পাহাড়ের অর্থনীতিব্রেকিংরাঙামাটিলিড

‘রেড লেডি’তে চোখ পাহাড়ের কৃষকের

নতুন প্রজাতির পেঁপেতে আশার আলো

পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া চাষ উপযোগী হওয়ায় এবং স্বল্প সময়ে অধিক লাভবানের আশায় বিদেশী জাতের ‘রেড লেডি’ পেঁপে চাষে ঝুঁকছেন পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষক। বিগত কয়েকবছর ধরে পাহাড়ের কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাতের এই পেঁপে চাষ করছেন। ফলন আশানুরূপভাবে ভালো হওয়ায় দিনদিন চাষাবাদের পরিমাণও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে পাহাড়ের অনেক বেকার যুবক ও প্রান্তিক কৃষক পেঁপে চাষে আরও উৎসাহী হবেন এবং পাহাড়ের কৃষিতে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে এই উদ্যান ফসলটি।

রাঙামাটির লংগদুর উপজেলার বগাচত্বর ইউনিয়নের বৈরাগীবাজার এলাকার কৃষক মমিনুল হক। গেল বছরের (২০১৯) ডিসেম্বরে নিজের এক একর জমিতে চাষ করছেন তাইওয়ানের উচ্চ ফলনশীল বামন প্রজাতির রেড লেডি পেঁপে। ইতোমধ্যে তাঁর বাগানের নয় শতাধিক গাছে ফলন ধরেছে। ফলন হবে ২৮-২৯ মেট্রিক টনের মত। আগস্ট মাসের মধ্যেই পাঁকা শুরু করবে উচ্চ ফলনশীল এই উদ্যান ফসলটি। মমিনুলকে দেখে পেঁপে চাষে ঝুঁকছেন একই এলাকার অন্যান্য কৃষকরা।

রেড লেডি পেঁপে চাষী মমিনুল হক বলেন, মাকড়োসা ও ছত্রাক ছাড়া পেঁপে বাগানে তেমন কোনো রোগাবালাই লক্ষ্য করা যায় না। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ পেঁপে চাষে ভাগ্য বদলে ফেলা যায়। আমার আশপাশের এলাকার আরও ১০-১২ জন কৃষক রেড লেডি পেপে চাষ করছেন। তবে উপজেলার মধ্যে আমিই কেবল এক একর জমিতে বড় পরিসরে চাষ করেছি। পাহাড়ি এলাকায় হওয়ার কারণে শ্রমশক্তিসহ সব মিলিয়ে খরচ বেশি পড়ছে। এ পর্যন্ত নয়শতাধিক গাছের পেছনে আমার ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে ফল পাঁকলে ৬০-৭০ টাকা কেজি হারে পেঁপে বিক্রয় করা যাবে। বিক্রয়ের ব্যাপারে বেশ কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ চলছে।

মমিনুল আরও বলেন, আমার ও অন্যদের দেখাদেখি এলাকার অনেকেই চাষ করার আগ্রহ করেছে। পেঁপে চাষে অর্থনৈতিকভাবে সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের অনেক বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। শিক্ষিত হয়েও বেকার যুবকরা যদি চাষাবাদে আগ্রহী হয় এতে বেকারত্ব কমবে তারাও লাভবান হবেন। কিন্তু খরচ বিবেচনা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে অনেকেই এগিয়ে আবার পিছিয়ে পড়ছে। এ ব্যাপারে যদি উদ্যোক্তাদের কৃষি ঋণ দেয়া হয় এবং কৃষি বিভাগ সহায়তা করে তাহলে বেকারত্ব কাটিয়ে চাষীর সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে।

