করোনাভাইরাস আপডেটখোলা জানালাব্রেকিংরাঙামাটিলিড

লক ডাউন

“লক ডাউন”, “হোম কোয়ারান্টাইন” ও “আইসোলেশন” শব্দগুলো বিশ্ববাসীর কাছে নতুন জানা-শুনা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজাতিসমূহের কাছে শব্দগুলোর অর্থ এবং এর কার্য মোটেও নতুন কিছু নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত খুমী, খিয়াং, চাক চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া, বম, মারমা, ম্রো, লুসাই, সাঁওতালদের রয়েছে হাজার বছরের অনন্য এক সংস্কৃতি। যা তারা বংশ পরম্পরায় শিখে আসছে, টিকিয়ে রেখেছে এবং এখনো চর্চা করছে । সম্প্রতি সারা বিশ্বের মানুষকে মহা আতংকগ্রস্থ করে তুলেছে সর্বনাশা “কোভিট-১৯ করোনা” ভাইরাস। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা পড়ছে হাজার হাজার মানুষ। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে পাহাড়ের এই সাধারণ মানুষেরা শুধুমাত্র সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে তারা নিজেদের আত্মরক্ষার্থে প্রয়োগ করেছে অভিনব এক পদ্ধতি। তারা উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া সেই লোকায়ত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্ব স্ব পাড়া/গ্রামের মানুষকে সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব এখন যেটিকে “লক ডাউন” বলছে পাহাড়িদের কাছে এটি ‘পাড়া বন্ধ’ হিসাবে বিধিবদ্ধ। পাংখোয়া ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘খোয়া খার/খোয়া লোত সোয়াক এল’। আগেকার দিনে নিজ গ্রাম বা আশেপাশের গ্রামে কোন মহামারি (পাংখোয়া’রা বলে ‘রি পুই’) দেখা দিলে গ্রামের প্রবেশ মুখে ওঝা/বৈদ্য (‘বল তুপা’) কতৃক পূজাঅর্চনা ও প্রাণী বলি (বল) করে বাঁশগাছ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবেশ পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিত। ঐ সময়ে এক গ্রামের কোন মানুষ অন্য গ্রামে ডুকতে এবং গ্রাম থেকে কোন মানুষ বের হতে পারেনা। কেউ এই রীতিনীতি অমান্য করলে তার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান ছিল। যেমন অপরাধ যদি লঘু হয় অপরাধীকে পূজাঅর্চনা ও প্রাণী বলির সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে হয় ইত্যাদি। “হোম কোয়ারান্টাইন” হলো নিজ বাড়িতে বা নিজ ঘর হতে দূরে আলাদাভাবে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, কারো সাথে মেলামেশা না করা। আর “আইসোলেশন” হচ্ছে রোগাক্রান্ত ব্যাক্তিকে গ্রামের একপ্রান্তে যেদিকে মানুষের চলাফেরা নাই সেখানে আলাদা করে ঘর বানিয়ে রাখা। সময়মতো আক্রান্ত ব্যক্তিকে রোগ উপযোগী খাবারদাবার দিয়ে আসা হয়। চাকমা ভাষায় এটিকে বলে ‘একঘরে’ রাখা অর্থাৎ আলাদা করে রাখা। পাংখোয়া’রা বলে ‘ডাম মি ইন ডাম লৌ মি মাদাং’। যাতে ঐ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মাঝে মহামারি ছড়িয়ে না পড়ে।

“লক ডাউন”, “হোম কোয়ারান্টাইন” ও “আইসোলেশন” ও “মহামারি” এবং “পূজাঅর্চনা” শব্দগুলোর প্রত্যক নৃগোষ্ঠীর নিজ নিজ ভাষায় আলাদা আলাদা নাম, রীতিনীতি রয়েছে। পাহাড়ে শিক্ষার প্রসার, প্রকৃতি পূজারী থেকে ঐশ্বরিক ধর্ম গ্রহন ও আকাশ সংস্কৃতি করালগ্রাসে পূজাঅর্চনা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে কিন্তু ‘পাড়া বন্ধ’ “লক ডাউন” ও ‘একঘরে’ থাকা-রাখা “আইসোলেশন” এখনো মেনে চলে। যা সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সকলে দেখতে পাচ্ছি। এই সচেনতার জন্য পাহাড়ি ভাইবোনদের হাজারো লাল সালাম।

বন্ধনীচিহ্নযুক্ত (.)শব্দগুলো পাংখোয়া ভাষার শব্দ।

 

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও একাধিক গ্রন্থপ্রণেতা এবং সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button