লিড

বিদ্যুৎ নিয়ে কষ্টের শেষ নেই বাঘাইছড়ি-লংগদুবাসির

প্রান্ত রনি
দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুতের ভেল্কিবাজিতে অতিষ্ঠ রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলার গ্রাহকরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ জানালেও এর থেকে পরিত্রাণ মেলেনি। এই দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাধীন গ্রাহকদের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুব্যবস্থার দাবি রয়ে গেছে নিভৃতেই। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, প্রাকৃতিক সমস্যা, জনবল সংকট ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে এমনটি হচ্ছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে গত রোববার রাস্তায় নেমেছেন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার গ্রাহকরা। তারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দাবিতে মানববন্ধনের পাশাপাশি ইউএনওর মাধ্যমে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রনালয় বরাবরে স্মারকলিপি দেয়া দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনও সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহন করেছে। বোরবার সকালে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে ‘বাঘাইছড়ি উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণ’ এর ব্যানারে ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ ভুক্তভোগী গ্রাহকগণ। কর্মসূচি থেকে তারা অভিযোগ করেন, বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষকে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ‘লোড শেডিং’ খেলায় জনসাধারণের দুর্ভোগ বেড়েছে চরমে। বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষ মারিশ্যা বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একরোখা আচরণে বাঘাইছড়ির মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। তারা কর্মসূচি থেকে মারিশ্যা বিদ্যুৎ সরবরাহকেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলীর অপসারণ দাবি জানান।

এসময় মাহামুদ হাসান সোহাগ, আশিকুর রহমান ও মো. মাহাবুব বলেন, বিদ্যুতের ভেল্কিবাজিতে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। একদিকে তাপদাহে ভ্যাপসা গরম, অপরদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের সঙ্গে লো-ভোল্টেজে জনজীবন নাভিশ^াস হয়ে উঠেছে। সরকার সারাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই বললেও বাঘাইছড়ি উপজেলাতে এর বাস্তবচিত্রে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলেও লো-ভোল্টেজের কারণে ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার যাচ্ছে না। এভাবে দিনের পর দিন চলছে। উপকেন্দ্র হওয়ার-পর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের যে স্বপ্ন উপজেলাবাসী দেখেছিল তা ভেস্তে গেছে। আমরা এই ভেল্কিবাজি থেকে মুক্তি পেতে চাই।

বাঘাইছড়ি উপজেলার দূরছড়ি বাজার এলাকার বাসিন্দা বিদ্যাসাগর নাথ জানান, বিগত এক সপ্তাহ ধরে আমরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ। বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবনে আমাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। সাধারণত বাসাবাড়িতে ফ্রিজে রাখা খাদ্যপণ্যগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা নতুন করে কোন সমস্যা না। সবসময় দূরছড়ির মানুষকে এই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে বসবাস করতে হয়।

বিদ্যুৎ বিড়ম্ভনার প্রতিবাদে মানববন্ধন বাঘাইছড়িতে

রাঙামাটির লংগদু উপজেলা সদরের বাসিন্দা আবু দারদা খান জানান, লংগদু উপজেলার আট ইউনিয়নের মধ্যে চার ইউনিয়নের মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। এরমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়েছে। উপজেলাবাসীর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি নিভৃতে থেকেছে সবসময়। তিনি বলেন, লংগদু উপজেলা রাঙামাটির একটি উপজেলা হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া হয়ে থাকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সাব-স্টেশন থেকে। এ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিকার জানতে মানুষ বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তুললেই তারা নানা অজুহাতে উড়িয়ে দেন। এভাবে আর কতদিন এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে জানি না।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়ির জনসংখ্যা ৯৬ হাজার ৮৯৯ জন। আর লংগদু উপজেলার জনসংখ্যা ৮৪ হাজার ৪৭৭ জন। তবে হ্রদকেন্দ্রিকতা ও দুর্গমতার কারণে এই দুই উপজেলার হাটবাজার, উপজেলা সদর এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবারাহ থাকলেও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, বাঘাইছড়িতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকারে পৌঁছেছে। তীব্র তাবদাহের মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হয়। স্থানীয় জনগণ আগেও বেশ কয়েকবার আমার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। আমিও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি অবহিত করেছি, কিন্তু কোন সুরাহা হয়নি। রোববার স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ এ বিষয়ে একটি মানববন্ধন করেন এবং আমার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। আমি এটি বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করছি।

এদিকে মারিশ্যা বিদ্যুৎ সরবরাহকেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী সুগত চাকমা বলেন, ‘কিছু গ্রাহক যেভাবে ঢালাও অভিযোগ করছেন, বিষয়টি সেভাবে নয়। মূলত এখন বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতসহ প্রাকৃতিক কারণে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। অনেক গ্রাহক আছেন তারা প্রচ- বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের সময়েও বিদ্যুৎ সুবিধা চান। কিন্তু মারিশ্যা সদরে সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া সম্ভব হয় না। দীঘিনালা সাবস্টেশন থেকে সাজেক রুট ও লংগদু উপজেলার সরবরাহ ব্যবস্থা দেখা হয়। আমরা দীঘিনালা বিদ্যুৎ স্টেশন থেকে মারিশ্যা এলাকায় সরবরাহ ও দেখভাল করে থাকি। এই এলাকায় গ্রাহক সংখ্যা ৬ হাজারের কাছাকাছি।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার বলেন, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে রাঙামাটির লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া হয়। এরমধ্যে লংগদু উপজেলায় ৩০০০-৩২০০ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। সাজেকে আছেন আরও ৬০০ গ্রাহক। কিন্তু আবহাওয়াজনিত কারণে আমরা চাইলেও সবসময় এই এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন সচল রাখতে পারি না। দীঘিনালা থেকে লংগদুর দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার এবং সাজেকের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। এত দীর্ঘ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা আমাদের জন্য অনেক দুরহ ব্যাপার। এছাড়া আমাদের যে পরিমাণ জনবল রয়েছে তা দিয়ে এই সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন কাজ।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button