নীড় পাতা / ব্রেকিং / রাঙামাটি আওয়ামীলীগ: সুখের সংসারে হঠাৎ ঝড়ের আভাস
parbatyachattagram

নেতাদের ব্যক্তিগত রেষারেষিতে ব্যবহৃত হচ্ছে কর্মীরাও

রাঙামাটি আওয়ামীলীগ: সুখের সংসারে হঠাৎ ঝড়ের আভাস

দলীয় একটি কর্মসূচীতে মঞ্চে বসা নেতাদের ছবি!........ফাইল ছবি

পিতার ছায়ায় যেনো সব সন্তান। পিতার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই,অনুযোগ নেই,সুখের বাতাস নিশিদিন ছুঁয়ে যাওয়া এমন সংসারে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে কখনো সখনো রাগ ক্ষোভ অভিমান থাকলেও পিতার ভালোবাসার কাছে যেনো তুচ্ছ সব। পিতার প্রতি সন্তানদের অন্ধ ও একচ্ছত্র ভালোবাসা আর পিতার পিতাসুলভ অভিভাবকত্বে একটি বড় সংসার যেমন করে বছরের পর বছর সুখে-হাসি- আনন্দে- উচ্ছাসে কাটে, ঠিক যেনো তেমনটাই ছিলো রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ। যেনো একটি বড় পরিবার,সুখী সংসার। ১৯৯১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত কোন জাতীয় সংসদ নিবার্চনই যাকে ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীকে নিয়ে মাঠে নামেনি আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা,সেই দীপংকরকে মাইনাস করে কিংবা তার অনুপস্থিতিতে কোন কাজ বা কমিটি হবে, এমন দু:সহ চিন্তাও ভুলেও করেন না রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ কিংবা এর সহযোগি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুধু সুসময়েই নয়,দলের কিংবা দাদার দারুন দু:সময়েও সবকিছু ভুলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দাদার পিছনেই। এমনকি ২০০৬ সালের নির্বাচনে মহাজোট রাজনীতির ফাঁফরে পরে দীপংকরকে বাদ দিয়ে মনিস্বপন দেওয়ানকে নৌকার মনোনয়ন দেয়া হলে ক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা দীপংকরকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেয় বিশাল শোডাউন করে। পরে তো আর সেই নির্বাচনই হয়নি,ভেঙ্গে যায় সেই জোটও। কিন্তু দাদাকেন্দ্রিক রাঙামাটি আওয়ামীলীগের সুখের সংসার ঠিকই ঠিকঠাক চলছিলো বহু বছরের ধারাবাহিকতা মেনেই।

কিন্তু গত ২৫ নভেম্বর স্থগিত হওয়া ত্রিবার্ষিক জেলা সম্মেলনকে ঘিরে আওয়ামীলীগের এই সুখের সংসারে যে ঝড় উঠেছে সেই ঝড় কোথায় নিয়ে যাচেছ দলটিকে বুঝতে পারছেন না নেতাকর্মীরাও। সভাপতি পদে সম্মেলনে ‘দাদা’র সভাপতি নির্বাচিত হওয়াটা ছিলো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু স্থগিত হওয়ার আগঅবধি মাঠে সাধারন সম্পাদক পদে ৮ প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও বাস্তবিক লড়াইটা কমে চারজনে এসে ঠেকেছিলো। তারা হলেন বর্তমান সাধারন সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর,সাবেক সাধারন সম্পাদক হাজী কামালউদ্দিন,সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন রুবেল এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মতিন।

