ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

বিদায় নিলেন রাঙামাটিবাসির বিপদের বন্ধু এক জেলা প্রশাসক

জেলাপ্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র চারদিনের মাথায় ঘটেছিল ভবনধ্বস। প্রথমবারের মত রাঙামাটিতে ঘটে যাওয়া সেই ভবনধসে একই পরিবারের দুই শিশু, বাবা-মেয়েসহ নিহত হয়েছিলেন পাঁচজন। স্বরণকালের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার উদ্ধার কাজ দিয়েই শুরু হয়েছিল দুর্যোগ মোকাবেলা। এরপর যেনো একের পর এক দুর্যোগ রাঙামাটিতে লেগেই ছিল। আর প্রতিটি দুর্যোগ-দুর্ভোগ মোকাবেলায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান।
কারো কোনো অভিযোগ-অনুযোগ তিনি কখনো আটকে রাখতেন না। যখনই সমস্যা তখনই দ্রুত ও উপযোগি সমাধান দেয়ার চেষ্টা করতেন। রাতে কিংবা দিনে যেকোনো সময় সমস্যায় যেখানে সেখানেই ছুটে যেতেন তিনি। শীতের রাতে তিনটায় আগুন লাগে রিজার্ভ বাজারে। বাংলোয় বসে খবর নিয়েই দায় সারেননি তিনি। ছুটে গিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে। আর ভোরেই ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁিড়য়েছিলেন তিনি। এভাবে ছোট-বড় সব দুর্ঘটনায় দুর্গতদের পাশে তিনি ছিলেন সবসময়।
পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নতুন কিছু নয়। মোটর বাইক চালক নয়নকে হত্যার প্রতিবাদ মিছিল থেকে লংগদুর পাহাড়ি গ্রামে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল প্রায় দুই শতাধিক বসত ঘর। প্রতি হিংসার সেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারতো তিন পার্বত্য জেলায়। এমনকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ নিতো। যদি না কঠোর হস্তে সেই সময়ের কঠিন সময় মোকাবেলা না করতেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ ও তাদের পূনর্বাসনে তাঁর উদ্যোগ ছিল প্রশংসার দাবিদার।
লংগদুর সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘুর্নিঝড় মোরা’র আঘাত হানে রাঙামাটিতে। দুজনের প্রানহানি সহ বিপর্যয় নেমে আসে রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতেও। কিন্তু এসব মোকাবেলায়ও সময় ক্ষেপন হতে দেননি তিনি। দ্রুত সমস্যা সমাধান করে জনগনের স্বাভাবিক জীবন যাপন যাতে নির্বিঘœ হয় সেটিই করেছেন জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। মোরা’র আঘাতের চিহ্ন কাটতে না কাটতেই রাঙামাটিতে স্বরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় বিস্মিত পুরো দেশের মানুষ। একের পর এক মাটির নিচ থেকে নিথর দেহ বের করতে থাকে উদ্ধার কর্মীরা। ঘরে ঘরে কান্নার রোল। ভয়াবহ দুর্যোগে রাঙামাটির সাথে পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাই বন্ধ হয়ে যায়। পুরো জেলা হয়ে পড়ে বিদ্যুৎবিহীন। চারদিনের মাথায় বিদ্যুৎ সচল করার ক্ষেত্রেও পিডিবিকে দিয়েছেন পর্যাপ্ত সহায়তা। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। কঠিন সেই সময়ে সব পক্ষকে নিয়ে উদ্ধার কাজ, আহতদের চিকিৎসা প্রদান, আশ্রয়হীনদের আশ্রয়দান ও খাবার ব্যবস্থা, নিহতদের দাফন ও সৎকার এবং পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ যাবতীয় কাজ সামাল দিয়েছেন দক্ষতার সাথে। দুর্যোগ পরবর্তী নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন এতিম অনেক শিশুর। নিরবে কাজ করেছেন নিবেদিত মানবসেবির মত। মানবিক সেই বিপর্যয়ের সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পায়তারা করেছিল কিছু দুস্কৃতিকারী। কিন্তু মোটেই ছাড় দেননি তাদের। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়েও ব্যস্ত রেখেছিলেন তিনি। ফলে খুব সুবিধে করতে দেননি মুনাফালোভিদের। দুর্যোগের সময় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকেও এনেছেন সহায়তা। আর যাওয়ার সময় বিশ লক্ষাধিক টাকা ফান্ডেও রেখে যাচ্ছেন তিনি। জেলার অভিভাবক হিসেবে কোনো দুর্যোগে তিনি এতটুকু বিচলিত হননি জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। জেলার একজন অভিভাবক হিসেবে প্রতিটি দুর্যোগ মোকাবেলায় তাঁর উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়।
লংগদুর অগ্নিকান্ড, বাঘাইছড়ির দুরছড়ির অগ্নিকান্ডসহ অসংখ্য দুর্ঘটনায় কবলিত মানুষের পাশে পরম মামতায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো কাউকে বিরাগভাজন করেননি।
শুধু দুর্যোগ মোকাবেলায়ই নয়। রাঙামাটির ইতিহাসে স্বরণ কালের সেরা অনুষ্ঠান আয়োজনেই তাঁর ভুমিকা ছিল অগ্রগন্য। রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ন জয়ন্তী উদযাপন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পুরো জেলাবাসীকে। পর্দার আড়াল থেকে অসংখ্য মানুষকে সহযোগিতা করেছেন তিনি। যা মিডিয়ায় ধরা দিয়ে প্রচার নেননি তিনি।
নিজের শেষ কর্মদিবসের আগে সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের সামনে নিজের অনুভুতি বলতে গিয়ে বলেন, রাঙামাটিকে এত বেশি আপন মনে হয়েছে। এখানে দায়িত্ব নেয়ার পর মাত্র ১২টি দিন ঢাকায় রাত কাটিয়েছিলেন। রাঙামাটির প্রতি অগাধ প্রেম অগাধ ভালবাসার কথাটাই উচ্চারণ করেছেন বারবার।
২০১৬সালে রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন-আমার পূর্বসুরিরা অনেক ভাল কাজ করেছেন। তাই রাঙামাটিবাসীর মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন। সবাই প্রথম হতে চাই, আমিও দ্বিতীয় হতে চাইনা।
মানুষ বিপদের বন্ধুকেই মনে রাখে সবসময়। আর রাঙামাটিতে গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া স্বরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান যে ধৈর্য্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সাথে দুর্গত মানুষের পাশে ছিলেন; সেটা আজীবনই কৃতজ্ঞতার সাথে স্বরণ রাখবে রাঙামাটির মানুষ। বিপদের বন্ধুইতো আসল বন্ধু।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

ি কমেন্ট

  1. তিনি কি সামসুল আরেফিনের ধারে কাছে যেতে পারবেন। সামসুল আরেফিনের বিদায়ে পাহাড়ি বাঙালি নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর মানুষ তাকে বিদায় জানিয়েছে। এরেতো কয়জনে বিদায় দিয়েছে??? কারণ এই ডিসির আচরন রুঢ়, এবং ভয়ানক সাম্প্রদায়িক। অপর দিকে সামসুল আরেফিন যেমনি মিস্ট ভাষি তেমনি চরম সাম্প্রদায়িক হিসাবে নিজেকে দাড় করান নি। তাকে পুরস্কার হিসাবে চট্টগ্রামের ডি সি বানানো হয়েছিল পরে। আর মানজারুল মান্নান? এর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ভাল নয়।

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button
%d bloggers like this: