পার্বত্য পুরাণব্রেকিং

মরুভূমির দানবেরা

[ Todd Anderson কথিত গল্পগুলো Ven. Kurunegoda Piyatissa মহোদয় কর্তৃক সহজ বোধ্য ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়, যেগুলো “Buddha’s Tale for Young and Old Prince Goodspeaker Vol-1 I Vol-2” নামক গ্রন্থে সংকলিত করা হয়েছে। এসব কাহিনী মূলত জাতকেরই অনুগল্প, যেগুলো তিনি শিশু-কিশোরদের পাঠ উপযোগী করেই অনুবাদ করেছেন। বলাবাহুল্য, জাতক কাহিনীগুলো বৌদ্ধ সমাজে চরিত্র গঠনের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। বৌদ্ধ ভুক্ষুগণ বিশেষত ধর্মালোচনার সময় গৌতম বুদ্ধের অতীত কালের চারিত্রিক গুণাবলী বর্ণনা করতেই জাতক কাহিনীর অবতারনা করে থাকেন। সাম্প্রতিক বেদ সাহিত্যেও একই ধরণের কাহিনী প্ওায়া যায়। গ্রীক ও ঈশপের উপকথার কাহিনীগুলো বেদ ও বৌদ্ধ সাহিত্য থেকেই নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এসব গল্প Chaucer ও Boccaccio -র কাহিনীতেও স্থান পায়। উল্লেখ্য, গল্পটি অনুবাদ করার সময় অনেক ক্ষেত্রে word for word পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে যতটা সম্ভব কাহিনীর মূল বক্তব্যগুলো অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শব্দ চয়ণের ক্ষেত্রেও শিশু-কিশোরদের বিষয়টি লক্ষ রাখা হয়েছে।] অনেক দিন আগে দু’জন বণিক বাস করতেন। তারা ছিলেন বন্ধু। এক সময় তারা তাদের পণ্য সামগ্রী বিক্রি করার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাই তারা একসঙ্গে ভ্রমণ করবেন কিনা সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। অবশেষে তারা একমত হয় যে, যেহেতু তাদের প্রত্যেকের পাঁচশত করে গরুর গাড়ি রয়েছে এবং একই পথে ভ্রমণ করবেন, তাতে একই সঙ্গে যাত্রা করলে অধিক জটলার সৃষ্টি হবে।
একজন বণিক ঠিক করলেন, প্রথমে যাত্রা করা অধিকতর ভালো হবে। তিনি ভাবলেন, “গাড়ির চাকার দ্বারা পথে চিহ্নাদি অঙ্কিত হবেনা, আমার বলদগুলো উত্তম ঘাসগুলো বেছে নিতে পারবে, খাবার জন্য সব চেয়ে ভালো ফলমুল ও সবজিগুলো পাওয়া যাবে, আমার সফর সঙ্গীরা আমার নের্তৃত্বের তারিফ করবেন এবং অবশেষে আমি পণ্য সামগ্রী সব চেয়ে ভালো দামে বিক্রির জন্য দফারফা করতে পারবো।”
অন্যজন পরে যাত্রা করলে যেসব সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে সেগুলো মনযোগ দিয়ে বিবেচনা করলেন এবং বুঝতে পারলেন। তিনি ভাবলেন, “আমার বন্ধুর গাড়িগুলো ভূ-পৃষ্ঠকে মসৃণ করে দিয়ে যাবে, এতে পথ তৈরির কাজটা করতে হবে না। তার বলদগুলো বুড়ো খসখসে ঘাসগুলো খেয়ে ফেলবে আর আমার বলদগুলোর খাবার জন্য নতুন কচি আগাগুলো বেড়ে উঠবে। একইভাবে তারা বুড়ো ফলমূল ও সবজিগুলো সংগ্রহ করবে আর পরবর্তীতে বেড়ে উঠা টাটকাগুলো আমরা উপভোগ করবো। আমাকে রফাদফা করে সময় নষ্ট করতে হবে না, আমি ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে যাওয়া দাম পাবো আর মুনাফা অর্জন করবো।” তাই তিনি তার বন্ধুকে আগে যেতে দিতে সম্মত হলেন। এই বন্ধু নিশ্চিত ধরে নিলেন যে, তিনি তার বন্ধুকে বোকা বানিয়েছেন এবং তার উত্তম সুবিধাগুলো নিয়ে নিয়েছেন। তাই তিনি অগ্রে তার অভিযাত্রা শুরু করলেন।
প্রথম ভ্রমণকারী বণিক পথিমধ্যে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হলেন। এক সময় তারা “জলশূন্য মরুভূমি” নামক ঊষর প্রান্তরে উপনীত হলেন। স্থানীয় অধিবাসীরা এটিকে দানবদের আস্তানা হিসেবে বলে থাকেন। কাফেলাটি যখন মরুভূমির মাঝখানে পৌঁছলো, তারা বিপরীত দিক থেকে একটি বড় দলকে আসতে দেখলেন। তাদের গাড়িগুলো ছিলো কর্দমাক্ত এবং জবজবে ভিজে। তাদের হাতে এবং গাড়িতে পদ্ম ও শাপলা ছিলো। ‘সবজান্তা’ স্বভাবের দলনেতা বণিককে বললেন, “আপনারা ভারী জল বোঝাই করে চলছেন কেন? অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে অপরপ্রান্তের মরুদ্যানে পৌঁছবেন, যেখানে প্রচুর খাবার জল ও খেজুর রয়েছে। আপনার বলদগুলো গাড়ি বোঝাই অতিরিক্ত জল টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কাজেই জল ছুড়ে ফেলে দিন আর অত্যধিক পরিশ্রমে ক্লান্ত পশুদের প্রতি সদয় হোন।”
যদিও স্থানীয় লোকেরা তাদের সতর্ক করেছিলেন, এরা প্রকৃত মানুষ নয় – ছদ্মবেশী দানব তা বণিক অনুধাবন করতে পারেননি। এমন কি এদের দ্বারা তাদেরকে ভক্ষণের বিপদ থাকা সত্ত্বেও। এরা সহায়তাকারী এই আত্মবিশ^াসে তিনি এদের পরামর্শকে অনুসরণ করলেন এবং সমস্ত জল মাটিতে ফেলে দিলেন।
তারা ক্রমাগত অগ্রসর হলেও কোনো মরুদ্যান বা জল দেখতে পেলেন না। অনেকেই বুঝতে পারলেন যে, যারা তাদের বোকা বানিয়েছে তারা দানব ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা বণিকের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং অভিযোগ করতে লাগলেন। দিনশেষে কাফেলার সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। বলদগুলো জলশূন্যতার কারণে ভারী গাড়ি টানার পক্ষে খুবই দর্বল হয়ে পড়েছিলো। পশুগুলোসহ সকলেই এলোপাতাড়িভাবে শুয়ে পড়লো এবং গভীর ঘুমে ঢলে পড়লো। গভীর রাতে দানবেরা তাদের ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করলো এবং দুর্বল অরক্ষিত এসব প্রাণিগুলোকে গোগ্রাসে ভক্ষণ করে ফেললো। অবশেষে সেখানে হাড়গোড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইলো Ñ কোনো মানুষ বা প্রাণি জীবিত রইলো না।
