করোনাভাইরাস আপডেটরাঙামাটি

রাঙামাটি পিসিআর ল্যাবের প্রাণভ্রমরা ওরা ৮ জন

সাহসের ডানায় ভর করেই লড়াই ওদের

সুহৃদ সুপান্থ
মহামারি কোভিড যখন সারা বিশ্বের মানুষকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে,তখন সাক্ষাৎ দেবদূতের ভূমিকায় যেনো সারাদেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ব্যতিক্রম নয় পার্বত্য রাঙামাটিও। তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাঙামাটিবাসির জন্য সম্ভবত সবচে কঠিন কাজটিই করছেন রাঙামাটি পিসিআর ল্যাবে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

সেই সকাল থেকে রাত ৯ টা বা ১০ টা অবধি টানা কাজ করে রাঙামাটিবাসির জন্য রিপোর্ট প্রস্তুতি করছেন ল্যাবে কর্মরত কিছু অসাধারন তরুন তরুনী। সংখ্যায় তারা মাত্র আটজন।

সেই শুরু থেকেই ল্যাবের ইনচার্জ হিসেবে আছেন ডা: শাইনী তালুকদার। রাঙামাটির সন্তান ও ৩৯ তম বিসিএস চিকিৎসক হওয়া শাইনী দেশের বিরল ভাইরোলজিস্টদের একজন। রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা তালুকদারের সন্তান রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েওর দ্যুতি ছড়ানো ছাত্রী। নিজের শহর আর নিজের মানুষদের জন্য নিজেকে সবচে কঠিন এক দায়িত্বে সমর্পন করে গত ৩৬৫ দিন ধরেই কাজ করে চলেছেন এই ল্যাবে। মূলত: ল্যাবের প্রাণ’ই সে। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ল্যাবের সকল কাজ।

তার সম্পর্কে সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা বলেছেন-‘ সে শুধু অত্যন্ত মেধাবীই নয়, সে দেশের বিরল ভাইরোলজিস্টদের একজন। সে না থাকলে আমরা বাইরে থেকে এই সংকটকালে কাউকে আদৌ আনতে পারতাম কিনা কিংবা ল্যাবই চালু করতে পারতাম কিনা জানিনা। তার মেধা, প্রজ্ঞা এবং নিবেদিত মানসিকতাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই।’

প্রতিদিন সকালে সকল কর্মচারি একসাথে ল্যাবে ঢোকেন এবং একসাথে বের হন। নাওয়া খাওয়া ভুলে নিমগ্ন থাকেন কাজে। যেনো অন্য এক যুদ্ধে নিয়োজিত সবাই। সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত আমরা কাজ করি।

মেডিকেল টেকনোজিষ্ট মো: শোয়েবুর রহমান বলেন, ‘এই পিসিআর ল্যাব রাঙামাটিবাসির একটি স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি সত্য হয়েছে পবন স্যারের জন্য। কিন্তু এই ল্যাবটি পরিচালনার সব কৃতিত্ব আামাদের সিএস স্যার এবং ইনচার্জ শাইনী ম্যাডামের। এই কাজে জীবনের ঝুঁকি হয়ত আছে, কিন্তু নিজের জেলার মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি, এটা অনেক গর্বের।’

পিসিআর ল্যাবের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মাসুদ রানা শাকিল বলেন-‘ আমাদের সিএস স্যারের সার্বক্ষনিক নির্দেশনায় এবং ইনচার্জ ম্যাডামের নেতৃত্বে এই পিসআর ল্যাবে কাজ করাটা আমার জীবনের অনেক বড় একটি ঘটনা। আমার সব সময়ই মনে হয়েছে, আমি আমার জেলার মানুষের জন্য কিছু একটা করছি, একটা মহৎ কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি,কখনো কখনো রাত ৯/১০ টা পর্যন্ত আমরা কাজ করি,কাজ করা অবস্থায় কোনকিছু খাওয়াও যায়না। এখনতো পরিস্থিতি অনেক খারাপ,অনেক রোগি,প্রচুর রিপোর্ট তৈরি করতে হয়,শুক্রবারও কাজ করতে হয়। অনেক কষ্ট,তবুও ক্লান্তি আসেনা। পুরোটা সময় আমাদের ছায়া দিয়ে আগলে রাখেন আমাদের সিভিল সার্জন স্যার।’

রাঙামাটি পিসিআর ল্যাবের ইনচার্জ ডা: শাইনী তালুকার বলছেন-‘ ২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে আমি রাঙামাটিতে বদলী হয়ে আসি। সারাদেশে করোনার সংক্রমন বিস্তৃতি শুরু হলে রাঙামাটিতে পিসিআর ল্যাব স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। আমি যেহেতু ভাইরোলজি নিয়ে পড়াশুনা করেছি সঙ্গত কারণেই সিভির সার্জন স্যার যখনই আমাকে বলেছে পিসিআর ল্যাবের দায়িত্ব নিতে পারব কিনা, আমি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেছি। কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ, তবে নিজের লব্ধ জ্ঞানকে নিজের এলাকার মানুষের কাজে লাগাতে পারছি এতে আমি নিজেই খুশি এবং এক ধরণের ভালো লাগাও কাজ করছে।’

