খাগড়াছড়িব্রেকিংলিড

শিক্ষকদের সাথে আর্থিক লেনদেনে চলছে নিষিদ্ধ গাইড বই ব্যবসা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুদের ওপর থেকে অপ্রয়োজনীয় বইয়ের বোঝা কমাতে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশ দিলেও উল্টো শিশুদের কাঁধে অনুমোদনহীন বইয়ের বোঝা বেড়েই চলেছে। অভিযোগ আছে, অনৈতিক এ প্রবণতা বন্ধে উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজসে চলছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সাথে।

স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব গাইড ও নোট বই বিক্রি হলেও অজ্ঞাত কারনে তাঁরা নীরব। শিক্ষক নেতারাও বসে নেই এসব ব্যবসায়। এক শ্রেণির শিক্ষক নেতারা বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে এসব নিষিদ্ধ গাইড বই।

সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে নিষিদ্ধ গাইড। মাটিরাঙ্গা উপজেলা জুড়ে চলছে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা। ব্যবসায়ীরা নিজেদের গাইড বই চালু করতে নিচ্ছেন নানা কৌশল। আর এসব গোপন কৌশলের মাধ্যমে কতিপয় শিক্ষক আর ব্যবসায়ীদের যোগসাজসে নি¤œমানের এসব গাইড বই যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে। অভিযোগ আছে বছরের শুরতেই শ্রেণি কার্যক্রম পুরোদমে শুরু না হলেও শিক্ষকদের নির্বাচিত এসব গাইড বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

জানা গেছে, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ভুলে ভরা ‘জুপিটার পাবলিকেশন্সের’ ও পাঞ্জেরী, নি¤œমানের গাইড বই কিনতে বাধ্য করায় শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অভিযোগ উঠেছে মাটিরাঙ্গায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নির্বাচিত ‘জুপিটার পাবলিকেশন্সের’ ও পাঞ্জেরীর নি¤œমানের গাইড কিনতে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে। কোন কান শিক্ষার্থী তা কিনতে অপারগতা করলে তাকে বিদ্যালয় থেকে টিসি ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই উপজেলার একাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ‘জুপিটার পাবলিকেশন্স’ ও পাঞ্জেরী গাইড বই কর্তৃপক্ষের সাথে অলিখিত চুক্তি সম্পন্ন করেছে। ছাত্র প্রতি দুই‘শ টাকা থেকে আড়াই‘শ টাকা নেয়া হয়েছে ‘জুপিটার পাবলিকেশন্স’ ও পাঞ্জেরী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। ‘জুপিটার পাবলিকেশন্সের’ ও পাঞ্জেরী নি¤œমানের গাইড বই ছাড়াও ‘পপি, অনুপম, প্রাইড ও লেকচার’ নামে একাধিক প্রকাশনীর গাইড বই বাজারে সয়লাব। আর এসব নি¤œমানের নিষিদ্ধ গাইড মাটিরাঙ্গার বিভিন্ন লাইব্রেরীতে বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।

উপজেলার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদেরকে ‘জুপিটার পাবলিকেশন্সের’ ও পাঞ্জেরী গাইড বই কিনতে স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা।

এই দিকে অভিযোগ উঠেছে, প্রথম শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণীর বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড ও নোট বই বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে জুপিটার, লেকচার,পাঞ্জেরী, গ্যালাক্সী, পপি গাইড উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এসব গাইড ও নোট বই কিনতে শিশুদের প্ররোচিত করছেন। প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণির নিষিদ্ধ গাইড ও নোট বই।

অভিভাবক সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকাসহ উপজেলার বেশ কয়েকটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি ও ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণীতে পাঞ্জেরী, জুপিটার, পপি গাইড পড়াচ্ছেন শিক্ষকেরা। অন্য প্রকাশনীর গাইড কিনে দিলেও নাকি শিক্ষকেরা তাদের পছন্দ মতো গাইড ছাত্র-ছাত্রীদের কিনতে বাধ্য করেছেন। সরকার যেখানে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করছে এবং গাইড বই নিষিদ্ধ করেছে সেখানে বিদ্যালয় থেকে গাইড বই পাঠ্য করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন অভিভাবক মহল। তবে নি¤œমানের গাইড কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করাকে শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের প্রতারনা হিসেবে দেখছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা বলেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষরা তাদের অনুসারী শিক্ষকদের মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেন বা গাইড বই পাঠ্য করে থাকেন। এর বিরোধিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তুলতেও পিছপা হননি প্রধান শিক্ষক।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, প্রথম শ্রেনি থেকে অষ্টম শ্রেনি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বই মূদ্র্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করণের উদ্দেশ্যে প্রনীত ১৯৮০ সালের নোটবই নিষিদ্ধকরণ আইনের ৩ নম্বর ধারয় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি নোট বই মূদ্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিক্রি, বিতরণ, অথবা কোন প্রকারে উহার প্রচার করিতে বা মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিক্রয়, বিতরণ কিংবা প্রচারের উদ্দেশ্যে রাখিতে পারিবেন না।’ এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। পরে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নোট বই নিষিদ্ধ করন আইনের আওতায় নোট বইয়ের সঙ্গে গাইড বইও বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেন হাইকোর্ট।

এদিকে উপজেলার অন্তত ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি ও ২০টি মাধ্যমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মোটা অংকের ডোনেশনের বিনিময়ে তাদের পছন্দ মতো (নি¤œমানের) গ্রামার ও ব্যাকরণ বই পড়াচ্ছেন। ফলে উপজেলার কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল মেধা-বিকাশে চরম ভাবে বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। দেখার কেউ নাই।

এবিষয়ে জানতে চাইলে মাটিরাঙ্গা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মীর মো: মোহতাসিম বিল্লাহ বলেন, গাইড বই না কিনতে নির্দেশনা দিয়ে ইতিমধ্যই বিদ্যালয়গুলোতে চিঠি দেয়া হয়েছে দাবী করে কোন প্রধান শিক্ষক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ গাইড বই কিনেত শিক্ষার্থীদের বাধ্য করলে নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কটোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাটিরাঙ্গায় নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিভীষণ কান্তি দাশ বলেন, নিষিদ্ধ গাইড বই ক্রয়-বিক্রয় ও বাজারজাত আইনত: দন্ডনীয়। যদি কেউ এ কাজের সাথে জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button