ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

রাজধানীর বুকে একখন্ড পাহাড় ‘পার্বত্য কমপ্লেক্স’

পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সম্প্রীতি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই অঞ্চলে আর কোনো সংঘাত নয়, পাহাড়ে যেন শান্তি বজায় থাকে। এই শান্তির পথ ধরে আসবে প্রগতি। প্রগতির পথ ধরে আসবে সমৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।’ রোববার রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর মাত্র সাড়ে তিন বছর জাতির পিতা দেশ শাসনের সময় পেয়েছিলেন। এই সময়কালে তিনি তিনবার পার্বত্য চট্টগ্রামে যান। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি আলাদা বোর্ড গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পর আর তা অগ্রগতির মুখ দেখেনি।’

‘জাতির পিতা হত্যাকান্ডের পরপরই মূলত ১৯৭৬ সালে এই এলাকা সংঘাতময় হয়ে ওঠে। বিশ বছর ধরে এই এলাকা ছিল অবহেলিত। আমি ভাবলাম এরা আমার দেশের নাগরিক। সুতরাং এরা অবহেলিত থাকুক আমরা তা চাই না।’- বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের জন্য তিন সদস্যের কমিটি করি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ কেন সেটার কারণ খুঁজতে চেষ্টা করি। আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, এই সমস্যাটি রাজনৈতিক সমস্যা। সুতরাং রাজনৈতিক সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে মীমাংসা করতে হবে। মিলিটারি দিয়ে এটির সমস্যার সমাধান হবে না। আমরা তৃতীয় পক্ষের কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই পার্বত্য শান্তিচুক্তি করতে সক্ষম হই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘোরার। সব জায়গায় আমি বাবাকে নিয়ে, মাকে নিয়ে ঘুরেছি। মাচালং যাওয়ার চেষ্টা করি, ছোট হরিণ্যা, বড় হরিণ্যায় ঘুরেছি। আমি দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এখানকার মানুষগুলো অনেক সহজ-সরল। সেই জায়গায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে পারে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এসে কমিটি করি। তৃতীয় পক্ষের সমঝোতা ছাড়া শান্তিচুক্তি করি। শুধু শান্তিচুক্তি নয়, শান্তিচুক্তির পাশাপাশি ১৮ জন অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। আমি কোনো প্রটোকল ছাড়াই তাদের কাছে গিয়ে অস্ত্রগুলো বুঝে নিই। আমরা তাদের চাকরি ও পুনর্বাসন করি। তারা যে দাবি করেছে, সে দাবি অনুযায়ী ভারত থেকে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসন করি।’

‘আমরা শান্তিচুক্তির অধিকাংশ শর্ত বাস্তবায়ন করেছি। কিছু চুক্তি চলমান আছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, আবাসিক স্কুল, হাসপাতাল মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা করেছি। যে সব জায়গায় বিদ্যুত পৌঁছানো যায়নি আমরা সে সব জায়গায় সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানকার জমি অধিগ্রহণের জন্য যে সমস্যা দেখা দেয় তা হলো তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সেভাবে দেওয়া হয় না। কারণ ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে। ব্রিটিশ আইনে যাই থাকুক না কেন আমাদের আইনের বিষয়টি মাথায় নিয়ে যদি তাদের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা যায় তাহলে এ সমস্যা হয় না। এখানকার অধিবাসীরা নিজ নিজ ভূমির অধিকার নিয়ে বসবাস করবেন সেটাই আমরা চাই।’

তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা কোটা বাতিল করেছি। পিএসসিকে নির্দেশ দিয়েছি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী যারা আছে, তারা যেন সবসময় অগ্রাধিকার পায়। ২০ বছরেও এলাকার উন্নয়ন হয়নি, আমরা বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম করেছি। আমরা আবাসিক স্কুল করে দিচ্ছি। যাতে পাহাড় বেয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলেমেয়েদের কষ্ট করতে না হয়।’

‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিজ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য মারা গেছেন। বর্ডারগুলোয় আমরা নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করেছি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় না থাকলে উন্নয়ন করা যায় না। আমি নিজেও অনেক জায়গায় গিয়েছি। যেখানে বিদ্যুৎ নাই সেখানে আমরা সোলার প্যানেল করে দিয়েছি।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ জায়গা আমি চিনি। ছোটবেলায় আমরা খেলাধূলা করেছি। অফিসার্স ক্লাব জায়গা কেড়ে নিতে চেয়েছিল এমনকি মামলা পর্যন্ত করেছিলো। সেই মামলা ঠেকিয়ে এই জমি পেয়েছি। কাজেই আমি আশা করি এই ভবনকে সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।এই কমপ্লেক্সের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যে যাতে কেউ এখানে দাঁড়ালে মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে দাঁড়িয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকবে না। আর আমাদের দেশেরও এখন কিন্তু অনেক মানুষ ট্যুরিস্ট হিসেবে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে যায় এবং সকলে অবাক হয়ে যায়, আমাদের বাংলাদেশে এত সুন্দর একটা জায়গা আছে। কাজেই আপনারা এই জায়গা আরও সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বাস করি। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব। এটাই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। তাই বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী যারা যেখানেই আছে প্রত্যেকেরই উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। আলাদা ফান্ড আছে। সে ফান্ড থেকেও টাকা দিয়ে থাকি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা সকলেই ভালো থাকবেন। আমি সেটাই চাই। আর কোনো সংঘাত না। শাস্তিচুক্তি আমরা করেছি। সেই শান্তি যেন পাহাড়ে বজায় থাকে। আর শান্তির মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। কাজেই শান্তির মধ্যেই আসবে প্রগতি। প্রগতির মধ্য দিয়ে আসবে সমৃদ্ধি। আর সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে আমরা গড়ে তুলব ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ। যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়েছিলেন।’

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। সভাপতির বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিলট্র্যাকস’ বলে আখ্যায়িত করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত বক্তব্য রাখেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মো. আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নূরুল আমিন।

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সমতলের মানুষের পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরির উদ্দেশ্যে নির্মিত ‘শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকার ৩৩ বেইলি রোডে নির্মিত ওই কমপ্লেক্স উদ্বোধন করেন তিনি। ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য ঐতিহ্যমন্ডিত ‘শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স’র যাত্রা শুরু হলো। যা ২০১৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হয়। (সারাবাংলা.নেট)

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button