এই চারজন প্রার্থীর মধ্যে মতিন ও রুবেল এর সমর্থকরা নীরবে প্রচার চালিয়ে গেলেও দুই হাজী ‘মুছা এবং কামাল’ এর সমর্থকরা রাজনৈতিক ‘সভ্যতা ও ভব্যতা’ ভুলে মেতে উঠে নোংরা কদর্য ও কুৎসিত প্রচারনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই পক্ষের অসামাজিক প্রচারণা সবাইকে স্তম্ভিত করে দেয়। ব্যক্তিগত আক্রমন এতোটাই নোংরা আকার ধারণ করে যে ১৯ নভেম্বর সম্মেলন স্থগিত করার পর মুছার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ এনে এক নারীকে দিয়ে ভিডিও নির্মাণ করে তাও ছড়িয়ে দেয়া হয় ফেসবুকে। বিভিন্ন ফেক আইডি ছাড়াও প্রকৃত আইডি থেকেও শুরু হয় নোংরা প্রচারণা। প্রচারকাজে আওয়ামীলীগ,যুবলীগ,ছাত্রলীগসহ সহযোগি বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সমানতালে দুইভাগে ভাগ হয়ে নেমে পড়ে। শুধু তাই দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও হাজী কামাল ও হাজী মুছার পরিবারের সদস্য,আত্মীয় স্বজন এবং শুভাকাংখিরাও শুরু করে প্রচারণা। দলীয় নির্বাচন হলেও শহরজুড়ে ব্যানার ফেস্টুন,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসামাজিক প্রচারণা এমন পর্যায়ে চলে যায়,বিরক্ত হয়ে উঠতে শুরু করে শহরবাসি। এমনকি দলের ত্যাগি পরীক্ষিত ও পুরনো কর্মীরাও ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে স্ট্যাটাস দিতে শুরু করে। সিনিয়র নেতাদের ব্যক্তিগত বিরোধ আর পদকেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে জুনিয়র নেতাকর্মীদেরও সম্পৃক্ত করে ফেলায় ক্ষুদ্ধ অনেকেই।

সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর ধারণামতো এসব কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা কমে আসলেও থেমে নেই পারস্পরিক যুদ্ধ। ইতোমধ্যেই হাজী মুছা ও হাজী কামাল,দুজনের পক্ষ থেকেই থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। একটি অভিযোগে কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জকেও আদালতে তলব করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি ও হুমকিও। সাবেক সাংসদ চিনুর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন মুছা। শুধু আওয়ামীলীগ নেতারাই নয়,সরাসরি প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারনায় নেমেছে ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদকসহ জেলা ছাত্রলীগের নেতারা,যুবলীগের সিনিয়র নেতারা। মাঠে প্রকাশ্যেই কোন না কোন প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন রাখডাক না রেখেই। পুরো বিষয়টিই ব্যাপক চিন্তায় ফেলেছে আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল নেতাদের।

সব মিলিয়ে একটি অস্বত্বিকর পরিস্থিতি রাঙামাটি আওয়ামীলীগে। এইসব কারণেই সম্ভবত আগামী ৩০ নভেম্বর জেলা আওয়ামীলীগের কার্যকরি কমিটির একটি জরুরী সভাও আহ্বান করা হয়েছে। এখন এই সবার দিকেই তাকিয়ে আছেন নেতাকর্মীরা।

কিন্তু ওই সভায় সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেনো, রাঙামাটি আওয়ামীলীগের সুখের সংসারে যে আগুণ লেগেছে তা সহজে মিটবে বলে মনে হয় না। বদিউল আলম,সুদীপ্তা দেওয়ান হয়ে আশুতোষ বড়–য়ায় এসে রাঙামাটি আওয়ামীলীগের যে কোন্দল এই জেলায় দৃশ্যত মিটে গেছে বলে মনে করা হয়েছে তা ফের আগ্নেয়গিরি মতো বিস্ফোরিত হয়েছে স্থগিত হওয়া সম্মেলনকে ঘিরে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে উঠেছে যে, সম্মেলনের আগে এই জেলায় ‘নিরপেক্ষ’ কোন নেতাকর্মীই ছিলো নাহ্ ! প্রত্যেকেই কোন না কোন পক্ষ অবলম্বন করে ওপেন হয়ে গেছে। ফলে মুখোশ সড়ে যাওয়ায় এই জেলায় আওয়ামীলীগের রাজনীতি একটি নতুন সংকটে পড়েছে,যা থেকে আদৌ উত্তরণ হতে পারবে কিনা দলটি সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত স্থগিত হওয়া সম্মেলন তুষের আগুণকে কিছুটা দীর্ঘায়িত করলেও আসছে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সম্ভাব্য সম্মেলনেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন না নেতাকর্মীরা।

