ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের ‘পাইরেটস্’ বিড়ম্বনা !

বিশাল পার্কের ভাড়া মাসে ৩ হাজার ! মেয়াদ শেষেও ছাড়তে নারাজ ভাড়াটিয়া !

ইংরেজি ‘পাইরেটস’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘জলদস্যু’,আর সেই ‘পাইরেটস’ নামেই এক রেস্টুরেন্ট নিয়ে বিড়ম্ভনায় পড়েছে রাঙামাটির পুরো জেলা প্রশাসন ! বছর তিনেক আগে পূর্বতন জেলা প্রশাসকের বরাদ্দ দেয়া সংরক্ষিত এলাকা হিসেবেই খ্যাত ডিসি বাংলোর ‘পার্ক’ এলাকায় নির্মিত এই রেস্টুরেন্ট এর সত্বাধিকারি দাবি করে খোদ জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেই চারটি মামলা দায়ের করেছেন এক নারী,যিনি পার্বত্য তিন জেলা থেকে মনোনীত সাবেক সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর জৈষ্ঠ্য কণ্যা। নাজনীন আনোয়ার নিপূণ নামের এই নারী জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুধু মামলাই নয়,সংবাদ সম্মেলন করেও তুলেছেন এন্তার অভিযোগ। এনিয়ে পুরো জেলা জুড়েই চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা,বিব্রত জেলা প্রশাসনও। পার্কের ভাড়াটিয়া বা ব্যবহারের অনুমতিপ্রাপ্ত না হয়েও,তার মামলা,সংবাদ সম্মেলন,অভিযোগে তোলপাড় জেলা জুড়ে।
বরাদ্দেই ‘গোলমাল’ : সংকটের শুরু যেভাবে
২০১৭ সালের ১৬ জুলাই জেলা প্রশাসনের ‘জেলা ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি’র সভায় জনস্বার্থে এবং পর্যটক বিনোদনের সুবিধার্থে ডিসি বাংলো এলাকায় অবস্থিত পার্কটি ব্যবহার করতে দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৩ টি শর্ত সাপেক্ষে শহরের দেবাশীষ নগরের জনৈক আবুল হোসেনের পুত্র মোহাম্মদ হোসেনের কাছে ডিসি বাংলো পার্কটি ভাড়া দেয়া হয় দুই বছরের জন্য। ১৩ শর্তে এই বরাদ্দ দেয়ো হলেও বরাদ্দকারি জেলা প্রশাসকের বদলীর সাথে সাথেই একের পর এক শর্ত ভঙ্গ করতে শুরু করে অনুমতি গ্রহণকারী। বরাদ্দের শর্তে পার্কটি কোনরূপ উপ-ভাড়া কিংবা সাব লীজ দেয়া যাবেনা বলে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও মোহাম্মদ হোসেন, নাজনীন আনোয়ার নিপূণকে উপ-ভাড়া প্রদান করেন বলে অভিযোগ। নিপূন বরাদ্দ নেয়ার পরই বরাদ্দের শর্ত লংঘন করে পার্কের ভেতর সুবিশাল স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেন এবং বিশালাকার একটি জাহাজ নির্মাণ করে ‘পাইরেটস’ নামের রেস্টুরেন্ট চালু করেন। ভাড়ার শর্ত অনুযায়ী পার্কটি কোনরূপ পরিবর্তন পরিবর্ধন বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ না করার নির্দেশনা থাকলেও নিপূণ তোয়াজ করেননি এই নির্দেশনার। তার আচরণে ক্ষুদ্ধ জেলা প্রশাসক,সাবেক জেলা প্রশাসকের বরাদ্দের প্রতি ‘সম্মান’ দেখিয়ে এবং নিপূণের মা ফিরোজা বেগম চিনু’র ‘প্রভাব’ বিবেচনায় নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু বরাদ্দের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জেলা প্রশাসন আর সেই মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি,বরং উচ্ছেদের নোটিশ দেয় ভাড়া গ্রহীতাকে।
কেনো বরাদ্দ বাড়াতে চায়না জেলা প্রশাসন
মূলত: ব্যবহারের অনুমতির প্রায় সবকটি শর্ত ভঙ্গ এবং রেস্টুরেন্টের কারণে ডিসি বাংলোর মতো সংরক্ষিত এলাকার ‘প্রাইভেসি’ নষ্ট হওয়া,পাশর্^বর্তী মসজিদের মুসুল্লীদের নামাজে সমস্যা হওয়া,অধিক রাত অবধি রেস্টুরেন্ট চালু রাখা এবং পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার কারণে মেয়াদ শেষে আর মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ‘শর্ত অনুযায়ী সকাল আটটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকবে এবং নয়টার পর পার্কের গেইট বন্ধ করে দিতে হবে। পার্কে সমাজ বা রাষ্ট্রবিরোধী কোন কার্যকলাপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জেলাপ্রশাসকেরে আশেপাশে বা পার্কের আশেপাশের এলাকাবাসীদের অসুবিধা সৃষ্টিকারী, উচ্ছৃঙ্খল বা বসবাসের পরিবেশ বিঘিœত হয় এমন কোন কার্যক্রম করা যাবেনা। এ জাতীয় কোন কার্যক্রম করলে কর্তৃপক্ষ বিনা নোটিশে উচ্ছেদ করতে পারবেন। সাবলীজ বা উপ-ভাড়া প্রমান পাওয়া গেলে বিনা নোটিশে কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ করতে পারবেন। অথচ লিজ নেয়ার পরপরই পার্কটি মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনুর মেয়ে নাজনীন মনোয়ারকে উপ-বাড়া হিসেবে প্রদান করেন মোহাম্মদ হোসেন। শুধু তাই নয় শর্ত ভঙ্গ করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন ভাড়া গ্রহীতা। এইসব কারণে জেলা প্রশাসক এর মেয়াদ আর বাড়াননি। ’

