নীড় পাতা / ব্রেকিং / বিরুদ্ধ বাতাসের যাত্রী দুই ‘কুমার’
parbatyachattagram

রাঙামাটির বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলা

বিরুদ্ধ বাতাসের যাত্রী দুই ‘কুমার’

রাঙামাটি জেলার সামগ্রিক রাজনীতিতে পাহাড়ের প্রভাবশালী আঞ্চলিক সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রভাববলয় বেশ স্পষ্ট। দশম জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দলটির প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি জেলার বেশিরভাগ উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হিসেবে দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার মধ্যদিয়ে দলটি তার প্রভাববলয় স্পষ্ট করেছে বিভিন্নসময়। জেলার ১০ টি উপজেলার মধ্যে নানিয়ারচর আর কাউখালিতে খুব একটা নিয়ন্ত্রন নেই দলটির আর বাঙালি অধ্যুষিত লংগদু আর কাপ্তাই উপজেলায়ও ততটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই তারা। তবে বাকী ৬ উপজেলায় জনসংহতির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রন বেশ শক্তই । এর মধ্যে জুড়াছড়ি এবং বরকলকে বলা হয় দলটির সবচে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে। এই দুটি উপজেলার প্রায় সবগুলো ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানও দলটির সমর্থিত প্রার্থীরাই। এই দুই উপজেলায় তাদের প্রভাব এতোটাই শক্তিশালী যে এই খানে আওয়ামীলীগের প্রার্থী দিতেও হিমশিম খেতে হয়। প্রথম পর্যায়ে এবারও এই দুই উপজেলায় প্রার্থী ঘোষণা দেয়নি আওয়ামীলীগ। পরে নানান কৌশল ও মেরুকরণে ঠিকই প্রার্থী হয়েছেন দুই উপজেলার প্রভাবশালী দুইজন নেতা। জুরাছড়িতে রূপ কুমার চাকমা আর বরকলে সবীর কুমার চাকমার নৌকা প্রতীক নিয়ে ঠিকই নির্বাচনী যুদ্ধে নেমেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হতে।

বরকল : রাঙামাটির ভারতীয় সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা বরকল। মিজোরাম সীমান্তের এই উপজেলার সর্বশেষ প্রান্ত লুসাই পাহাড় ধরেই জন্ম বিখ্যাত নদী কর্ণফুলির। সীমান্ত বাণিজ্যকে বৈধতা দিতে এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এই উপজেলাতে যাত্রা শুরুর প্রতীক্ষায় আছে ঠেগা স্থল বন্দর। ভারতীয় সীমান্তবর্তী এই উপজেলাটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বরাবরই স্পর্শকাতর। জনসংহতি সমিতির শক্তিশালী এই ঘাঁটিতে এবার দলটির প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান বিধান চাকমা। আর তার বিপক্ষে প্রার্থী হয়েছেন তরুণ আওয়ামীলীগ নেতা সবীর কুমার চাকমা। শুধুমাত্র এই পদে নির্বাচন করতে দলের স্বার্থেই সর্বোচ্চ ত্যাগ করার বিরল নজির গড়েছেন এই নেতা। তিনি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ‘সদস্য’ পদ ছাড়ার মধ্য দিয়ে দলের প্রতি তার সর্বোচ্চ কমিটমেন্টই প্রমাণ করেছেন। এর আগে সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভূষণছড়া ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ করা সবীর কুমার চাকমা এই নির্বাচনেও নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য প্রমাণে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

সবীর কুমার চাকমা জানিয়েছেন, ‘দলের স্বার্থে দলের প্রয়োজনে আমি প্রার্থী হয়েছি। সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনআকাংখাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ছোঁয়ায় পার্বত্য এই উপজেলাকে বদলে দিতে চাই আমি। একটি চিহ্নিত মহলের সন্ত্রাস,চাপ,হুমকি ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অসুস্থ চর্চা যদি না থাকে,তবে আমার বিশ্বাস আমিই বিজয়ী হবো।’

