পাহাড়ের অর্থনীতিরাঙামাটিলিড

রাঙামাটির পর্যটন : আশাবাদ নেই,শুধুই হতাশা

বেসরকারি উদ্যোগই কিছুটা আলো ছড়াচ্ছে

অরণ্য ইমতিয়াজ
হ্রদ পাহাড়ের শহর রাঙামাটি। যে শহর হতে পারত দেশের পর্যটনের প্রধান তীর্থ,সেই শহরের পর্যটন এখন আশানিরাশার দোলাচলে দুলছে। স্বাধীনতার পর আশির দশকে শহরের শেষপ্রান্তে যে ঝুলন্তসেতু কেন্দ্রীক পর্যটনকেন্দ্র হড়ে উঠেছিলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, এরপর বহুজল গড়িয়েছে কর্ণফুলিতে, তারপরও বলার মতো আর কিছুই হয়নি এই শহরে কিংবা দুর পাহাড়ে,সরকারি উদ্যোগে তো নয়ই। বরং শত সীমাবদ্ধতাকে জয় করে ব্যক্তি পর্যায়েই গড়ে উঠছে ছোট বড় হোটেল,মোটেল,রিসোর্ট কিংবা পর্যটনকেন্দ্র, আশা জাগাচ্ছে ফের।

কি আছে রাঙামাটিতে
রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য অবিশ্যম্ভাবী গন্তব্যই বলা যায় সুভলং ঝর্ণা,তথা কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমন। প্রায় ৫/৬ ঘন্টার এই নৌভ্রমনে আসা যাওয়া খাওয়া মিলে খরচও খুব একটা কম নয়। শহরের ঝুলন্ত সেতুর পাড় কিংবা তবলছড়ি বা রিজার্ভবাজার ঘাট থেকে ভাড়ায় চালিত বোটের আসাযাওয়ার খরচ কমবেশি ১২০০ থেকে ৩০০০ টাকা। গন্তব্য সুভলং ঝর্ণা। আর পথিমধ্যে খাওয়াদাওয়ার জন্য আছে পেদাতিংতিং,জুমঘর,চাংচাং,টুকটুক,মারমেইডসহ বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট,যেখাবে সাধারন প্রচলিত খাবারের পাশাপাশি মিলবে স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহি খাবারও। সকাল ৯ টায় শহর ছাড়া পর ফিরে আসতে আসতে ৩/৪ টা বাজেই। সেদিন ফিরে আসার পর শহরের জিরোমাইল এলাকায় অবস্থিত ডিসি বাংলো পার্ক,পলওয়েল পার্ক,রাজবনবিহার,আরণ্যক দেখার পর তবলছড়িতে টেক্সটাইল মার্কেটে কেনাকাটা ছাড়া সন্ধ্যের শহরে আর কিছুই করার নেই। রাত্রিকালিন বিনোদনের কোন ব্যবস্থাই নেই শহরে। পরদিন আগ্রহী পর্যটকরা যেতে পারেন উপশহর কাপ্তাইয়ে। জেলা শহর থেকে আসামবস্তি হয়ে ১৯ কিলোমিটারের একটি অসাধারন সড়ক পাড়ি দিয়ে যেতে পারেন কাপ্তাই,সেখানে কর্ণফুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প,কর্ণফুলি পেপার মিলস লিমিটেড ছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা যেতে পারে।

শহরে রাত্রিযাপন কোথায়
রাঙামাটি শহরে রাত্রিযাপনের জন্য ছোটবড় অর্ধশতাধিক হোটেল মোটেল আছে। এদের মধ্যে অন্তত পনেরটি বেশ ভালো মানের এবং পর্যটকবান্ধব। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন মোটেলের বাইরে হোটেল নাদিশা,হোটেল স্কয়ারপার্ক,প্রিন্স,মতিমহল,জুমপ্যালেস,হিল এ্যাম্বাসেডর,রাজমহল,নিডস হিলভিউ মোটামুটি ভালোই পর্যটকন টানছে। পুরনো হোটেল হিসেবে সুফিয়া,সাংহাই এবং গ্রীনক্যাসেল এর রয়েছে পুরনো পরিচিতি। এর বাইরে সম্প্রতি শহরে গড়ে উঠা পুলিশের পলওয়েল কটেজ,সেনাবাহিনীর আরণ্যক কটেজ, পর্যটনের কটেজ, বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বরগাং,ডিভাইন লেক আইল্যান্ড,রাইন্যাটুগুন, হিলতাজও পর্যটকদের নতুন রাত্রিযাপন গন্তব্য হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেছে। শহরে হোটেলের ভাড়া কমবেশি ৭০০ থেকে ২৫০০ হলেও,রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে এই ভাড়া ৫০০০ থেকে ১২০০০ পর্যন্ত।