এই সম্মেলনের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা দুই প্রার্থীর নিজেদের নেতাকর্মী,আত্মীয় স্বজনরাও পরস্পরকে আক্রমন করে যে ভাষায় স্ট্যাটাস দেয়া শুরু করেছে তা দেখে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা লিখেছেন, ‘আগে ছেলেরা বাপের সাথে বেয়াদবি করলে চাচারা বকা দিতো,আর এখন চাচারা বাহবা দেয়। ফ্যাক্ট- রাংগামাটির পক্ষে বিপক্ষের স্ট্যাটাস।’

আরেক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘ বাইর থেকে দেখা একদিনের ছোট্ট সুখের ঘরটি যে এত দুর্বল ভীতের উপর দাঁড়িয়ে ছিলো এই সম্মেলন না এলে বোঝার কোন উপায়ই ছিলো নাহ্ ! কে যে কার পক্ষ আর কে কার বিপক্ষে ওপেন হয়েছে,সেটা ছিলো বেশ চমকপ্রদ ও অস্বস্তিকর।’ এই ছাত্রলীগ নেতা মনে করেন, ‘ দীপংকর তালুকদার দলের দায়িত্ব নেয়ার পর এ জেলার দাদাকেন্দ্রিক রাজনীতির সম্ভবত সবচে খারাপ সময়টাই দেখলো পার্বত্য এই জেলার মানুষ। এ থেকে দ্রুত উত্তরন ঘটাতে না পারলে আঞ্চলিক দলগুলো এবং প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামাত’ই এই পরিস্থিতিতে সবচে বেশি সুযোগ নেবেন বলে মনে করেন তিনি। তার দাবি, ‘ কদিন আগেও জনসংহতি সমিতি-ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে বড় বড় কর্মসূচী পালন করা দলটি এখন যে নেতৃত্বে যে নোংরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে,তাতে সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দল আওয়ামীলীগই।’ কিন্তু সাবেক এই নেতার উপলব্ধি বোঝার ‘সময় ও বাস্তবতা’ কোনটাই এখন আর নেই রাঙামাটির আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের ইঁদুর দৌড়ে মাঠে নামা নেতাদের !

‘ দীপংকর তালুকদার দলের দায়িত্ব নেয়ার পর এ জেলার দাদাকেন্দ্রিক রাজনীতির সম্ভবত সবচে খারাপ সময়টাই দেখলো পার্বত্য এই জেলার মানুষ। এ থেকে দ্রুত উত্তরন ঘটাতে না পারলে আঞ্চলিক দলগুলো এবং প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামাত’ই এই পরিস্থিতিতে সবচে বেশি সুযোগ নেবেন বলে মনে করেন তিনি। তার দাবি, ‘ কদিন আগেও জনসংহতি সমিতি-ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে বড় বড় কর্মসূচী পালন করা দলটি এখন যে নেতৃত্বে যে নোংরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে,তাতে সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দল আওয়ামীলীগই।’ কিন্তু সাবেক এই নেতার উপলব্ধি বোঝার ‘সময় ও বাস্তবতা’ কোনটাই এখন আর নেই রাঙামাটির আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের ইঁদুর দৌড়ে মাঠে নামা নেতাদের !

 

Micro Web Technology

আরো দেখুন

প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে মাতৃভাষায় পাঠদান

২০১৭ সাল থেকে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুদের হাতে মাতৃভাষার বই দেয়া হলেও এখনো …

Leave a Reply