যেসব শর্তে বরাদ্দ
১৩ টি শর্তে শহরের দেবাশীষ নগর এলাকার জনৈক মোহাম্মদ হোসেনকে দুই বছরের জন্য ডিসি বাংলো পার্ক,তদস্থ স্থাপনা এবং পার্ক সংলগ্ন লেকের অংশ দুই বছরের জন্য বছরে ৩৬ হাজার টাকায় ব্যবহার করার অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। এতো বিশাল একটি স্থাপনাকে মাসে মাত্র তিন হাজার টাকায় ভাড়া দেয়ার ঘটনাটিও বেশ বিস্ময়কর ! তদুপরি নেয়া হয়নি কোন জামানতও ! তবে ব্যবহারের বরাদ্দপত্রে দেয়া ১৩ টি শর্তে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে ব্যবহার বিধি। ১৩ দফা শর্তের সবচে গুরুত্বপূর্ণ শর্তই ছিলো ১১ নম্বর,যাতে স্পস্ট করেই বলা হয়েছে,পার্কটি কোনরূপ উপভাড়া বা সাবলীজ দেয়া যাবেনা। যদি এমন প্রমাণ পাওয়া যায়,হবে কর্তৃপক্ষ বিনা নোটিশে উচ্ছেদ করতে পারবেন।’ মজার ব্যাপার হলো,সবচে গুরুত্বপূর্ণ এই শর্তটিই লংঘিত হয়েছে শুরুতেই। তবুও কোন পদক্ষেপ না নিয়ে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকরা হওয়া অফিস আদেশের মেয়াদ যথানিয়মে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার পর এর মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি জেলা প্রশাসন।
সর্বশেষ গত রবিবার রাত দশটার পর মাদক সেবন অবস্থায় চারজনকে পার্কের ভিতর থেকে হাতে গ্রেফতার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক শিবনাথ সাহার নেতৃত্বে দেশি-বিদেশী মদসহ তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন,  ইরফান (২৫), সাইফ (২০) ও প্রভাষ চাকমা (২১)। পরদিন জামিনে মুক্ত হন তারা,তবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়।

ক্ষুদ্ধ নিপূণের একের পর এক মামলা
জেলা প্রশাসন ‘পাইরেটস’ এর লিজের মেয়াদ না বাড়ানোয় ক্ষুদ্ধ নিপূণ জেলা প্রশাসক একে এম মামনুর রশীদের সাথে দেখা করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং লিজ বাতিলের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগ নেন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ ও তাঁর কর্মচারিদের বিরুদ্ধে পরপর চারটি মামলা দায়ের করেন তিনি। মামলাসমূহ হচ্ছে- সি আর-৫৮/২০১৯, পিটিশন-১৫৩/২০১৯, সিভিল মামলা নং-১৭৬/২০২০ ও সি আর-১৬০/২০২০। এসব মামলায় আসামী করা হয় খোদ জেলা প্রশাসকসহ তার বাংলো ও অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মচারিকে। এনিয়ে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয় জেলা প্রশাসনেও। ক্ষুদ্ধ কর্মচারিরাও। তবে সবকিছুকেই দৃশ্যত উড়িয়ে দিয়ে নানাভাবে জেলা প্রশাসকের উপর চাপ সৃষ্টি করেন নিপূণ। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু সাংবাদিকদের ব্যবহার করে জেলা প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ জেলা প্রশাসনের। ‘মূলত পূনরায় পার্ক ভাড়া নেয়ার জন্য নাজনীন আনোয়ার এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা করেছেন’ বলে দাবি জেলা প্রশাসনের।