পিসিআর ল্যাব পরিচালনায় সিভিল সার্জনের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার কথা কৃতার্থ চিত্তে স্মরণ করে তরুণ এই চিকিৎসক বলেন, ‘ স্যারের সার্বক্ষণিক গাইডলাইন ও মনিটরিং ছাড়া এই ল্যাব পরিচালনা করা অসম্ভব ছিলো। কারণ এটির পরিচালনার পদ্ধতিটি দেশের অন্যান্য ল্যাবের মত নয়। যেহেতু এটি বেসরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত,তাই প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামোও নাই। স্যার সবকিছু ম্যানেজ করছেন,আউটসোর্সিং এর স্টাফের বেতন থেকে শুরু করে আমাদের সকল প্রয়োজনের সংস্থান স্যারই করছেন বলে আমরা নির্বির্ঘ্নে কাজটি করে যেতে পারছি।’

‘তবে ল্যাবের জনবল পর্যাপ্ত নয়’ জানিয়ে ডা: শাইনী বলেন,‘ এখানে আমরা মাত্র ৮ জন আছি। এদের মধ্যে তিনজন টেকনোলজিস্ট, ১ জন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর,১ জন ডাটা সহযোগি, ১ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। অথচ আমাদের কনসালটেনট,টেকনোলজিস্ট এবং সাপোর্ট স্টাফ আরো দরকার। এখন পরীক্ষার চাপ বেড়েছে। এই জনবল দিয়ে সেই চাপ সামলানো কঠিন।’

অপ্রতিরোধ্য এবং বারবার বাঁক বদল করা এক মরণঘাতি ভাইরাসের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সার্বক্ষনিক কাজ করার এই সিদ্ধান্তটা বড্ড ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও কেনো কাজটি করার জন্য এত আগ্রহ দেখালেন?- প্রশ্ন করতেই আত্মপ্রত্যয়ী এক তরুণ চিকিৎসক দৃঢ় কন্ঠেই বলেন- দেখুন আমি যে পড়াশুনা করেছি, যে জ্ঞানটা অর্জন করেছি,তা যদি আমার জনপদের মানুষের কাজেই লাগাতে না পারি,তবে সেই শিক্ষার ভ্যালু কি ! আমি বরং অনেক খুশি যে, আমি আমার এলাকার মানুষের কাজে নিজের মেধা ও শ্রমকে ব্যবহার করতে পারছি।’ কী ভীষণ সুন্দর আর অসাধারন শোনালো এক চিকিৎসকের বিনয়ী অথচ দৃঢ় কন্ঠ !

ল্যাবে কর্মরত নিজের সহকর্মীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান সিভিল সার্জন ডা: বিপাশ খীসা বলছেন-‘ সীমিত জনবল,কম বেতনেও ওরা যে কাজটি করছে সেটি সচরাচর অসম্ভব, কঠিনই বৈকি। ল্যাবের প্রত্যেকের আন্তরিক কর্মপ্রয়াস,পরিশ্রম এবং কষ্টকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আমি। রাঙামাটিবাসির জন্য তাদের এই আন্তরিক প্রয়াস ‘অসাধারণ’। তারা সকাল থেকে রাত অবধি টানা দায়িত্ব পালন করছে,বন্ধের দিনেও কাজ করছে। আন্তরিকতা ও ভালোবাসা না থাকলে এটা অসম্ভব।’

রাঙামাটি পিসিআর ল্যাবে এখন ইনচার্জ ডা: শাইনী তালুকদারের নেতৃত্বে কাজ করছেন ল্যাব কনসালটেন্ট তুষার আহমেদ শিশির। তিনজন টেকনোলজিস্ট জুলি চাকমা,শোয়েবুর রহমান এবং রিতারেন চাকমা। ডাটা এন্ট্রি, রিপোর্র্ট তৈরি,এসএমএস প্রদানসহ দাপ্তরিক কাজ করছেন মাসুদ রানা শাকিল,ডাটা সহযোগি হিসেবে আছেন মীর হাসান তারেক এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে আছেন টিনা ত্রিপুরা।
এর আগে বিভিন্নসময় ল্যাবে কাজ করেছিলেন উচাহ্লা মারমা,তাপস,নিটল চাকমা এব মামুনুর রশীদ। বর্তমানে তারা ল্যাবে কর্মরত নেই।

এই ল্যাবে কর্মরত আউটসোর্সিং স্টাফদের প্রত্যাশা,যে ল্যাবে রাঙামাটিবাসির জন্য এমন প্রানান্ত লড়াই তাদের,সেই ল্যাবে তাদের চাকুরীটি যেনো স্থায়ী হয়। একইভাবে প্রেষণে আসা স্টাফদের প্রত্যাশা,বাড়তি শ্রম ও মেধার জন্য যদি তাদের সবার ন্যুনতম প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকত, বেশ হতো।

তবে সকল সীমাবদ্ধতা সংকট এবং বেদনাকে জয় করে দিনান্তে পার্বত্য একটি জেলার মানুষের জন্য কিছু মানুষের এইসব ত্যাগ এবং প্রানান্ত পরিশ্রমই হয়ত গড়ে দেয় মানুষের সাথে মানুষের পার্থক্য। মানবিকতা আর অমানবিকতার লড়াইয়ে শেষাবধি মানবিকতা জয়ের হাসি ফুটে এমনসব মানুষের নেপথ্য অবদানেই।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button