খোলা জানালাব্রেকিং

লংগদু : হতাশা আর এক চিলতে আশা

লংগদুতে যা হলো, তা নিয়ে পাহাড়ের প্রত্যেক বিবেকমান মানুষ আত্মগ্লানিতে ভুগেছে। এক-দুই জনের অপরাধের জন্য শ’ শ’ মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়াটা স্রেফ অগ্রহণযোগ্য। মোট ২২৩টি পরিবারের ২২৬টি বসতি, দোকান ও পাড়াকেন্দ্র পোড়ানো হয়েছে। এর কোনো যৌক্তিকতা, অজুহাত কিংবা নায্যতা থাকতে পারে না। পিরিয়ড। পাহাড় কেন শুধু? পৃথিবীর প্রত্যেক সম্প্রদায়-ভিত্তিক পঁচা সমাজে, এই ‘কালেকটিভ পানিশমেন্ট’ যেন এক ঘৃণার্হ বাস্তবতা।

পাহাড় নিয়ে লিখি না অনেকদিন। অনেক কারণ আছে না লেখার। কিন্তু লংগদু নিয়ে কিছু না লিখে পারছি না।

লংগদুতে ঘরবাড়ি জ্বালানো সংবাদ পাওয়ার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, সেখানকার কিছু বাঙালি বন্ধুর সঙ্গে। তারা নিশ্চিত করে যে, ঘরবাড়ি পোড়ানোর খবর পুরোটাই সত্য।

লংগদুর খুব উত্তাল একটি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। আশির দশকে জনপ্রিয় বাঙালি নেতা আবদুর রশীদ চেয়ারম্যান খুন হওয়া নিয়েও একবার সেখানে এমন হয়েছিল, যা গেছে পাহাড়ি জনগণের ওপর। সেখানকার বাঙালি বাসিন্দারাও অন্তত দু’টি নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চাক্ষুষ করেছে। ৩২ কাঠুরিয়া হত্যাকাণ্ড যেখানে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বহু বছর ধরে লংদু শান্ত। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিবাদে বসবাস করেছে। সবাই সবাইকে চেনে, এমন একটা কম্যুনিটিতে তাদের বসবাস।

যেই মোটরসাইকেল চালক নয়নকে হত্যা নিয়ে সব কিছুর শুরু, তারও একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। বিএনপি-মনা ও প্রগতিশীল অনেককে দেখলাম, তার “যুবলীগ নেতা” পরিচয়কে সামনে আনতে। আচ্ছা, লংগদুর মতো একটা প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে ভালো করে বিদ্যুতও যায়নি এখনও, সেখানের এক ইউনিয়ন যুবলীগ নেতার কী এমন প্রভাব থাকতে পারে? নয়ন মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। তার প্রভাব পতিপত্তি ছিল না। কিন্তু চমৎকার ফুটবল খেলতো লোকটা। এ কারণে পুরো রাঙামাটির মানুষ তাকে চিনতো, স্নেহ করতো। তার হত্যাকে কেন্দ্র করে পাহাড়িদের ওপর হামলার মূল হোতা যারা, তারা নিশ্চিতভাবেই মানুষের এই নরম জায়গাটা ব্যবহার করেছে।

কিন্তু এই ঘরপোড়ানো নিয়ে অপপ্রচার হয়েছে। পাহাড়ি অনেকে অপ্রয়োজনীয় ছবি প্রচার করেছেন। আর কিছু বাঙালির আচরণ ছিল অদ্ভুত। যেন এমন কিছুই হয়নি। পাহাড়িরা নিজেদের ঘরে নিজেরা আগুণ দিয়েছেন! কী নির্মম রসিকতা।

এখন পর্যন্ত খুন হওয়া মোটরসাইকেল চালক নয়নের হত্যা রহস্য মোটামুটি উদঘাটিত হয়েছে। জাঁদরেল গোয়েন্দা কর্মকর্তা সন্তোষ চাকমা এই তদন্তের প্রথমসারিতে ছিলেন। তিনি দায়ীদের খুঁজে বের করেছেন। তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দীঘিনালার মাইনি নদী থেকে নয়নের মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছেন। কিন্তু আশ্চর্য্য! কিছু পাহাড়ি এখনও এই তদন্ত বিশ্বাস করতে রাজি নন। বাঙালিরা নিজেদের লোককে খুন করে পাহাড়িদের ওপর চাপিয়েছেন! রসিকতার শেষ কোথায়?