নিপূণের যত অভিযোগ
গত ১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে নাজনীন আনোয়ার নিপূণ অভিযোগ করেছেন, প্রায় ২৬ লক্ষ টাকা খরচ করে পার্কটিকে দৃষ্টিনন্দন করেছেন তিনি এবং তার পার্টনাররা। কিন্তু জেলা প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং বাধায় তাদের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারবার।
নিপূণ দাবি করেন, বিশাল অংকের অর্থ বিনিযোগ করলেও তার মূলধন উঠে আসেনি। ফলে সে বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেয়াদ শেষে ফের ব্যবহারের আবেদন করেছেন। কিন্তু সেই আবেদন গ্রাহ্য করেনি জেলা প্রশাসন।
নিপূণ সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, তিনি বরাদ্দ পাওয়া মোহাম্মদ হোসেন থেকে রেস্টুরেন্টটির অংশীদার হিসেবে তিনি ও তার দুই বন্ধু সেখানে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তবে ‘অজ্ঞাত’ কারণে সংবাদ সম্মেলনে কাগজেপত্রের মালিক মোহাম্মদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন না ! যদিও নিপূণ দাবি করেছেন-‘মোহাম্মদ হোসেন তাকে ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ প্রদান করেছেন।’

কে এই নিপূণ
রাঙামাটি জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী ও সাবেক সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এবং সদ্য প্রয়াত ঠিকাদার শাহ আনোয়ার মিন্টুর জৈষ্ঠ্য কণ্যা নাজনীন আনোয়ার নিপূণ। রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক এই ছাত্রী বিয়ের পর থেকে স্বামীর বাড়ি চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। পৈত্রিক নিবাস ও নিজের শহর রাঙামাটিতে প্রায় নিয়মিত আসলেও, ‘পাইরেটস’ চালুর পর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঘনঘনই রাঙামাটি আসতে শুরু করেন তিনি। ২০১৭ সালে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সূবর্ণ জয়ন্তী আয়োজনে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন নিপূণ। সেই সময় এই আয়োজনের সূত্রেই জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে তাকে নিয়মিতই দেখা গেছে প্রস্তুতিমূলক বিভিন্ন সভায়। এরপরই জানা গেছে, ‘পাইরেটস’ এর গল্প,যেখানে মোহাম্মদ হোসেন নামটি কাগজে কলমে থেকেও দৃশ্যত আড়ালেই ছিলো, আলোচনায় ছিলেন মূলত: নাজনীন আনোয়ার, নিপূণ এবং ‘পাইরেটস’ কে সমার্থক হিসেবেই দেখেছেন শহরবাসি ! কিন্তু তখন কে জানতো,মোহাম্মদ হোসেন নামের অন্য কেউ একজনই,মূলত: জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়েছেন দুই বছর ব্যবহারের ১৩ শর্তে ,শহরবাসির প্রিয় ‘ ডিসি বাংলো পার্ক’ !

যা বলছেন জেলা প্রশাসক
সজ্জন এবং সৎ হিসেবেই রাঙামাটিবাসির কাছে সুপরিচিত জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ। নিপূনের একের পর এক মামলা এবং সর্বশেষ সাংবাদিক সম্মেলনের ঘটনায় বিস্মিত এই জেলা প্রশাসকও। তিনি বলেন, ‘সে (নিপূণ) সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছে,তা সর্বতো মিথ্যা,বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন। আমি তার বিরুদ্ধে কোথায় কখন মামলা করেছি প্রমাণ দেখাতে বলেন। বরং সেই আমি এবং আমার স্টাফদের বিরুদ্ধে একের পর এক চারটি মামলা করেছে এবং সর্বশেষ এই সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের মানহানি করার চেষ্টা করছে,জেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘আমরা ঠিক বুঝতে পারছিনা, এখানে তার কাজ কি কিংবা তিনি কেনো এভাবে মাঠে নামলেন। মোহাম্মদ হোসেন নামে যাকে জেলা প্রশাসন বরাদ্দ দিয়েছে তার মেয়াদ শেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। মেয়াদ শেষে আমরা সেই ব্যবহারের অনুমতিপত্র আর নবায়ন করিনি। তিনি আবেদন করেছেন নবায়নের,কিন্তু যেহেতু আগেই অনুমতির শর্ত লংঘন করা হয়েছে,তাই আমরা আর বরাদ্দ দিতে আগ্রহী নই।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘মোহাম্মদ হোসেন এর ব্যবহারের অনুমতির সময়সীমা শেষ হওয়ার ১২ মাস চলছে,এখনো তারা স্থাপনা অপসারণ করেনি,সেখান থেকে তাদের মালামাল ও আসবাবপত্র নিয়ে যায়নি। বারবার চিঠি দেয়ার পরও সে কর্ণপাত করছে না। যদি স্বাভাবিকভাবে তারা সরে না যায়,তবে আমরা আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোব।’

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button