খোলা জানালাব্রেকিংলিড

বৃষ্টি যে পাড়ায় কেবলই আতংক ছড়ায়……

গল্পগুলো বর্ষায় পেরিয়ে এক শীতবেলার-

ভর দুপুরের জ্বলজ্বলে রোদ। শহরের শেষপ্রান্তে মূল সড়কের পাশেই উঁচু সমতল পাহাড়।এক ঝাক দূরন্ত শিশু মেতে আছে শৈশবের দূরন্তপনায়। মায়েরা আশেপাশেই শীত রোদ জড়াচ্ছে গায়ে। কিছুদিন আগেও জীবন কি এমন ছিলো ! ছিলোনাতো !!

পাহাড়ের চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতেই ভাবছিলাম,এমন সময় নিচ থেকে উঠে এলো দূরন্ত রবিউল।বয়স কত হবে ৭/৮। পাহাড়ের ধ্বসে যাওয়া অংশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি।রবিউল ছোট্ট রবিউল আমাকে শুনাচ্ছে সেদিনের গল্প! সে রাতের গল্প। রবিউলই আমাকে শোনালো বাবা মা হারানো ছোট্ট মীম আর সুমাইয়ার কথা।

১২ জুন সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষনে ১৩ তারিখ মধ্যরাতে শুরু হওয়া পাহাড়ের অভিমান ঝড় বয়ে গেছে এই পাহাড়েরই বুক চিড়ে যাওয়া মানুষগুলোর উপর দিয়ে। ছোট্ট রবিউলের নিজের বাসার কোন ক্ষতি হয়নি,কিন্তু এই ছোট্ট বাচ্চাটা কি সাবলীল ভাবে আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছে অন্যের মা বাবা হারানোর গল্প। শোনাচ্ছে সারি সারি লাশের গল্প। জিজ্ঞেস করেছিলাম-ভয় পাওনি?

-সাবলীল উত্তর,নাহ!

আসলেই কি ভয় পায়নি! হয়তো পায়নি। ভয় পাহাড় ধ্বস কেন কি জন্য এতকিছু বোঝার বয়স কি তার হয়েছে ! হয়নিতো ! কিন্তু যে গল্প যে পরিস্থিতি তার চোখে মননে সেটে গেছে তা কি তাকে স্বাভাবিকভাবে বড় হতে দিবে। প্রতিদিন ঘুম ভেংগে সে যে ধ্বংসস্তূপ দেখে এরমাঝে কি স্বাভাবিকভাবেই বড় হবে!

এমন সব শংকা নিয়েই রবিউলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেলাম শহরের অদূরের রূপনগর নামক বসতি থেকে।

ঠিক সামনেই রাস্তার উপর পাশে শিমুলতলী এলাকা,পাশাপাশি নয়াবাজার। যারা কোনদিন এই এলাকার নামও শুনেনি তাদের মুখেমুখেও এখন নামগুলো আতংক হয়ে ঘুরে ফিরে। পাহাড়ের পাদদেশেই ঘনবসতি হাজার মানুষের।

হাঁটছি দেখছি ঘুরে দাড়ানোর প্রচেষ্টা স্পষ্ট প্রতি বাড়ির গায়ে। স্পষ্ট এখনো সেদিনের ক্ষতও। অধিকাংশ বাড়ি জায়গাই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হুট করে দেখে বোঝার সাধ্য নেই এইখানে বাড়ি ছিলো। পাহাড় ছিলো।

৭৫ ছুঁই ছুঁই বয়সের শহর বানু। টিনশেডের ছোট্ট ঘরের সামনে রোদে শুকাচ্ছিলো ছোট খাট বাঁশ লাকড়ি,উনুনে দিবে। আমাদের দেখেই কেমন জানি অতি আগ্রহে এগিয়ে এলো। কে আমরা কোথা থেকে এলাম কোন জিজ্ঞাসা ছাড়াই হাত বাড়িয়ে দেখাচ্ছিলো নিজের বাড়ি। এখন যে বাড়িতে আছে তার থেকে আরো দশ হাত নিচে তার বাড়ি। হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো এখন যে বাড়িতে আছে,ভাড়া সে বাড়িতে। গড়গড় করে বলে যাচ্ছে কি ঘটেছিলো সেদিন রাতে। পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত শহর বানু নিজেও নিজ পরিবার থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো সেদিন রাতে শেষ রাতের তান্ডবে।পাহাড় ধস্বের কাদা পানিতে ডুবে গিয়েছিলি কোমড় অব্দি নিজেও। টেনে হেঁচড়ে বের করেছিলো অন্যরা খুঁজে। বলতে বলতেই কেমন ভয়ার্ত হয়ে উঠেছে মানুষটার চোখ। থাকেন নাতী নাত জামাইয়ের সাথে। পাহাড় ধ্বসের পরের সময়টায় ছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ফিরে এসে আছেন ভাড়া বাসায়। নিজের বাসার উপরের টিনগুলোই আছে শুধু নিচ থেকে ভেঙে ভেসে গেছে সব পাহাড় মাটি।

তবুও শহর বানুর শুকরিয়া বেঁচেতো আছেন প্রাণে। ঘুমের ভেতর তিনিতো তলিয়ে যাননি পাহাড়ের স্রোতে। এখন কেবল নিজ বাড়িতে ফেরত যেতে যান,চান সহায়তা নিজের বাড়িটাকে আগের মত করে পেতে কেউ যদি বাড়িয়ে দেয় একটু সাহায্যের হাত। শহরবানুকে আশা জাগানোর আমি কেউ নই,তবুও তার মনেহলো দু:খের কথা অকপটে বলা যায় আমারই কাছে।নিজেই হাতে ধরে নিয়ে গেলো দেখাতে তার স্বপনের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ।বলেছিলাম এখান থেকে চলে যান,”ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে শুধু বলেছে,মারে নিজের বাড়ি নিজের ভিটা থুইয়া কই যামু”! উত্তর কি আমার কাছেও ছিলো !!

তার ঠিক নিচেই আরেক ধ্বংসস্তূপ। পাশেই শফিকুল আর তার স্ত্রী সাথে ভাই নিজেরাই হাত মিলিয়ে চেষ্টায় আছে নতুন বাড়িটাকে দাঁড় করাতে। আগের যে জায়গায় বাসা ছিলো সে জায়গা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন। অর্থাভাবে এতদিন আটকে ছিলো অন্যজনের বাড়িতে হাতে টুকটাক টাকা আসায় এখন আবার চেষ্টায় আছে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে।

পাশেই মনিরা বেগমের দোকান। ঘরের ভেতর ছোটখাট দোকান। দোকানের সামনেই মস্ত পাহাড়। সকাল বিকাল দোকানের চৌকাঠে বসে পাহাড়ে চোখ রেখে কাঁদেন মনিরা বেগম। স্বামী সন্তান সংসার হারা বৃদ্ধ মানুষটার যে এই ঘরটাই ছিলো সম্বল। সেদিন রাতে সামনের পাহাড়ের চূড়াটাই ভেঙে এসে ঢুকে গেলো ঘরে। ঘর অর্ধেক পাহাড়ের নিচে। ভরাট হয়ে গেছে পেছনের পুকুরটাও। পাহাড়ের দিকে চেয়েই তাই যত কান্না তার।

.

এখনো খোলা আকাশের নিচেই রান্না বান্নার কাজ সারেন বাদশা মিয়ার বউ। কোনমতে মাথা গোজার জন্য একটা এক চালা দিয়ে ভেতরে একটা চৌকি পাতা। ওটুকুই সম্বল।

অথচ নিজের দু:খ ভুলে আমাকে শোনাচ্ছে নবী হোসেনের গল্প। মসজিদের পাশেই বাসা সেই নবী হোসেন যে কিনা ধ্বস শুরু হওয়া ৫ মিনিট আগেও মসজিদের মাইক থেকে এ্যানাউন্স করেছেন সবাইকে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে। মাইকে সবাইকে সতর্ক করে ফিরে গেছেনে নিজের ঘরে। কেন বের হলেন না নিজের ঘরের লোকজন সেই আফসোসেরই সুরই বাজছিলো বাদশা মিয়ার বউয়ের গলায়। বেঁচে নেই নবী হোসেন, যে মানুষটা মোয়াজ্জেনের অনুপস্থিতিতে আযান দিতেন নামাজ পড়াতান। পাড়ার সবার ভালো মন্দের খোজ নিতেন। বেঁচে নেই তার পরিবারের কেউই। এক পরিবারের ৮টা মানুষ চাপা পড়েছেনে নিজ ভিটায়। লাশ পেতেও সময় লেগেছিলো অনেক। পুরোটা পাহাড় যে তার ঘরেই।এখনো নিশ্চিহ্ন তার বাড়ির ভিটা। ঢেবে গেছে ১০/১২ হাত নিচে।

ছেলে রুবেল আর স্ত্রী বেচে গেছেন কেবল শহরের বাইরে থাকায়। আরেক ছেলে সুমনও চাপা পড়েছিলো সেদিন পাহাড়ের নিচে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর এখন আছে এক আত্নীয়ের বাসায়।

এপাড়ায় গলিতে গলিতে এখনো স্পষ্ট ধ্বংসস্তূপ। সেদিন রাতের তান্দবলীলা স্পষ্ট এখনো। ভরাট হয়ে আছে সব ড্রেন। আগামী বর্ষার আগে ব্যবস্থা না নেয়া হলে আবারো ঘটতে পারে বড় ধরনের দূর্যোগ। প্রতি নিয়ত স্বাভাবিক জীবনের স্রোত খুঁজে বেরানোর এই মানুষগুলো এখনো মাঝ রাতে ঘুম ঘোরে জেগে উঠে। তবুও ছেড়ে যেতে পারেনা নিজ ভিটা।যাবে কই।পূর্নবাসন কে দিবে। কোথায় দিবে। চোখের সামনে ভয়ার্ত ধ্বংসস্তূপ রেখে ঘুমহীন রাত পার করে দিনশেষে তবুও তৃপ্তির ঢেকুর তুলে, বেঁচেতো আছি,সুস্থতো আছি,আমার মেয়েতো বাবা মা হারায়নি,আমিতো সন্তান হারাইনি।

জীবনের স্বাদ বাতাসে ভাসিয়ে ছুটতে ছুটতে পৌঁছেছি ভেদভেদী বাজার ঘেঁষে ছুটে যাওয়া রাস্তায়। খানিকটা এগুলেই সবচেয়ে উচু রাস্তাটায় থেমে চোখ আটকাবে নিচের ধুঁ ধুঁ

মাঠে একলা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা এক দ্বিতল বাড়ির দিকে। খাঁ খাঁ মাঠে এই বাড়িটা একা কেন। বাড়িটা কি আসলেই একাই ছিলো। নাহ! উত্তর দিলেন বাড়ির কর্তা রতন চাকমা।

তার বাড়ির সামনেই ছিলো দুই বোনের দুই সংসার। একজনের ক্লাশ সেভেনে পড়ুয়া একজন ও আড়াই বছরের এক মেয়ে নিয়ে, অন্যজনের ছিলো এক ছেলে নিয়ে সংসার।

দু’জনেরই স্বামী ছিলেন চাকরীসূত্রে বাইরে। সেটাই ছিলো ভাগ্য। আর সেদিন রাতের ধ্বসে ঘুমের মধ্যেই চাপা পড়েন দু দুটো পরিবার,মা সন্তান সবাই। পুরো বাড়ি দুটো চলে গেছে মাটির নীচে । কেউ বলে না দিলে কেউ আঁচও করতে পারবেনা এখানে বাড়ি ছিলো। রতন চাকমার নিজের দ্বিতল বাড়ির নিচতালাও চলে গিয়েছিলো মাটির নিচে।

আশ্রয় নিয়েছিলেন আত্মীয়ের বাড়িতে ফাটল ধরা বাড়িতে ফিরে এসে এখন চলছে সংস্কারের কাজ। এই পথ ধরেই যত ভেতরে হাঁটবেন ধ্বংসস্তূপ ভাসবে চোখের সামনে।

 

গল্পগুলো পুরনো-আজ থেকে তিনবছর আগের বর্ষার শেষে এক ডিসেম্বরের।যেই বর্ষায় এই  পাড়ার মানুষের জীবনে নেমে এসেছিলো এক কালরাত্রি! ১৩ জুন ২০১৭। রাঙামাটির ইতিহাসে ভয়াবহ এই দূর্যোগ প্রাণ হারিয়েছিলো ১১৫জন। সাধারণ মানুষের সাথে ছিলো উদ্ধার কাজে নামা সেনাসদস্যও।সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো প্রায় এক মাস। রাস্তায় আটকা পড়েছিলো শত শত গাড়ি।

সময় পেরিয়ে গড়ালো বছর তিন।কেমন আছে রবিউল শহর বানু শফিকুলরা।ছোট্ট রবিউওল কি ভুলে গেছে সব সেই ভয়ংকর রাত!আসলেই কি ভুলে যাওয়া সম্ভব!মনে থাকলেই বা কি ! রবিউল ওপাড়ার লোকজন ঠিক একই পাহাড়ে একই আকাশের নিচে ঘর বেঁধেছে আবারো বেঁচে থাকার মন্ত্রনায়।শিমুলতলী কিনবা শহর ঘুরলেই সেই ক্ষত স্পষ্ট এখনো।সমস্ত বেদনা বিষাদ নিয়েই বেঁচে থাকা।ভেঙ্গে যাওয়া শহরের প্রবেশ মুখের মূল সড়কটিওএখনো বহন করছে ক্ষত চিহ্ন।শহর জুড়ের ক্ষত বিক্ষত রাস্তা আর পাহাড়ের বুক আজো জানান দেয় সেই রাতের সেই ভয়াবহতা।এইভবেই চলছে জীবন!এভাবেই চলবে হয়তো!কেবল বৃষ্টি এলেই কেঁপে উঠে বুক,ভয় আত্ংকে হারায় কাটে নির্ঘুম রাত। তবুও পাহাড়ের বুকেই অনিরাপদ অনিশ্চিত জীবন নিয়েই টিকে থাকা ছুটে চলা……

লেখক : দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর ফিচার এডিটর ও ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটির স্কলার

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button