পাহাড়ের অর্থনীতিলিড

বিপন্ন পাহাড়ের আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসা

করোনার নেতিবাচক প্রভাব,বেশুমার কর্মচারি ছাঁটাই

প্রান্ত রনি
মহামারী নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি ঘোষণায় বন্ধ রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউজ, কটেজ-রিসোর্ট। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মালিকরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেকেই বেঁচে নিয়েছেন ছাঁটাইয়ের পথ। এতে করে চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে কর্মচারিরা। যারা এখনো চাকরিতে আছেন ব্যবসা মন্দার কারণে তারাও কাটাচ্ছেন অলস সময়, পাচ্ছেন না নিয়মিত বেতন-ভাতা। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন হোটেল-মোটেল মালিকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯ মার্চ থেকে তিন পার্বত্য জেলার সব পর্যটন স্পট ও বিনোদনকেন্দ্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে তিন জেলার সব হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউজ, কটেজ-রিসোর্ট বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেয়া হয়। এতে করে বেকার হয়ে পড়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ছাঁটাই শুরু করেন মালিকপক্ষ। পরবর্তীতে দেশে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা আয়ত্ত্বে এলে সীমিত পরিসরে হোটেল-মোটেল কটেজ, রেস্ট হাউজ খুলে দেয়া। তবে পর্যটন ও বিনোদেন কেন্দ্রের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকায় বুকিং পায়নি হোটেল-মোটেলগুলো। কভিড পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিক থেকে এখনো পর্যন্ত হোটেল-মোটেল বন্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, তিন পার্বত্য জেলায় পর্যটন শিল্পে আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস বলা চলে আবাসিকখাতকে। এ তিন জেলায় প্রায় ৩ শতাধিক হোটেল-মোটেল, কটেজ-রিসোর্ট ও রেস্ট হাউজ রয়েছে। এর মধ্যে রাঙামাটি জেলার মেঘের উপত্যকা খ্যাত ‘সাজেক ভ্যালি’তে রয়েছে ১২০টির অধিক।

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়–য়া জানিয়েছেন, আমাদের পর্যটন মোটেলের ব্যবসাটা কেবল পর্যটন মৌসুমকেন্দ্রিক না। সারাবছর আমাদের ব্যবসা হতো, পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের চাপ থাকলেও অন্যসময়গুলোতে বিভিন্ন এনজিও সংস্থার প্রোগ্রামসহ নানা মাত্রিক প্রোগ্রামের আমাদের ব্যস্ততা কেটেছে। কিন্তু বিগত পুরো চারমাসে আমরা একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছি। বলা যায় একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের বেশিরভাগ কর্মচারীকে টানা ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এই সময়টাতে তাদের বেতন ভাতা দেয়া হয়না। মূলত পর্যটন করপোরেশন নিজস্ব নির্ভরতার প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব আয় দিয়েই এই প্রতিষ্ঠান স্টাফ, আনুষাঙ্গিকসহ খরচ বহন করে থাকে। কিন্তু এখন আমাদের খরচ হ্েচ্ছ ঠিকই; কিন্তু এক পয়সাও আয় হচ্ছে না।

রাঙামাটির আবাসিক হোটেল মতি মহলের স্বত্ত্বাধিকারী মো. শফিউল আজম জানান, পর্যটন খাত বন্ধের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসিকখাত। আমরা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত ভুর্তুকি দিয়ে চালাচ্ছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দেখাশোনার জন্য দু-এক কর্মচারী দিয়ে চালাতে হচ্ছে। একদিকে আমরা নিরূপায় হয়ে ছাঁটাইয়ের পথ বেঁচে নিয়েছি। আরেকদিকে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছেন কর্মচারীরা। অনেকেই পেশা বদলও করেছেন বাধ্য হয়ে। দারিদ্রের হার বেড়ে গেছে।

খাগড়াছড়ি জেলা পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক একেএম রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেও মোটেলের আবাসিকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ১৪-১৫ লাখ টাকার ব্যবসা হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় টেউ শুরু হওয়ার পর মার্চে সেটা নেমে গেছে ৬-৭ লাখ টাকা। গত বছর করোনা প্রাদুর্ভাবের পর থেকে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। পুরো খাগড়াছড়িতে ৫০-৬০ হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউজ রয়েছে; করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত। বেশিরভাগ হোটেল মালিকরা প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর তাগিদে কর্মচারীদের ছাঁটাই করেছেন। অনেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও রক্ষনাবেক্ষণের জন্য দু-এক কর্মচারী ছাড়া সবাইকে ছাঁটাই করেছেন। আমাদের মোটেলে যেখানে ১৮-১৯ জন কর্মচারী কাজ করতো, সেখানে এখন ৭-৮ দিয়ে সামলাতে হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো বেহাল দশা।

তিনি বলেন, ‘বিশেষত পর্যটন মৌসুম খাগড়াছড়িতে হোটেল-মোটেলের পাশাপাশি খাবার হোটেল, রেস্টুরেষ্ট, চাঁন্দের গাড়িসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব কিছু মিলিয়ে মাসিক গড়ে ৬০ কোটি টাকার অধিক ক্ষতি হচ্ছে। সাজেকের হিসেব যোগ হলে সেটাতে মাসিক ৫০০-৬০০ কোটি টাকার বেশি দাঁড়াবে। কারণ সাজেকের পর্যটনখাত থেকে দৈনিক রাজস্ব আয় হতো আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। এখন কভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট থেকে উত্তোরণের পথ খুবই দুর্লভ।’

রাঙামাটির সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিত্য ত্রিপুরা জানান, সাজেকে আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত ৮২টি কটেজ-রিসোর্ট রয়েছে। এছাড়া আরো ৪০টির মতো কটেজ-রিসোর্ট আছে যেগুলো এখনো সমিতির তালিকাভুক্ত হয়নি। করোনার কারণে গত বছরের ১৯ মার্চ থেকে সাজেকের কটেজ-রিসোর্ট ব্যবসা স্থবির। সব কটেজ এখন বন্ধ রয়েছে। লোকসান এড়াতে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কথা ভাবছেন।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রেস্ট হাউজ মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, আমাদের সমিতিভুক্ত ৪৫টি হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউজ ছাড়াও জেলায় মোট ৬০টির মতো আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। ছাঁটাইয়ের কারণে এ খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরা অনাহারে অর্ধহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন সেলিম বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত ৫৩টি ছাড়াই আরো বেশ কয়েকটি হোটেল-মোটেল, কটেজ রয়েছে রাঙামাটিতে। চলতি বছরের মার্চের শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত (আগস্ট) দীর্ঘ ৪ মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে; আমাদের কোনো ব্যবসা নেই। মালিক-কর্মচারী সকলের কপালেই দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে। বাধ্য হয়ে আমরা ৯০ শতাংশ কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছি। কারণ তাদের রেখে বেতন ভাতা দেয়া যাচ্ছে না। আবার প্রত্যেকেরই ঘর সংসার আছে। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরসহ অন্যান্য সেক্টরগুলোতে কর্মরত স্বল্প পরিমাণে আর্থিক প্রণোদনা পেলেও পর্যটন সেক্টর একেবারে নিভৃতে থেকে গেল।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button