পার্বত্য পুরাণব্রেকিং

রাঙ্গাচানের ফাঁরাদঝা

“দঝা জানেই শুনেই ন এঝে”*
রাঙ্গামাটি’র বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী (ভারতের মিজোরাম প্রদেশ) ফালিট্যাংগে চোগ’র পূর্ব মোন আদামে রাঙ্গাচানের জন্ম।
যেদিন রাঙ্গাচান ভূমিষ্ট হয় সেইদিন ছিল পূর্ণিমা তিথি। যেন আসমান থেকে পূর্ণিমার গোল চাঁদটা ফালিট্যাংগে মোনে নেমে এসে গোটা পাহাড়টাকে ফকফকা করে রেখেছিল। তাই তাঁর বাবা শশী মোহন সোহাগ করে প্রথম পুত্রের নাম রেখেছিল ‘রাঙ্গাচান চাকমা’। চাকমা ভাষায় ‘রাঙ্গা’ হলো রঙ্গিন বা লাল, আর ‘চান’ মানে চাঁদ। অর্থাৎ রঙ্গিনচাঁদ। সত্যি সত্যি
রাঙ্গাচানের মন পূর্ণিমার চাঁদের মতো হলেও অথচ এখন তার দু’চোখ ভরা অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। তাঁর দুঃখে গাছপাতা কান্দে, কান্দে বনের কোকিল। বেচারার খুব আউস অয়ছিল এবার বিজুতে এক বোতল বিদেশি দুচুনি কিনবে। রাঙ্গামাটিতে তার পরিচিতজন যতন’দার মার্কেটের চিংটিং নামক মদের দোকানটি সে চেনে। এই পথ দিয়ে সে তাঁর সওদাগরের বাসায় প্রায় আসা যাওয়া করে। কিন্তু কোনদিন দোকানটিতে ঢুকার সাহস করেনি। একবার যতন বাবুর অনুপস্থিতিতে তাঁর একটি জোত পারমিট তাঁর অনুরোধে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডি এফ ও) কতৃক তদন্ত কালীন সময়ে নিজে উপস্থিত থেকে সহযোগিতা করেছিল। তাই তার যতন’দা খুশি হয়ে জোর করে রাঙ্গাকে বিদেশি মদ খাইয়েছিল। সাথে নিজ হাতে ‘চুমোগোরান’,’বদা হেবাং’,’মাজ চেইক্কা’ আরও কয়েক পদের ‘খাজি’ও বানিয়েছিল। সেই ‘ধুপ দুচুনি’ কেমন যেন ‘মিদে মিদে’; নাকে ‘বেলগুলোর ‘তুমবাচ্’ পেয়েছিল। তখন থেকে তার মাথায় ঢুকে ছিল আস্ত একটা বোতল কিনে তার বন্ধু গোলচোগা ও মঙ্গল্যে’কে নিয়ে ইচ্ছেমতো খাবে এবার বিজুতে। তাই আগেভাগে ওদেরও বলে রেখেছিল। কিন্তু রাঙ্গাচানের আশা গুড়ে বালি।
রাঙ্গাচান অতি সহজ-সরল নির্ভেজাল ভালো মানুষ। পাহাড়ি বাঙ্গালি সকলের কাছে খুব প্রিয়। সবাই জানে; তাকে টাকা দিয়েও কোনদিন মিথ্যে কথা বলানো যাবেনা। কারো সাথে সাতপাঁচে নেই। তবে মাঝেমধ্যে পেটে দু’চার পেগ অর্গানিক দুচুনি পরলে তখন অনবরত ঢাবা (বাঁশের হুক্কা) টানতে থাকে আর মুখ থেকে খৈয় ফুটে ইংরেজি। টুকটাক কাঠের ব্যবসার সুবাদে ফরেস্ট অফিসে আসাযাওয়া আছে। বরকল বাজারের বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসের লোকজনও তাঁকে খুব সমাদর করে। তারা তাঁকে মন্ত্রী বলে ডাকে অর্থাৎ ‘জোত মন্ত্রী’। নামটি দিয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় এক বন কর্মকর্তা। তখন থেকে রাঙ্গাচান হয়ে গেলেন মন্ত্রী।