সবশেষে কিছু আশার কথা শুনিয়ে যাই।

গত পাঁচ বছরে পাহাড়ে ১২-১৪ জন বাঙালি মোটরসাইকেল চালককে হত্যা করা হয়েছে। এসবের কোনটিরই বিচার হয়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম আসতে শুরু করেছে কয়েক মাস আগে সাদেকুল হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। সেবারই প্রথম কাউকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। এবার নয়ন হত্যাকাণ্ডেও অগ্রগতি হয়েছে অনেকখানি। আমি মনে করি, পাহাড়ের অনেক সমস্যার জন্য দায়ী বিচারহীনতার পরিবেশ। বিচারহীনতা অবসানে এসব আসলেই দারুণ অগ্রগতি।

এবার লংগদু ঘরপোড়ানোর ঘটনায় ২৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। যদিও “অজ্ঞাত”দের বিরুদ্ধে মামলা করে রাষ্ট্রও “কালেকটিভ পানিশমেন্টে”র পথ বেছে নিয়েছে, তবুও আমি মনে করি প্রত্যেকটি হামলায় এভাবে দায়ীদেরকে বের করে আনতে পারলে অনেক অনাচারের অবসান ঘটবে।

লংগদুর উত্তেজনার মধ্যেও অনেক শিক্ষিত বাঙালি ছেলে চেষ্টা করেছে সবাইকে দমাতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাদের মনঃকষ্ট ছিল অপরিসীম, বিশ্বাস করুন। কালকে চাকমা বন্ধুটার সামনে দাঁড়াতে কেমন লাগবে, তা নিয়েই হয়তো যন্ত্রণায় ভুগছিল তারা। উত্তেজমার ঢামাঢোলে আবার খবর আসে, এক বাঙালির লাশ ভাসছে নদীতে। এবারও এগিয়ে যায় তারা। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজনকে চিনি, যারা এই উত্তেজনা নিরসনে ভূমিকা রেখেছেন।

এর চেয়েও ভালো খবর আছে।

লংগদুর প্রাথমিক বিদ্যলয়ের বাঙালি শিক্ষকরা তাদেরই পাহাড়ি সহকর্মীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেন। এই পাহাড়ি শিক্ষকদের অনেকেরই ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে ওই হামলায়। পরে তিন জেলার বাঙালি শিক্ষকরাই এই উদ্যোগে যোগ দেন।

মথুরা ত্রিপুরা জানিয়েছেন, খাগড়াছড়িতে প্রাথমিকভাবে পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে গঠিত ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কমিটিতে প্রস্তাব উঠেছে ‘ক্ষতিগ্রস্তদেরই যখন ত্রাণ দেয়ার উদ্যোগ হচ্ছে সেখানে নয়নের পরিবারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

আমি মনে করি, সব কিছু ছাপিয়ে এগুলো হলো আসল খবর। এই সাম্প্রদায়িক অগ্নিবাষ্পে বসবাস করে এই উদারতা দেখানোটা আসলেই বিশাল ব্যাপার। পাহাড়ের হিংসা-ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের জন্য এটা একটা চপেটাঘাত। যেই অঞ্চলে বিভাজন ও বিভাজনে উস্কে দেওয়াটাই ক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়, সেই অঞ্চলে এসব ছোট ছোট ভালোবাসা অনেকটা যুদ্ধশেষে এক পশলা বৃষ্টির মতোই অপার্থিব।

নাজমুল আহসান : তরুন সাংবাদিক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ

১টি কমেন্ট

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button
%d bloggers like this: