প্রকৃতিপুরাণরাঙামাটিলিড

রাঙামাটিতে জলাশয় ভরাট করে শিল্প গবেষণার ভবন

শংকর হোড় ।।

রাঙামাটিতে এবার কাপ্তাই হ্রদ দখল করে পাহাড়ের মাটি কেটে এনে ভরাট করে হ্রদ দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ রাঙামাটি সাব স্টেশনের বিরুদ্ধে। প্রথমে কাপ্তাই হ্রদে দেয়াল দিয়ে পানি ঢোকার পথ বন্ধ করে দিয়ে সেখানে মাটি ফেলে ভবন নির্মাণের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। তবে দেয়াল নির্মাণের পর এখনও দেয়ালের ভিতরেই কাপ্তাই হ্রদের পানি রয়েছে।

সরেজমিনে দিয়ে দেখা যায়, শহরের ফিসারিঘাটের সামনে এবং বাস টার্মিনালের পাশে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ রাঙামাটি সাব স্টেশন। অফিসটি প্রায় সময় বন্ধ থাকে। মূল অফিসটি প্রায় হাজার বর্গফুটের ওপর রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনও কাজকর্ম হয় না। অফিসে কর্মচারী রয়েছে দুইজন। একজন গার্ডেনার নেছার উদ্দিন, আরেকজন নূর ইসলাম।

মূল অফিসের পাশেই আরেকটি মূল গেইট নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে বিশাল জায়গার মধ্যে পাহাড়ের মাটি কেটে এনে ভরাট করা হচ্ছে। চারপাশেই দেয়াল দিয়ে ঘেরা প্রায় দুই একর জায়গার মধ্যে অর্ধেক জায়গায় মাটি ফেলা হয়েছে। চারটি গাড়ির মাধ্যমে প্রতিদিনই মানিকছড়ির শুকরছড়ি থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি পাহাড় কেটে মাটি আনা হচ্ছে। পানির ওপরই মাটি ফেলতে ফেলতে দেয়াল পর্যন্ত মাটি ভরাট করতে আরো বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। এজন্য আরো কয়েকটি পাহাড়ের মাটি প্রয়োজন। ট্রাকের কর্মচারীদের সাথে কথা বললেও তারা এবিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে গত কয়েকদিন ধরে ট্রাকে ট্রাকে মাটি আনার বিষয়টি নিয়ে শহরে বেশ কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।

তালাবদ্ধ অফিসে উঁকিঝুঁকি দিতেই কথা বলে উঠেন একজন। অফিসে কেউ আছেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, তিনি অফিসের কর্মচারী নূর ইসলাম। তার সাথে কথা বলে জানা গেল, বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের মূল অফিস চট্টগ্রামের বালুছড়ায়। মূল অফিসের সাব স্টেশন এটি। চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালকই এটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম অফিসেই কাজ করেন। তিনি আরো জানান, মাটি ভরাটের পর এখানে ভবন নির্মাণ হবে। ভবনে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

জায়গাটি এক সময় স্থানীয় খেয়োয়াড়দের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হত। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর এই মাঠে প্রতিবছরই ক্রিকেট, ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন হত। এই মাঠে এমন অনেক টুর্নামেন্টের আয়োজক জেলা ক্রিকেট টিমের খেলোয়াড় মো. ইয়াছিন মিশু। তিনি বলেন, আমরা ছোট থেকেই এই মাঠে খেলে বড় হয়েছি। মাঠটি ছয় মাস পানিতে আর ছয় মাস শুকনো থাকতো। পানি কমে গেলে আমরা বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন করি। এই মাঠে খেলে জেলা পর্যায়ে অনেক খেলোয়াড় উঠে এসেছে। কিন্তু এখন এটি অফিসের জন্য নিয়ে ফেলায় আমাদের খেলা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ৭নং ওয়ার্ডে আর কোনও মাঠ না থাকায় মাঠটিকে খেলার জন্য রেখে দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

স্থানীয় কাউন্সিলর ও রাঙামাটি পৌরসভার প্যানেল মেয়র জামাল উদ্দিন বলেন, এই ওয়ার্ডে এটিই ছিল একমাত্র খেলার মাঠ। পানি শুকালে ছেলেরা ক্রিকেট, ফুটবল খেলতো। টুর্নামেন্টও আয়োজত হতো। কিন্তু পরর্বতীতে বিজ্ঞান ও শিল্প পরিষদ নিজেদের জায়গা হিসেবে দেয়াল তুলে দেয়। দেয়াল তোলার সময়ও অনেক ঝামেলা হয়েছিল এলাকাবাসীর সাথে। তবে বর্তমানে সেখানে কি হচ্ছে তা আমারা জানা নেই। সেখানে তারা মাটি ফেলছে সেটা জানতে পেরেছি। তাদের কার্যক্রম সম্বন্ধে আমি কোনও কিছুই অবগত না।

আব্দুল বাতেন নামে এক জ¦ালানি তৈল সরবরাহকারীর সাথে এই বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ঢাকার একটি ফার্ম মাটি ভরাটের কাজ করছে। আমি শুধুমাত্র তাদেরকে তেল সরবরাহ করছি। শুনেছি, মানিকছড়ি ওদিক থেকে ব্যক্তিমালিকাধীন একটি পাহাড়ের মাটি কেটে এনে এখানে ফেলা হচ্ছে। তবে বিস্তারিত আমি জানি না।

এদিকে কাপ্তাই হ্রদের আইন অনুসারে ১২০ ফুটের নিচে কোনও স্থাপনা তৈরি নিষেধ থাকলেও হ্রদের ন্যূনতম পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুটও এখানে মানা হচ্ছে না। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে ৯৮ এমএসএল(মিনস সী লেভেল) পানি রয়েছে। বর্ষাকালে আরো ১০ ফুট পানি বেশি থাকে। সে হিসেবে একেবারেই হ্রদের অনেক গভীরে গিয়ে পানিতে মাটি ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। মাত্রই কয়েক মাস আগেই এই জায়গার পাশে হ্রদের ওপর একটি ভবন নির্মাণ বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প পরিষদের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, কাপ্তাই হ্রদ দখল করে মাটি ভরাটের বিষয়টি ডাহা মিথ্যা কথা। এটি আমাদের রেকর্ডীয় জায়গা। আমরা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করি। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা হয়েছে এই বিষয়ে। ছয় মাস পানির নিচে থাকার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, জায়গাটি একটু ঢালু। তাই কিছু জায়গা পানিতে থাকে। তবে এটি হ্রদ দখল নয়।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, এই বিষয়ে আমি কোনওকিছু জানি না। এইপ্রথম বিষয়টি জানতে পারলাম। আমার সাথে কারোর কোনও কথা হয়নি। বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিচ্ছি।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button