রাঙ্গাচানের জোত বাগানের ইস্যুকৃত জোত পারমিটের গাছ কাটা শেষ হয়েছে। লেকের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, বিজুও অতি সন্নিকটে। তাই বন বিভাগের লোকজনকে অনুরোধ করে নিজেও খেটেখুটে জোতের কাটা গাছের পাস মার্কিং করিয়েছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা বনরুপার বন বিভাগের ডিভিশন অফিসে সাইজ লিস্ট জমা দিয়ে ডি ফরম বই নেয়ার অপেক্ষায় আছেন। বরকল থেকে রেঞ্জ কর্মকর্তার সাথে রাঙ্গাচানও লঞ্চে করে রির্জাব বাজার লঞ্চঘাটে এসে নামলো। এসময় রেঞ্জ কর্মকর্তার মোবাইলটা বেজে উঠলো। রাঙ্গাচান শুনলো ফরেস্ট অফিসে আগুন লেগেছে সব জ্বলেপুড়ে ছায় হয়ে যাচ্ছে। তারা তাড়াহুরো করে একটি সিএনজি রির্জাব করে বনরুপা চৌমুহনীতে এসে নামলো। সে দেখলো হাজার হাজার মানুষ বন বিভাগের দিকে দৌঁড়াছে। সেও উত্তর বন বিভাগের দিকে দৌঁড়ে এগিয়ে গেল। দেখতে পেল চোখের সামনে সবকিছু পুড়ে ছায় হয়ে যাচ্ছে। রাঙ্গাচান কি করবে ভেবে উঠতে পারেনা। এখন তার কি হবে এসব ভাবতেই অজান্তেই চোখ থেকে কয়েক ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে বুকে ঝরে পড়লো।
ইতিমধ্যে আরো দুই সপ্তাহ কেটে গেল। রাঙ্গাচান ভাবতে লাগলো লেকের মধ্যে যেন ‘দেবাংশি’ নেমেছে, পানিগুলো সব চুষে খাচ্ছে। নয়তো প্রতিদিন এতো পানি যায় কয়? হু হু করে শুকিয়ে যাচ্ছে লেকের পানি। রাঙ্গাচানের বুকও যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই ভেসে উঠছে নতুন নতুন ধানি জমি। এক মৌসুম চাষযোগ্য ধানিজমি ভেসে উঠলে অন্যান্য বছর মন আনন্দে নেচে উঠতো। এবার দুশ্চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলছে। পানি থাকতে বোটে কাঠ ভরতে না পারলে ধোলাই খরচ অনেক টাকা বেড়ে যাবে। যা লাভ হবে তার দ্বিগুণ টাকা কর্জ হবে। তাই রেঞ্জ কর্মকর্তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে ডি ফরম লেখতে লেখতে পাস মার্কার সাইজ লিস্টের ফটোকপি নিয়ে বোট লোড করে ফেললো। বাবুধনদের সাথেও দফারফা করে দুই-তিন দিনের মধ্যে বোট চেক করিয়ে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছাবে। এমনটাই সব ঠিকঠাক করে রেখেছিল। সেও রাঙ্গামাটি’র বনরুপা বাজারে যাবে। সওদাগর থেকে টাকা নিয়ে পরিবারের জন্য সামান্য কিছু বিজুর বাজার করবে; আর কিনবে এক বোতল বিদেশি দুচুনি (দেশে তৈরি হলেও বোতলজাত ও ইংরেজি অক্ষরে লেখা লেবেল দেয়া বলে অনকে বলে বিদেশি)।
সারাবিশ্বে মহাদুর্যোগ শুরু হয়েছে। মানবজাতি কোভিড ১৯- করোনা নামে নতুন এক মহামারির সংকট অতিক্রম করছে। তাই সরকার সারাদেশে সমস্ত অফিস অাদালতসহ সবকিছু ‘লক ডাউন’ (বন্ধ) করেছে। রাঙ্গাচানও মোবাইলে সংবাদটি পেয়েছে। তার মাথায় যেন বজ্র পরেছে। একটার পর একটা বাঁধা বিপত্তি। এদিকে বাবুধনদের রয়েলটিও বাকি, তারা বার বার মোবাইলে কল দিয়ে তাকে অস্থির করে তুলেছে। তাদের অনুমতি না নিয়ে কেন বোট লোড করেছে? এক সপ্তাহের মধ্যে রয়েলটির সাথে জরিমানাও দিতে হবে। হুমকিধামকি দিয়ে জানিয়ে দিল ২০ তারিখের মধ্যে তাদের প্রাপ্য না মিঠালে বোট যেতে দেবেনা। তাইতো অনেকে দুঃখ করে বলেন- বড় বাবু, পুরোন বাবু, নোয়া বাবু, চিদিরে কতো রকমের বাবুযে আছে, সৃষ্টি হয় এখানে! বাবু’র যেন শেষ নাই। ওদের পাহাড়-অরণ্য প্রেম অতি তীব্র- ঝাঁঝালো !
