাঙামাটির শিল্পএলাকা কাপ্তাই। এশিয়ার বৃহত্তম কাগজকল কেপিএম,জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ শিল্পাঞ্চল কাপ্তাই জেলার সবচে ব্যস্ততম একটি এলাকা হিসেবেই পরিচিত যুগের পর যুগ ধরেই। পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী রাজনীতির ছাপ এই উপজেলায় কমই পড়েছে। বরাবরই সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির নিয়ন্ত্রিত এলাকা হলেও এখানে জাতীয় দুই দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপির প্রভাবও বেশ দৃশ্যমান। ফলে জাতীয় রাজনীতির সাথে লড়াইয়ে পেড়ে উঠেনা আঞ্চলিক রাজনীতি। সঙ্গতকারণেই সম্প্রীতির উপজেলা হিসেবেই খ্যাতি এই এলাকার। কিন্তু সোমবার আঞ্চলিক রাজনীতির সশস্ত্র প্রভাব যেনো ঠিকই এলোমেলো করে দিলো চেনা কাপ্তাইকে।

শনিবার রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের পূর্ব কোদালা গ্রামে ৩য় শ্রেণির ছাত্রী মিতালী মারমাকে (৯) ‘ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ’ হয়ে গলাটিপে হত্যার ঠিক একদিন পর সোমবার দুর্বৃত্তের গুলিতে উপজেলার একই ইউনিয়নের কারিগর পাড়ায় মংসিনু মারমা ও জাহিদ হোসেন নামের দুই ব্যক্তি নিহত হন এই হত্যাকান্ডের পর থেকেই পুরো এলাকার জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে পুলিশ বলছে, হত্যাকান্ডের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেই এখন এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
¬
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নিহত মংসিনু মারমা আগে জনসংহতি সমিতির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) পরিচয় দিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতেন এবং একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন। আর জাহিদ হোসেন স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত ছিলেন।

স্থানীয়রা এও বলছেন, পূর্বে দিনে রাইখালী তো দূরের কথা; পুরো কাপ্তাই উপজেলাতেও দিনে-দুপুরে এমন হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটেনি। প্রায় বছর দশেক আগে কাপ্তাইয়ের চিৎমরমে ব্রাশফায়ারে দুইজন মারা গেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে কাপ্তাইয়ে সম্প্রতির মধ্য দিয়ে বাস করছেন তারা। তবে সোমবারের ডাবল মার্ডারের পর থেকেই পুরো রাইখালী ইউনিয়নে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর সাথে পুরো উপজেলা জুড়োও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

রাইখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সায়ামং মারমা বলেন, ‘ডাবল মার্ডারের পর এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক তো থাকবেই। আমি মনে করি, যারাই এমন নৃশংস হত্যার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে যেনো হয়রানি করা না হয়।’

এই ইউপি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ‘নিহত মংসিনু মারমা আগে আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। এছাড়া পরে ইউপিডিএফের একটি সংস্কার গ্রুপের পরিচয় দিয়েও এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করত। সর্বশেষ তিনি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইউপিডিএফ সংস্কার পন্থী পরিচয় দিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছে।’

এ ঘটনা উপজেলার সম্প্রীতিতে আঘাত হেনেছে মন্তব্য করে কাপ্তাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেন নিজামী বলেন, ‘কোনো ধরণের হত্যাকান্ডই কাম্য নয়। আমরা সোমবারের এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। আমার জানা মতে, কাপ্তাইয়ের মতো জেলার কোথাও এমন সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ নেই। কিন্তু এবারের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে কিছুটা টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে। তবুও আমরা চাই কাপ্তাইয়ে সবাই দল-মত নির্বিশেষে সম্প্রতির মধ্য দিয়ে বসবাস করুক।’

কাপ্তাই উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অংসুইছাইন চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রধারী-চাঁদাবাজ গ্রুপ এ ধরণের হত্যাকান্ড চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এগুলো অসুস্থ রাজনীতির অংশ। আমি অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের এ ধরণের নোংরা রাজনীতি বন্ধ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘মূলত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে কাপ্তাইয়ে দীপংকর তালুকদারের বড় বিজয়ে অবৈধ অস্ত্রধারী জেএসএসের সন্ত্রাসীরা এমন অসুস্থ রাজনীতির সৃষ্টি করেছে। আমি হত্যাকারীদের তথ্য নিয়েছি, হত্যাকারীরা জেএসএসের সাথে সরাসরি জড়িত। অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা চায়ের দোকানে আড্ডাক্ষণে আমাদের দুই কর্মীকে গুলি করে মেরেছে। আমি মনে করি, এই হত্যাকান্ড কাপ্তাইয়ের সম্প্রীতির রাজনীতিতে আঘাত হেনেছে।’ উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি বলেন, ‘আমি বিশেষ করে পুলিশকে ধন্যবাদ জানাব, তারা ঘটনার পরপরই অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানোয় স্থানীয় জনসাধারণের মাঝেও স্বস্তি ফিরেছে।’

এলাকার পরিস্থিতি বিষয়ে চন্দ্রঘোনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘একটি ঘটনার একদিন পর আরেকটি ঘটনা ঘটলেও ঘটনা দুটি ভিন্ন। তবে সোমবার ডাবল মার্ডারের পর এলাকাবাসীর মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এখন সেটা কেটে গেছে। এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক আছে।’ ওসি বলেন, ডাবল মার্ডারের ঘটনায় নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button