রাঙামাটিলিড

যে কারণে স্থগিত হলো জেলা পরিষদের নিয়োগ পরীক্ষা ?

‘হাঁসের ডিমের বদলে মুরগীর ডিম’র জের !!

সুহৃদ সুপান্থ
১০৩ টি পদ আর বিপরীতে প্রায় সাত হাজার পরীক্ষার্থী। প্রস্তুত পরীক্ষার হল ও পরীক্ষার্থীরা। শেষ হয়েছিলো যাবতীয় আয়োজনও। কিন্তু পরীক্ষার মাত্র ১২ ঘন্টা আগে ‘অনিবার্য কারণ বশত’ পরীক্ষা স্থগিত করে নিয়োগকারি কর্তৃপক্ষ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। শেষ মুহুর্তের স্থগিতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হাজার সাতেক পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। কারণ ততক্ষণে পরীক্ষায় অংশ নিতে রাঙামাটির বাইরে বসবাসকারি পরীক্ষার্থীরাও হয় রাঙামাটিতে হাজিরা,নতুবা পথেই। কিন্তু কেনো পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এই নিয়োগ পরীক্ষার সব প্রস্তুতি শেষে একদম শেষ মুহুর্তে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিলো, এর রহস্য খুঁজে বের করছে পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ঘোষিত কারণটা ‘অনিবার্য কারণবশত:’ হলেও বাস্তব সত্যটা হলো,পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের এক চিঠিতেই ‘অস্থির’ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ‘আপত্তি’ জানিয়ে তাৎক্ষনিক স্থগিত করে দিয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া ! কিন্তু কি সেই চিঠি ?

কি আছে সেই চিঠিতে ?
পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর অনুসন্ধানী টীম জানতে পেরেছে, স্বাভাবিকভাবেই জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত যেকোন বিভাগের যেকোন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়। এবারও পরীক্ষার ঠিক আগের দিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পাঠানো ২৯ সেপ্টেম্বরের চিঠির ( স্মারক নং-২৯.৩৪.৮৪০০.২০৭.২৫.০০৯.২১-১২৩৫) এর বিপরীতে ৭ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সহকারি সচিব নাসরিন সুলতানা সাক্ষরিত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, ‘জেলা পরিষদের প্রেরিত চিঠির স্মারকের প্রেক্ষিতে আগামী ০৮/১০/২০২১ হতে ১৮/১০/২০২১ তারিখ পর্যন্ত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের বিভিন্ন পদে ( ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণী) কর্মচারি নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের নিমিত্ত মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কে নির্দেশক্রমে মনোনয়ন দেয়া হলো।’ এই চিঠি পেয়েই বিগঢ়ে যায় জেলা পরিষদ ! তারা জেলা প্রশাসনের কাউকে মানতে নারাজ।

কিন্তু কেনো ?
জেলা পরিষদের বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে, মূলত: জেলা প্রশাসন থেকে মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি মনোনয়ন করাতেই আপত্তি তাদের। শুধু আপত্তিই নয়, এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করে মন্ত্রনালয়কে পাল্টা চিঠিও দিয়েছে জেলা পরিষদ। এই প্রক্রিয়াকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ এবং ‘জেলা পরিষদের প্রবিধান’ এর বিরোধী সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করছেন তারা।

যা বলছে জেলা পরিষদ
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী বলছেন-‘ আমরা মন্ত্রনালয়ের কাছে চেয়েছি হাঁসের ডিম, ওনারা যদি আমাদের মুরগীর ডিম দেয়,তাহলে কি হবে ? আমরা মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি চেয়েছি, জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি নয়। বিষয়টি পার্বত্য চুক্তি ও জেলা পরিষদের প্রবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই আমরা আমাদের আপত্তির বিষয়টি জানিয়েছি মন্ত্রনালয়কে। আশা করছি তারা বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন এবং সমাধান করবেন।’ কেনো মন্ত্রনালয় এমন সিদ্ধান্ত নিলো বলে মনে করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন-‘আমি তো অনেক কিছুই মনে করছি,তবে আপাতত বলব না। দেখি…’। নিজেদের আপত্তির বিষয়টি মন্ত্রনালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

যা বলছেন পার্বত্য সচিব
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পার্বত্য সচিব হামিদা বেগম পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে বলেন-‘মন্ত্রনালয়ের পাঠানো চিঠিটি পড়লেই আপনারা সব বুঝবেন এটা চুক্তি বা আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা।’

প্রথমে শুধু ৮ অক্টোবরের পরীক্ষা স্থগিত করলেও পরে এ সংক্রান্ত সব নিয়োগই স্থগিত করে জেলা পরিষদ