কতটা পর্যটকবান্ধব শহর
তবে পর্যটন শহর হিসেবে রাঙামাটির খ্যাতি থাকলেও এই শহর এখনো নানা কারণে পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। শহরে চলাচলকারি একমাত্র বাহন অটোরিক্সার বিকল্প যান না থাকায় রিজার্ভগাড়ীতেই ঘুরাফেরা করতে হয় পর্যটকদের। অটোরিক্সা চালকদেরও পর্যটকদের সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত,সেই সম্পর্কিত কোন প্রশিক্ষন বা গাইডলাইন নেই। ফলে পর্যটকদের সাথে ভাড়া নিয়ে প্রায়শই বচসায় লিপ্ত হন তারা। বেশিরভাগ হোটেলও এখনো পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি। পর্যটকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছেনা তারা। ফলে একটি পর্যটন শহরের যে চরিত্র তা এখনো গড়ে উঠেনি শহরে।
উদ্যোক্তা ও পর্যটন বিষয়ক লেখক ললিত চন্দ্র চাকমা বলছেন-‘প্রাকৃতিকভাবে এই জনপদ শতভাগ পর্যটকবান্ধব,কিন্তু সুযোগ সুবিধা,ব্যবস্থাপনায়,অবকাঠামোতে একেবারেই শূণ্য। যা কিছুটা হচ্ছে,সবই বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবে এসব নিয়ে সুপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। যারা এসব ব্যবসায় এগিয়ে আসছেন তাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। প্রকৃতিকে কোন প্রকার আঘাত না করে,স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করেই এখানকার পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হবে।’

কিভাবে আসবেন রাঙামাটি
রাঙামাটি থেকে পর্যটকরা মূলত আসেন তিনটি ভিন্ন পথ ধরে। সারাদেশের পর্যটকরা রাজধানী ঢাকার ফকিরাপুল,গাবতলী,সায়েদাবাগ,কলাবাগান,আরামবাগ,টিটিপাড়া থেকে ডলফিন,শ্যামলী,এসআলম,ইউনিক,সেন্টমার্টিন,রিল্যাক্স,হানিফ,বিআরটিসি সরাসরি রাঙামাটি আসে। সাধারণ রাতে ছেড়ে আসা এসব গাড়ি ভোরে রাঙামাটি পৌঁছায়। এসব গাড়ীর মধ্যে শ্যামলী,সেন্টমার্টিন এবং রিল্যাক্স এর এসি গাড়ি আছে। কিছু কিছু পরিবহনের গাড়ি সকালেও ছেড়ে আসে এসব স্থান থেকে। এসব গাড়ীর ভাড়া ৬২০ থেকে ১৪০০ টাকা।
এর বাইরে চট্টগ্রাম শহরের অক্সিজেন থেকে পাহাড়ীকা,বিরতিহীন গাড়ীতে করেও আসেন পর্যটকরা। ভাড়া ৯০ ও ১২০ টাকা। এছাড়া খাগড়াছড়ি হয়েও অনেকেই আসেন রাঙামাটিতে। আছে ব্যক্তিগত গাড়িতে আসার প্রবণতাও। ব্যক্তিগত গাড়িতে রাঙামাটি আসতে সময় লাগে প্রায় ছয়/সাতঘন্টা।

