ব্রেকিং নিউজ
নীড় পাতা / ব্রেকিং / মনিকাদের খেলার মাঠ খানাখন্দে ভরা
parbatyachattagram

মনিকাদের খেলার মাঠ খানাখন্দে ভরা

বাংলাদেশের নারী ফুটবলার মনিকা চাকমা (১৬)। সম্প্রতি বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে একটি দর্শনীয় গোল যেটি ফিফার দর্শক জরিপে সেরা পাঁচে স্থান পেয়েছে। সেই থেকে আলোচনায় এখন মনিকা চাকমা। দুর্গম পাহাড় থেকে কীভাবে উঠে এলেন জাতীয় পর্যায়ে। কিন্তু মনিকাদের পথচলা এতটা মসৃণ ছিলোনা। তাদের আতুর ঘর রয়েছে বেহাল দশায়। নেই অনুশীলনের জন্য যুগোপযোগী মাঠ, নেই পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলাধুলার সরঞ্জাম। কিন্তু তারা অদম্য চেষ্টা ও নিজেদের ইচ্ছা শক্তি কাজে লাগিয়ে এতকুটু পথ পাড়ি দিলেন। মুগ্ধ করেছেন ক্রীড়ামোদী মানুষকে। বিশ^দরবারে উজ্জ্বল করেছে দেশের নাম।

মনিকা চাকমার জন্ম খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুর্গম সুমন্ত পাড়া গ্রামে। মনিকা চাকমার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা এক জন কৃষক। মা রবিমালা চাকমা গৃহিনী। কিন্তু জন্ম তাঁর এই দুর্গম পাহাড়ে হলেও বেড়ে উঠেছেন রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়াতে। ঘাগড়ার মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে এখন ঘাগড়া কলেজে পড়াশোনা করছেন মনিকা চাকমা। ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিলো তাঁর প্রচন্ড ঝোঁক। একজন মেয়ে হয়েও শত বাধা ডিঙিয়ে ফুটবল শৈলির মাধ্যমে অনুর্ধ্ব-১৯ নারী দলে ডাক পান মনিকা চাকমা।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুরু থেকেই নানা টানা পোড়নের মধ্যে দিয়েই তাদেরকে ফুটবল খেলায় টিচিং দিয়ে যাচ্ছেন কোচ শান্তি মনি চাকমা। বিভিন্ন ধরণের সংকট রয়েছে তাদের, রয়েছে খানাখন্দ ভরা মাঠ। এরমধ্যে সামান্য বৃষ্টি হলেই জমে যায় এক গাধা কাঁদা। এভাবেই তাদের দুইবেলা অনুশীলন করতে হয়। মাঠে একটি গোলবার থাকলেও অন্যটি বাঁশের তৈরি। ১৫-১৬ অনুশীলনকারী ফুটবলারকে দুইটি বল দিয়ে অনুশীলন করতে হয়। রয়েছে জার্সি থেকে শুরু করে অন্যান্য সরঞ্জামের সংকট।

অন্যদিকে এখানে তাদের থাকতে হচ্ছে হোস্টলে। সকাল-বিকাল দুই বেলা অনুশীলনের ফাঁকেই নিজেদের রান্না করতেই নিজেদেরই। পরিবারের কাছ থেকে আনা অর্থ দিয়ে মাস কাটায় তারা। এরমধ্যে পড়াশোনার চাপতো আছেই। সবমিলিয়ে শতকষ্টের মধ্য দিয়ে তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা। এই মাঠ থেকেই মনিকা চাকমা ছাড়াও নারীদের জাতীয় দলে খেলছেন অ্যানাই মগিনী, আনুচিং মগিনী, ঋতুপর্ণা চাকমা ও রূপনা চাকমা।

