নীড় পাতা / পাহাড়ের সংবাদ / খাগড়াছড়ি / মন খারাপ রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির
parbatyachattagram

মন খারাপ রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির

টানা দ্বিতীয়বার পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী মনোনীয় হওয়া মন খারাপ পার্বত্য দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির। বীর বাহাদুরের পূর্ণমন্ত্রী হওয়ার খবরে বান্দরবানজুড়ে যখন উচ্ছাস আর আনন্দ সীমা ছাড়িয়েছে,সেই সময় দৃশ্যত বিষাদ ছুঁয়েছে অন্য দুই পাহাড়ী কণ্যাকে।

চায়ের আড্ডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,সর্বত্রই শুধু দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির বঞ্চিত হওয়ার আক্ষেপ।

রাঙামাটির প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেছেন, ‘পার্বত্য সমস্যা সমাধানে বরাবরই নেতৃত্ব দিতে হয় পার্বত্য রাঙামাটিকেই,কারণ রাঙামাটিই পাহাড়ের মাদার ডিস্ট্রিক্ট। রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মন্ত্রীসভায় ঠাঁই না পাওয়ায় পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠার যে কাজ,তা বাধাগ্রস্ত হবে এবং রাঙামাটিবাসিও বঞ্চিত হবে। আমার বিশ^াস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে কোন সুযোগ তৈরি হলে রাঙামাটির বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখবেন।’

রাঙামাটির বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক অভয় প্রকাশ চাকমা বলেছেন, ‘একটা মানুষ নির্বাচনে দাঁড়ানোর পর তার মনোনয়নের বিরোধীতা করা,মনোনয়ন পাওয়ার পর জিততে না দেয়ার চেষ্টা করা এবং সকল বাধা জয় করে নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রীসভায় যেনো ঢুকতে না পারে তার বিরোধীতা করে সফল হওয়ার মাধ্যমে পাহাড়ের চিহ্নিত একটি মহল যে অপকর্মটি করেছে তা অবশ্যই কষ্টের। আমরা হতাশ। ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাঙামাটিই মাদার ডিস্ট্রিক্ট বা পাহাড়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। গতমেয়াদেও রাঙামাটি বঞ্চিত হয়েছে,এবারও হলো। এটা কষ্টদায়ক। কেনো এটা হলো,সেই হিসাব মেলাতে পারছি না আমরা।’

রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মনসুর আলী বলেছেন, ‘ শুধু আমার নয়,রাঙামাটির সবার মন খারাপ। গত মেয়াদে বঞ্চিত হওয়ার পর এবারও রাঙামাটি মন্ত্রীবঞ্চিত। যে আশা ও ভরসায় রাঙামাটির মানুষ দলমত নির্বিশেষ ভোট দিয়ে বিপুল ভোটে দীপংকর তালুকদারকে বিজয়ী করেছেন,সেটার অবমূল্যায়ন হলো। আমরা মন্ত্রীসভা ঘোষণার পর হতবিহ্ল হয়ে পড়েছি। কেনো এমনটা হলো বুঝতেই পারছিনা।’

শুধু বিশিষ্টজনরাই নয়, হতাশ ও ক্ষোভের কথা লিখেছেন দুই জেলার সংবাদকর্মীরাও। রাঙামাটির তরুণ সাংবাদিক শংকর হোড় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দাদা দীপংকর, আপনার জীবনে সবচে বড় ভুল ছিলো ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে আপনি মাথা ঘামাননি, তাতে আপনার পরাজয়, কিন্তু পরাজয়ের পরও আপনি পাহাড়ের চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন, একের পর এক পাহাড়ি আওয়ামীলীগারদের ওপর হামলার পরও আপনি শান্তির কথা চিন্তা করে পাল্টা অ্যাকশনে যাননি, এসব ঘটনায় বড় কোনও নেতার বিরুদ্ধে মামলাও হয়নি, আপনার সবচে বড় ভুল আঞ্চলিক দলগুলোর তীব্র বিরোধিতার পরও মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে এগিয়ে গেছেন। মন্ত্রী, এমপি না হয়েও ১০ উপজেলা চষে বেড়ালেন। মজবুত করেছেন দলীয় অবস্থান। আঞ্চলিক চারটি সংগঠনকে কৌশলে মোকাবেলা করেছেন। জনসংহতি সমিতির স্বর্গভূমিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে নির্বাচনে জয়লাভ। আর এসবের ফলাফল শূন্য। আর যাকে এসবের মোকাবেলাই করতেই হয়নি। আর গত পাঁচ বছরে যার কারণে অন্য দুই জেলা উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে, তাকেই দিলো প্রমোশন!!!!! এরই নাম রাজনীতি!!!!! অতত্রব, যে বনে বাঘ নেই, সে বনে বিড়ালই বাঘ। আর তার গলায় সোনার হার উঠবে, এটাই স্বাভাবিক….যাক দীপংকর দা, আপনি গত পাঁচ বছর যেভাবে তৃণমুলের নেতা ছিলেন, সেভাবেই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকুন। মন্ত্রণালয়ই শেষ কথা নয়। জনমানুষের নেতা হয়ে থাকুন।’