সাজেক : যেনো দূর আকাশের তারা

সাজেক : যেনো দূর আকাশের তারা
রাঙামাটির সবচে দূরের গন্তব্য আলোচিত পর্যটন স্পট সাজেক। কিন্তু এই সাজেকে যাওয়ার পথ রাঙামাটি হয়ে নয়,খাগড়াছড়ি হয়েই। রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত এই পর্যটন স্পটের উদ্যোক্তাদের বড় অংশটিও তাই রাঙামাটির নয়। এখানে গড়ে উঠেছে ছোটবড় শতাধিক কটেজ ও রিসোর্ট। এসব কটেজের ভাড়া ১০০০ থেকে ৮০০০ পর্যন্ত । তবে ভাড়া যাই হোকনা কেনো নয়নাভিরাম এই স্থানে কটেজের বুকিং পাওয়াটাই দুরূহ কিছু কিছু সময়ে। পর্যটক মৌসুমে উপচেপড়া ভীড় এই স্থানটির পর্যটনে গতি আনলেও তা থেকে রাঙামাটিবাসির অথনৈতিক উপকার খুব কমই হয়,কারণ সাজেককেন্দ্রিক পর্যটনের উপকারভোগি মূলত প্রতিবেশি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িই। তাই সাজেক যেনো রাঙামাটির দূর আকাশের তারা।

নিরাপত্তার ঘাটতি নেই,অস্বস্তি আছে
এদিকে রাঙামাটিতে পর্যটনের সবচে আশার দিক এখানকার পর্যটনে নিরাপত্তা কখনই বড় কোন ইস্যু ছিলোনা,নেইও। তবে স্থানীয় রাজনীতির উত্থানপতন কিংবা হানাহানির প্রভাবতো পড়েই এখানকার পর্যটনে। আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সংঘাতের খবরে পর্যটকের প্রবাহ যেমন কমে,তেমনি প্রভাব পড়ে পর্যটনেও। যদিও সর্বশেষ দুই দশকে জেলায় পর্যটকদের উপর হামলা কিংবা অপহরণের কোন ঘটনা নেই। কিন্তু পর্যটকদের গাড়ীবহরে হামলার পর নিরাপত্তার কারণে সাজেকে আইনশৃংখলাবাহিনীর প্রহরায় পর্যটকদের আনা-নেয়ার বিষয়টি অস্বস্তিকরতো বটেই। এর বাইরে রাঙামাটিতে পর্যটনে খুব বেশি নিরাপত্তার ঘাটতি নেই, নেই কোন অঘটনও।

ধীরলয়ে জমছে পর্যটন
করোনাকালিন সময়ে সারাবিশে^র মতো রাঙামাটির পর্যটনেও ব্যাপক ধ্বস নেমে এসেছিলো। এখন দৃশ্যত বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হচ্ছেন পর্যটকরা। কোভিড জয়ী মানুষ বিনোদন ও বিশ্রামের প্রয়োজনে আসছেন পাহাড়েও। শহরের হোটেল মোটেল রিসোর্টে পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে। হ্রদে নৌভ্রমনও বেশ চোখে পড়ছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় পাহাড়ী ঝর্ণাগুলোতেই আকর্ষন খুঁজে ফিরছেন পর্যটকরা।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
রাঙামাটি পর্যটর কর্পোরেশন এর ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলছেন-‘ দীর্ঘদিনের ক্ষতি তো আর মুহুর্তেই স্বাভাবিক হবেনা। তবে ধীরেধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে। পর্যটকদের আগমন বাড়ছে। বুকিং বেড়েছে কটেছে। আশা করছি আগামী পর্যটন মৌসুমেই মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে যাবে সবকিছুই।’

রাঙামাটির পর্যটন নৌ ঘাটের ইজারাদার রমজান আলী বলছেন-‘ প্রথম কদিনের তুলনায় এখন বলা যায় অনেক ভালো আছি আমরা। ঝুলন্ত সেতু পানিতে ডুবে যাওয়ায় একটু বিপাকে পড়েছি আমরা। পানি শীঘ্রই কমে যাবে। তবে পর্যটকের আগমন বেশ বেড়েছে।’

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button