কৃতী ফুটবলার মনিকা চাকমা জানান, তাদের ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা অনেক কষ্ট করেই পড়াশোনা করছে। তারা বিভিন্ন ধরণের সংকটের মধ্য দিয়ে সকাল-বিকাল এই মাঠে দুইবেলা অনুশীলন করে। এই মাঠের অবস্থা খুবই খারাপ। এই মাঠ যদি ভালো হয় তাহলে আমাদের অনুশীলন করতে আরও ভালো হবে। ছেলেমেয়েরা যেভাবে বল পুশ-পাস করে তাদের এগুলো এনাপ না। যার কারণে বলগুলো দৌড়ে অন্যদিকে যায়, এর কারণে বল রিসিভও ভালো হয় না।

মনিকা বলেন, যেহেতু আমি শুরু থেকে এই মাঠে খেলেছি, অনুশীলন করেছি তাই আমি সরকারের কাছে দাবি রাখবো। সরকার যেনো মাঠটা খেলার খেলার উপযোগী করে দেয়। এই বিদ্যালয়ের মাঠে এই ভাবে অনুশীলন করে আমরা ন্যাশনাল টীমে পাঁচজন খেলতেছি। আমি অনেকেই এসব বিষয়ে সরকার নজর দিলে আমাদের এখান থেকেই আরও অনেক মেয়ে ন্যাশনাল টীমে খেলতে পারবে।

মনিকা চাকমাদের ফুটবল কোচ শান্তি মনি চাকমা বলেন, ২০১১ সালেই বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই মনিকাদের নিয়ে আমাদের যাত্রা। ২০১১ সালে সারা বাংলাদেশে মগাছড়ি সরকারি বিদ্যালয় টীম চ্যাম্পিয়ান হয়। ২০১৩ সালে আমরা আবার জাতীয় পর্যায়ে রানার্স-আপ হই। তখন থেকেই আমরা এই টীম ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। শান্তি মনি চাকমা বলেন, আমাদের মতো নিরলসভাবে কাজ করলে বিভিন্ন এলাকায় থেকে খেলোয়াড় উঠে আসতো। সে ধরণের উদ্যোগের অভাবে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসছে না।

তিনি বলেন, ‘এখানে মেয়েদের অনুশীলনের জন্য খাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটিই রয়েছে। এছাড়া আর কোনো ভালো মাঠ নেই। এই মাঠে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা। উঁচু নিচু মাঠ, এরমধ্যে পাথর-কুচি। খালি পায়ে বাচ্চারা অনুশীলন করতে পারে না। সামান্য বৃষ্টি হলেও মাঠে জমে যায় কাঁদা।’

ওই এলাকার বাসিন্দা শান্তিময় চাকমা বলেন, মাঠটা আগে খুবই করণ অবস্থায় ছিলো। সেনাবাহিনী তাদের বুলডোজার এনে কিছুটা সমান করে দিয়েছে। যেহেতু এটি একটি ঐতিহাসিক মাঠ, এই মাঠ থেকেই ৫/৬ জন জাতীয় দলে খেলছে। তাই আমি সরকারের কাছে এই মাঠ সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছি। মাঠটি দ্রুত সংস্কার করে দিলে এলাকার ছেলেমেয়ে ও বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে। পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের তেমন ভালো খেলাধুলার সরঞ্জাম, বুট, জার্সি, ফুটবলও নেই। সে ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসা দরকার।

রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজম বলেন, ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু করা সম্ভব না হলেও আমাদের শুভাকাক্সক্ষী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছে তিনি শীঘই সেখানে যাবেন। ছেলেমেয়েদের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনবেন। এবং ফুটবলার মনিকার পরিবার আর্থিক সহায়তা করবেন। এছাড়া ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার সুবির্ধাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হাতে নিবেন।’

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানান, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে তথ্য রয়েছে। আমি রোজার পরেই তাদের পাশে দাঁড়াবো। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ দেওয়া হবে।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

‘জঙ্গিপনা যে অশুভ ছায়া ফেলছে তার বিরুদ্ধে মৈত্রী বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে’

মৈত্রীপূর্ণ চিন্তা চেতনা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার আহবান …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 5 =