খাগড়াছড়ির তরুণ সাংবাদিক অপু দত্ত লিখেছেন ‘ আমরা খুশি হতে পারিনি বলে দুঃখিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা খাগড়াছড়ি। ইতিহাস বলে পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতা পাড়ি দিয়ে আসলেও এই জেলা সবসময় বঞ্চিত হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম পাহাড় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হয়তো নতুন কোন চমক থাকবে। কিন্তু তা আর হলোনা…। আমরা আশা করেছিলাম এবার খাগড়াছড়ি থেকে মন্ত্রী করা হবে। যদি কোন কারণে তা না হয় তবে রাঙ্গামাটি থেকে মন্ত্রী বানানো হবে। কিন্তু সেই বীর’দার উপর ভরসা রাখলেন আপনি। বীর বাহাদুর ৬ষ্ট বারের মত নির্বাচিত সংসদ সদস্য হতে পারেন তবে তিনি পাহাড়ের নেতা হতে পারেননি। উনাকে পাহাড়বাসী ক’জন পছন্দ করেন সেটা যাচাই করা যেত। খোদ বান্দরবানবাসীকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। নির্বাচনের আগে বীর’দার কাছের মানুষগুলোও বলেছে দুই জেলার চেয়ে উনি বান্দরবানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মানলাম যে জেলার মানুষ সে জেলাকে গুরুত্ব দিবে। কিন্তু তাই বলে অপর দুই জেলার সাথে উন্নয়ন বৈষম্য করে নয়। এক জেলা এগিয়ে থাকবে অপর জেলা পিছিয়ে থাকবে তাতো হতে পারেনা। গত পাঁচ বছরে তিনি খাগড়াছড়িতে সর্বোচ্চ ৪বার এসেছেন! যে মন্ত্রনালয় ৩জেলা নিয়ে গঠিত সেই তিনজেলার একটাতে যদি ৫ বছরে ৪ বার আসেন তাহলে উনি চেয়ারে বসে কি এমন কাজ করেছেন তা বোঝা যায়!!
গেল বছর পুনর্মিলনীর দাওয়াত দিতে গিয়ে উনার মুখ থেকে খাগড়াছড়ি নিয়ে বিশদ কটু মন্তব্য আমাদের হজম করতে হয়েছে। দাওয়াত দেয়া ছাড়া উনি কোন দিন খাগড়াছড়ি আসেননি। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকা অবস্থাতেও খাগড়াছড়ির রাজনীতি নিয়ে উনি কোন ভূমিকা নিতে পারেননি। বীর দা শুধু বান্দরবানের নেতা, বান্দরবানের মন্ত্রী, এটি বান্দরবান বিষয়ক মন্ত্রনালয়। নতুনদেরও সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন ছিল। রাঙ্গামাটি আর খাগড়াছড়ির দুই ‘দাদা’ থেকে কোন এক দাদাকে এনে চমক দেয়া যেত। আমরা হতাশ। তবে একটা জায়গায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ, তিনি পাহাড়বাসীকে পূর্ণমন্ত্রী দিয়েছেন..। তবুও আশায় বাঁধি বুক…’।

এই দুই তরুণ সাংবাদিকের ফেসবুক স্ট্যাটাস যেনো ছিলো নিজ নিজ জেলার মানুষের সামগ্রিক হতাশারই বহি:প্রকাশ। এরা ছাড়াও আরো অসংখ্য মানুষ নিজের হতাশার কথা লিখেছেন।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোতির্ময় চাকমা কেরল লিখেছেন, ‘রাজনীতিতে যোগ্যতার দাম নেই আরো একবার প্রমাণ হলো। নতুন মন্ত্রী পরিষদের আজকের তালিকাটা প্রমাণ দিল। রাজনীতিকে বিদায় জানাবো কিনা ভাবতেছি।’

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য সবীর কুমার চাকমা লিখেছেন, ‘ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ খুবই হতাশ হয়েছেন তাদের প্রিয় নেতা দীপংকর তালুকদার মন্ত্রীসভায় মনোনীয় না হওয়ায়।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চিংকিউ রোয়াজা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে বলেছেন, ‘ আমরা ভেবে ছিলাম রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকার প্রিয় ব্যক্তিত্ব দীপংকর তালুকদার অনেক কঠিন পরিস্থিতি পার করে সংসদ সদস্য হয়েছেন। রাঙামাটির প্রতিটি মানুষ নেত্রীর প্রতি আস্থাশীল থেকেই চিন্তা করেছিল দীপংকর দা নেত্রী ওনাকে পরুস্কার দিবেন। কিন্তু তা হলো না। দুঃখ তো অবশ্যই পাইছি। দীপংকর দার কিছু হলে রাঙামাটি যে পিছিয়ে পড়েছে তা কিছুটা এগিয়ে নেয়া যেত। তারপরও নেত্রীর প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রাখছি।’

তবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির সাংবাদিকদের হতাশার বিপরীতে আশাবাদ ও উচ্ছাসের কথাই লিখেছেন বীর বাহাদুরের নিজের জেলা বান্দরবানের সংবাদকর্মীরা। বান্দরবানের সিনিয়র সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মনু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রিয় নেতা বীর বাহাদুর উশৈসিং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। নতুন মন্ত্রীকে শুভেচ্ছা।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

এডিসি বাংলো এখন বখাটেদের আখড়া!

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি পর্যটন রোডে এডিসি হিল বাংলো এখন মাদকসেবী আর বখাটেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eight + eight =