এর আগে নজির আছে কি ?
পার্বত্য জেলা পরিষদে দুই মেয়াদের সদস্য হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর বলছেন,‘ আমার দুই মেয়াদের দায়িত্বকালে কোন নিয়োগেই জেলা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা নিয়োগ কমিটিতে ছিলোননা,থাকার সুযোগও নেই। পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রবিধানে নিয়োগ কমিটিতে মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধি প্রেরণের কথাই বলা আছে।’ তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়োগেও পার্বত্য মন্ত্রনালয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের এক উর্ধতন কর্মকর্তাকে নিয়োগ কমিটিতে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে জেলা পরিষদের প্রায় সব নিয়োগেই নিয়োগ কমিটিতে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ছিলেন চেয়ারম্যান মানিক লাল দেওয়ানের আগ্রহে।

কি বলছে নাগরিক সমাজ ?
এদিকে পার্বত্য মন্ত্রনালয় জেলা পরিষদগুলোর নিয়োগে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে একজন অবসরপ্রাপ্ত উর্ধতন সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন- ‘পার্বত্য মন্ত্রনালয় চাইলে তার অধস্তন যেকোন বিভাগের কর্মকর্তাকে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। তবে জেলা প্রশাসন সরাসরি যেহেতু পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের অধীন নয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের অধীন, সেক্ষেত্রে পার্বত্য মন্ত্রনালয় কেবিনেটকে অবহিত করে জেলা প্রশাসনকে একটি চিঠি দিয়ে একজন কর্মকর্তা নিয়োগ কমিটিতে প্রেরণের জন্য চাইতে পারেন। এখানে ঠিক কি কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে বুঝতে পারছিনা। ছোট্ট বিষয় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করে নিলেই হতো।’

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি’র রাঙামাটি জেলা সেক্রেটারি ললিত সি চাকমা বলছেন-‘ মন্ত্রনালয় যখন চিঠি দিয়ে কাউকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেন,তখন তিনি মন্ত্রনালয়ের প্রতিনিধিই,তখন তিনি কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন সেটা মুখ্য বিষয় নয়। এখানে পার্বত্য মন্ত্রনালয় নিজেরাই চিঠি দিয়ে যাকে মনোনয়ন করেছেন,তিনি মন্ত্রনালয়কেই প্রতিনিধিত্ব করবেন,এটা নিয়ে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। নেপথ্যে অন্য কোন বিষয় আছে কিনা আমি জানিনা।’

অন্যদিকে রাঙামাটি নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব জিসান বখতেয়ার বলছেন,‘ পার্বত্য মন্ত্রনালয়,জেলা পরিষদ এবং অন্যান্যরা,যে যেটাই করুক না কেনো,তাতে যেনো পার্বত্য চুক্তি বা জেলা পরিষদ আইনের ব্যত্যয় না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আইনে যেভাবে আছে সেভাবেই সবকিছু করা উচিত।’

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পরীক্ষার্থী বলছেন-‘ তাদের রশি টানাটানির দায় আমরা কেনো নিবো ? শেষ মুুহুর্তেই কেনো তাদের এসব নিয়ে নাটক করতে হবে ? আমাদের দোষ কোথায় ? তাদের কারণে আমরা কেনো কষ্ট পাব ?’

কি আছে জেলা পরিষদ আইনে
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগ বিধিমালায় যেকোন নিয়োগের কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে থাকেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,সদস্য সচিব থাকেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা,জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের আহ্বায়ক,পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের একজন প্রতিনিধি,পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের একজন প্রতিনিধি। ২০০০ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ নিজস্ব নিয়োগ বিধিমালা করার আগে এসব নিয়োগের কোন কোনটিতে জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধিরা থাকতেন। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে ড. মানিক লাল দেওয়ান চেয়ারম্যান থাকাকালিন সময়ে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিকে রাখতেন নিয়োগ কমিটিতে, চেয়ারম্যানের নিজস্ব ক্ষমতাবলে। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের শাসনামলে সেই ধারাবাহিকতা আর অক্ষুন্ন ছিলোনা। আবার জেলা পরিষদের নিয়োগ বিধিমালায়ও জেলা প্রশাসনের কোন প্রতিনিধি রাখার সুযোগ নেই। এর কারণ হিসেবে জেলা পরিষদ আর জেলা প্রশাসনের মধ্যকার ‘চাপা দুরত্ব’কেই একমাত্র কারণ মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিষয়টি নিয়ে যতটা জল ঘোলা হচ্ছে,ততটা ঘোলা করার ইস্যু নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। তুচ্ছ একটি বিষয়কে জটিল করার কারণে কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এর আগেও নিয়োগ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে ছিলো রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিগত পরিষদ নিজেদের মেয়াদের শেষার্ধে বলতে গেলে কোন নিয়োগই দেয়নি। বর্তমান পরিষদ দায়িত্ব নেয়ার পরই সবচে বড় নিয়োগটি আটকে গেলো ‘বড়’ অথবা ‘ছোট’ একটি প্রশ্নে !

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button