পাহাড়ের রাজনীতি বড়ই জটিল সমীকরণ ও কুটিল । এখানে নিজ দেশীয়, ত্রিদেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলে বলে বিজ্ঞজনরা বলেন-লেখেন। কথায় আছেনা- ‘বাঘে মোষের লড়াই’ এখানে ঠিক তাই, তবে নিজ নিজ স্বার্থের বেলায় আবার ‘এক ঘাটে জল খায়।’ ভাগবাটোয়ারায় কতো আপন; যেন মায়ের পেটের ভাই। তাইতো চাকমা দাঘ’ কধা’য় বলে “টেঙায় মানয্যরে বেঙা গড়ে”।* “পাহাড় বাহ্যিকভাবে যতটা সুন্দর দেখায় তার চেয়ে বেশি হিংস্র ও ভয়ঙ্কর।” সমতলে যাদের বসবাস তারা বুঝবেনা এখানে “আদেশ অমান্য করা মানে কঠিন শাস্তি। সত্য কথা বলা মানে প্রাণ সংহার, নয়তো চিরতরে নিরাকার। কেউ দায়ও স্বীকার করেনা, করবে না।” কাউকে দায়ীও করা যাবেনা। পাহাড়ে যারা থাকেনা তারা কখনও বুঝবে না “এখানে কত রক্ত নদী বয়ে গেছে, বয়ে চলছে!” রাঙ্গাচান ‘গাভুর’ বয়স থেকে এইসব শুনে আসছে; কিছু কিছু নিজ চোখেও দেখেছে। এমনিতেই সে অতি নরম প্রকৃতির খুব সাদাসিধা মানুষ। তার ক্ষতি হলেও কাউকে সে কোনদিন শক্ত করে কোন কথা বলতে পারেনা। সবসময় চেষ্টা করে সব ঝামেলা এড়িয়ে চলতে। সকল অস্ত্রধারীদের সে খুব ভয় পায়। তাই তাদের থেকে যদ্দুর সম্ভব দূরে থাকতে চায়।
সে এখন বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে? রাঙ্গাচানের স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, পুতের বৌ কেউ কেউ ঘরের ভেতর-বাইরে নানান সাংসারিক কাজে ব্যস্ত। কয়েকজন খোলা বারান্দায় নানান গল্পে মেতে উঠেছে। নাতি-নাতনিরা উঠানে ‘ঘিলা খারা’ খেলছে । রাঙ্গাচান হঠাৎ কোত্থেকে এসে ঘরের সামনের উঠানে বুক চাপড়িয়ে চাপড়িয়ে ধড়ফড় করে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে থাকে। আর চিৎকার করে বলতে থাকে “মর হবাল কারাব, মর হবাল কারাব। হরোনা নয় হরোনা নয়; ম’রে ‘ফারাদঝা’ পেইয়ে দে, ফারাদঝা পেইয়ে দে …….মুই আর ন বাজিম…………..”
০৯.০৪.২০২০
শব্দ টিকা :
*মোন আদাম – পাহাড় চুড়ায় অবস্থিত গ্রাম।
*চুমো গোরান – কাঁচা বাঁশের চোঙ্গায় মাছ/মাংস রান্না।
*বদা হেবাঙ – কলা পাতায় রান্না করা ডিম।
*মাজ চেইক্ক্যে – আগুনের তাপে ছেঁকা মাছ।
*ধুপ দুচুনি – ভাত থেকে তৈরি দুইবার পরিশোধিত সাদা রঙের পাহাড়ি মদ।
*মিদে মিদে – মিষ্টি মিষ্টি।
*তুমবাচ – সুগন্ধি
*খাজি – মদের সাথে পরিবেশন করা তরকারি।
*গাভুর – যুবক।
*দেবাংশি – পানির দেবতা।
*ঘিলা খারা – ঘিলা খেলা, ‘ঘিলা’ এক জাতীয় জংলী লতার চেপ্টা বিচি।
দাগ’ কধা- [চাঙমা প্রবাদ-প্রবচন।]
*”দঝা জানেই শুনেই ন এঝে।”
[ফাঁড়াদশা- অর্থাৎ বিপদ আগেই থেকেই জানান দিয়ে আসে না।] দেওয়ান ১৯৭৪ : ২৩৮
*”টেঙায় মানয্যরে বেঙা গড়ে”
[কুপথে আয়কৃত টাকা মানুষের মানবতা হরণ করে।]
শাওন ফরিদ : কবি,গবেষক,পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন ও সংস্কৃতি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থের লেখক
MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button