কয়েক মাস পর, দ্বিতীয় নাবিক একই পথে রওয়ানা হলেন। তিনি যখন ঊষর প্রান্তরে উপনীত হলেন, তার সফর সঙ্গীদের একত্রিত করে বললেন, “এটাকে “জলশূন্য মরুভূমি” বলা হয়। আমি শুনেছি যে এটি দানব ও ভুতদের আস্তানা। অতএব আমাদের সাবধান হতে হবে। এখানে বিষাক্ত গাছপালা ও নোংরা জল থাকতে পারে। আমাকে জিগ্যেস না করে কেউ স্থানীয় জল পান করবে না।” এভাবে তারা মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলেন।
অর্ধেক পথ পাড়ি দেয়ার পর, পূর্বের কাফেলার ন্যায় একই পথে, তাদের জলে সিক্ত ছদ্মবেশী দানবদের সাথে দেখা হলো। তারা তাদের বলল মরুদ্যান কাছেই, তাদের উচিত জল ছুড়ে ফেলে দেয়া। কিন্তু বিচক্ষণ বণিক তাদের সঠিকভাবে অবলোকন করলেন। তিনি জানতেন যে জায়গার নাম ‘জলশূন্য মরুভূমি’ সেখানে মরুদ্যান থাকার কোনো মানে হতে পারে না। তাছাড়া এই লোকগুলোর স্ফীত লালচে চোখ রয়েছে এবং এদের মনোভাব আগ্রাসী ও প্ররোচনামূলক। তাই তিনি এদের দানব বলে আশঙ্কা করলেন। তিনি তাদের বললেন, “আমরা এমন ধরণের ব্যবসায়ী, যারা পরেরটা কোথা থেকে আসবে তা জানার আগে ভালো জলগুলো ছুড়ে ফেলেন না।”
অতঃপর তার লোকজনদের সন্দেহ রয়েছে দেখে বণিক তাদের বললেন, “যতক্ষন না আমরা জলের সন্ধান পাচ্ছি এদের বিশ^াস করবে না, এরা দানব হতে পারে। যে মরুদ্যানের সন্ধান তারা দিল তা ¯্রফে ভ্রম বা মরীচিকা হতে পারে। তোমরা কি কখনও ‘জলশূন্য মরুভূমি’-তে জলের কথা শুনেছ? বাতাসে কোনো আদ্রতা অনুভব করছ বা ঝড়ো-মেঘ দেখতে পাচ্ছ?” তারা সকলেই বললো, “না”, তারা বলতে লাগলো, “যদি আমরা এই আগন্তুকদের বিশ^াস করে জলগুলো ফেলে দিই তাহলে পরবর্তীতে আমাদের খাবার ও রান্নার জল থাকবে না। এতে আমরা এতটাই দুর্বল ও তৃষ্ণার্থ হবো যে দানবদের পক্ষে আমাদের ডাকাতি করা, এমন কি ভক্ষণ করা সহজ হবে। সুতরাং, যতক্ষন না আমরা প্রকৃত জলের সন্ধান পাচ্ছি, এক ফোটা জলও নষ্ট করবো না।”
কাফেলা ক্রমাগত অগ্রসর হতে থাকলো, এবং যে স্থানে পূর্বের কাফেলার লোকজন ও বলদগুলো দানবেরা মেরে ফেলেছিলো এবং ভক্ষণ করেছিলো সন্ধ্যার সময় সেই স্থানে এসে উপনীত হলো। তারা চারপাশে গাড়িগুলো এবং মানুষ ও পশুর হাড়গোড় পড়ে থাকতে দেখলো। তারা বুঝতে পারলো যে সামগ্রী বোঝাই গাড়িগুলো আর হাড়গোড়গুলো পূর্বের কাফে‘লার। বিচক্ষণ বণিক তার লোকজনদের রাত্রে ছাউনীর চারপাশে নজর রাখতে বললেন।
পরদিন সকালে কাফেলার লোকজনেরা প্রাতঃরাশ সারলেন এবং বলদদের ভালো করে খাওয়ালেন। তারা প্রথম কাফেলার মূল্যবান জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে নিলেন। এইভাবে তারা সফলভাবে তাদের অভিযাত্রা সমাপ্ত করলেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে এলেন। এরপর তারা অর্জিত মুনাফায় পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে জীবন যাপন করতে লাগলেন।
১ অক্টোবর, ২০১৭
রাঙ্গামাটি

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button