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া এলাকার বাসিন্দা জনি বড়ুয়া। অন্যের দেখাদেখি এই যুবক নিজেও রেড লেডি চাষে আগ্রহী। জনি বড়ুয়া বলেন, সঠিক সময় ও পর্যাপ্ত পরিচর্যা করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই রেড লেডি জাতের পেঁপে চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। আমার পরিচিত অনেকেই চাষাবাদ করছেন। আগামীতেও আমি চাষাবাদ করার চেষ্টা করছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রেড লেডি জাতটি মূলত তাইওয়ানের উচ্চ ফলনশীল বামন প্রজাতির পেঁপের জাত। এটিই বাংলাদেশে বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় চাষাবাদের জন্য বেশ উপযোগী। বিশেষত এই জাতের পেঁপের চারা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বীজ বপনের উত্তম সময়। বপনের ৪০-৫০ দিন পর অর্থাৎ দেড় থেকে দুই মাস চারা রোপণ করা হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখতে ২ মিটার। গাছের উচ্চতা ৬০-৮০ সেমি হলে ফলন ধরা শুরু হয়। রোপণের পর প্রথম ফল পাওয়া যায় ৭-৯ মাসের মধ্যেই। প্রতিটি পেঁপে গাছ থেকে প্রায় ৫০-১২০টি ফল পাওয়া যায়। ফলনের ওজন হয়ে থাকে দেড় থেকে দুই কেজি পর্যন্ত। এই জাতের পেঁপের জীবনকাল দুই বছরের অধিক।

সূত্রে আরও জানা গেছে, এই জাতের পেঁপে চাষাবাদে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার প্রয়োগ ও পরিচয়া করতে হয়। প্রথম দিকে চারা লাগানোর পর নতুন পাতা গজালে ইউরিয়া ও এমপি সার ৫০ গ্রাম করে প্রতিটি গাছে ১ মাস অন্তর-অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। গাছে ফুল আসলে এ মাত্রা দ্বিগুণ হবে। শেষ ফল সংগ্রহের আগেও সার দিতে হবে। এছাড়া বাগান সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গাছের গোড়া থেকে আগাছা তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। গাছের গোড়ার মাটি কোদাল দিয়ে উর্বর করে দিতে হবে। গাছে অতিরিক্ত ফল ধরলে কিছু ফল ছিড়ে নিয়ে হালকা করে দিলে বাকি ফলগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যথায় ফলনের ভারে গাছ হেলে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাঙামাটি কার্যালয়ের তথ্য মতে, বিগত কয়েকবছর ধরে রাঙামাটির লংগদু, খাগড়াছড়ির রামগড় ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাতের এই পেঁপে চাষ করছেন। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও অনেকেই রেড লেডিসহ দেশীয় জাতের পেঁপে চাষ করে থাকেন। চলতি মৌসুমে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় ১ হাজার ৬৭৮ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হয়েছে। এর আগের মৌসুমে রাঙামাটিতে ১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হয়েছে। এক বছরেই চাষাবাদ বেড়েছে ৩ হেক্টর জমিতে। এছাড়া অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে পারিবারিকভাবে স্বল্প পরিসরে চাষাবাদ করায় কৃষি বিভাগের কাছে সব তথ্য নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাঙামাটি কার্যালয়ের উপপরিচালক পবন কুমার চাকমা জানিয়েছেন, রাঙামাটিতে কয়েকবছর ধরে দেশীয় জাতের পাশাপাশি বিদেশী জাতের রেড লেডি পেঁপে চাষ হচ্ছে। দেশীয় জাতের চেয়ে এ জাতটি উচ্চ ফলনশীল হওয়ায় দিনদিন কৃষকরা রেড লেডি চাষে ঝুঁকছেন। এ মৌসুমে লংগদু উপজেলার একজন কৃষক এক একর জমিতে নয়শতাধিক রেড লেডি পেঁপে চাষ করেছেন। সঠিকভাবে ফলন তোলা গেলে তিনি ক্ষেত থেকে ২৮-২৯ টন ফলন উৎপাদন করতে পারবেন। যার বাজারমূল্য হতে পারে প্রায় সাত লাখ টাকা।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button