সবীর কুমার চাকমা আরো বলেছেন, ‘ আমি তো প্রত্যন্ত এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা ও চালাতে পারিনি। পাহাড়ী এলাকাগুলোতে আমাকে ঠিকমতো প্রচারও চালাতে দেয়নি। ভোটারদের নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবুও আমি আত্মবিশ্বাসী, ভোট যদি সুষ্ঠু এবং সুন্দর হয় এবং ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে,তবে আমিই বিজয়ী হবো।’

জুরাছড়ি : রাঙামাটির ছোট্ট এই উপজেলাটিকে বলা হয় সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির অন্যতম শক্তিশালি সাংগঠনিক ভিত থাকা উপজেলা। এখানে জাতীয় নির্বাচনেও খুব একটা ভোট পায়না জাতীয় দলগুলো। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটিতে নৌকা প্রতীক বিজয়ী হলেও এই উপজেলায় বিজয়ী হতে পারেনি তারা। এই খানে নৌকার প্রার্থী দেয়াটাও বেশ দুরুহ কাজই বটে। তবে এইখানে সাহসের সাথে নৌকার মাঝি হয়েছেন রূপ কুমার চাকমা। জনসংহতি সমিতির সমর্থিত প্রার্থী সুরেশ কুমার চাকমার সাথে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া রূপ কুমার চাকমাও পাহাড়ের আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের শিকার।

২০০৬ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত কিনামোহন চাকমার পুত্র রূপকুমার চাকমা বলেছেন, আমি জনসংহতি সমিতির সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি আর মাস্তানির হাত থেকে জুরাছড়ি বাসীকে মুক্ত করার জন্যই আমি প্রার্থী হয়েছি। আমি বিজয়ী হলে জুরাছড়িতে হত্যা,অপহরণ,গুম বন্ধ হবে। আমি জুরাছড়িবাসির প্রতি অনুরোধ করছি,সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যালটে বিপ্লব ঘটানোর জন্য।’

রূপ কুমার চাকমা বলেন, ‘ জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে বছরের পর বছর জিম্মি হয়ে থাকা এই উপজেলার মানুষ এবার রুখে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে,সেই সুযোগটাকে তারা কাজে লাগালেই সন্ত্রাসমুক্ত হবে এই উপজেলা।’

নির্বাচনী প্রচারণায় নানাভাবে প্রতিকূলতার শিকার হওয়ার অভিযোগ করে রূপ কুমার চাকমা বলেছেন, আমি তো সব এলাকায় প্রচারণা চালাতেও পারিনি। দুর্গম এলাকাগুলো,যেখানে জনসংহতি সমিতির চারণভূমি সেখানে প্রচারণা চালানো কঠিন ছিলো। তবুও আমি চেষ্টা করছি সবখানে যেতে,মানুষের কাছাকাছি হতে। আমার বিশ্বাস,জনগণ জনরায়ে এবার সন্ত্রাসীদের প্রত্যাখ্যান করবে।’

সবীর কুমার চাকমা কিংবা রূপ কুমার চাকমা,দুজনের নামের সাথেই ‘কুমার’ শব্দটি আছে। দুজনই বিরুদ্ধ বাতাসে প্রবল চাপ, হুমকি, ভয় এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করে প্রার্থী হয়েছেন জীবনবাজি রেখেই। এই দুই প্রার্থী জয়ী হবেন নাকি পরাজিত হবেন,সেটা হয়তো সময়ই বলবে,তবে আপাতত ‘সাহস’ আর ‘ বিরুদ্ধ বাতাসে রুখে দাঁড়ানো’র লড়াইয়ে বিজয়ীই হয়েছেন এই দুই নেতা, এ কথা বলাই যায়। এ কারণে আওয়ামীলীগের সব শ্রেণী পেশার মানুষের শ্রদ্ধা,ভালোবাসা আর অকুন্ঠ সমর্থন ইতোমধ্যেই পেয়েছেন আওয়ামী রাজনীতির দুই উপজেলার আপাতত দুই ‘রাজকুমার’। জয়-পরাজয়ের লড়াইয়ের আগেই যেখানে বিজয়ী তারা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

এডিসি বাংলো এখন বখাটেদের আখড়া!

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি পর্যটন রোডে এডিসি হিল বাংলো এখন মাদকসেবী আর বখাটেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 × 1 =