খোলা জানালারাঙামাটিলিড

বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী: বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ

ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা
১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ পল্লি বাংলার একটি সবুজ ছায়া সুনিবিড় গ্রাম টুঙ্গিপাড়ার বনেদি শেখ পরিবারে জন্ম নেয়া ছোট খোকা শৈশব কৈশোর পেরিযে হয়ে ওঠেন ছাত্রবন্ধু ও শুভানুধ্যয়ীদের মুজিব ভাই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে পূর্ব বাংলার মানুষের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণ মানুষের নেতা। বাংলার মানুষের অধিকারের জন্য তাঁর ত্যাগ, সংগ্রাম ও অঙ্গীকারের জন্য পূর্ব বাংলার মানুষ তাঁকে ভালবেসে ও বিশ্বাস করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। পূর্ব পাকিস্তান নাম বঙ্গবন্ধুর মোটেও পছন্দ নয় বিধায় ১৯৬৯ সালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম পাল্টে বাংলাদেশ নামকরণ করেন; সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার পক্ষে মেন্ডেট লাভ করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তা সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা করলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন বাঙালির মুক্তির মন্ত্র-‘ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। Ñ ‘জয় বাংলা’। যতই দিন যায় তিনি বুঝতে পারেন ইয়াহিয়া সরকার বাঙালিদের নিকট রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালি নিধনের গোপন নীল নকশা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ নিজ হাতে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন ঢাকা ক্যান্টমেন্ট ছাড়া সারা দেশে বাংলাদেশের পতাকাই উড়েছিল অর্থাৎ কার্যত বাংলা স্বাধীন হয়েছিল। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের নিকট যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আত্মগোপনে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর নির্দেশনা দেন। অবশেষে এলো সেই আনন্দ ও বেদনাবিধুর ২৬ মার্চ। ঐদিন প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে পাকহানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচানোর জন্য নিজে কারাবরণ করেন। সেদিন বাঙালি ও বিশ্ববাসী দেখেছিল তাঁর অকুতোভয় সাহস, দেশের মানুষের প্রতি দরদ ও স্বাধীনতার জন্য দৃপ্ত অঙ্গীকার। তাঁর দেখানো পথেই বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। বিজয়ের আগমূহুর্তে পাকিস্তানি শাসকচক্র বঙ্গবন্ধুকে প্রহসনের বিচার করে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানোর পাঁয়তারা করে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষা ও মুক্তির দাবিতে বিশ্বসফর করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করেন। এতে পাকিস্তানি শাসনচক্র কোনো কিছুর বিনিময়ে মুজিবকে আটকে রাখতে পারেনি। ভুট্টো সরকার তাঁকে নির্শত মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এখানেই মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের এবং ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় হয়।
চিরায়ত বাংলার ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে একটি স্বাধীন বাংলার চিন্তা বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ আমলেই করেছেন । তিনি তরুণ বয়সে ১৯৪০ সালেই লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে স্বাধীন পূর্ব বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ চক্র ষড়যন্ত্র করে শেরে বাংলা ফজলুল হকের উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৯৪৬ সালে পূর্ব-বাংলার হবু স্বাধীনতাকে হরণ করে দুটির বদলে এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি কার্যকর করে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ১৯৪৭ সালে স্বাধীন যুক্তবাংলা করার পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও জনগণের মানস ততোদিনে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। ফলে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎবসুর যুগল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু বাংলাকে নিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন দেশ গড়ার চেতনার মৃত্যু হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাঙালির পৃথক রাষ্ট্রসাধনা সার্থক হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ছয়দফা থেকে গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় এভাবে ধাপে ধাপে তিনি এনে দেন বাঙালির জন্য পৃথক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন একদা বাংলার পূর্বপ্রান্ত থেকে আবির্ভূত হবেন বাঙালির মুক্তিদাতা মহানায়কের। বঙ্গবন্ধু হলেন পূর্ব বাংলার সেই কাক্সিক্ষত মহামানব ও মহানায়ক।
বিজয়ের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার নিয়ে বাংলাদেশকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে যান। রাষ্ট্রটিকে এগিয়ে নেবার জন্য দিয়ে যান একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রদর্শন। এর লক্ষ্য বাঙালি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মবিকাশ, সর্বধর্ম ও সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও সমমর্যাদাভিত্তিতে সোনার বাংলা বিনির্মাণ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রনায়ক। যুদ্ধ বিধ্বস্ত নিথর বাংলাদেশে প্রাণ সঞ্চার করতে বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, ক্ষুধা, দারিদ্রক্লীষ্ট মানুষের জন্যে অন্ন বস্ত্রের সংস্থান, গৃহহীনদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ, জ্বালানির জন্য গ্যাসক্ষেত্র ক্রয় ও জাতীয়করণ, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার ত্রিদেশীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির মীমাংসা, বাংলাদেশের দক্ষিণে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, এবং বিশ্ব স¤প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য যুগোপযোগী নীতি, কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। এর মধ্যে ভারত থেকে এককোটি শরণার্থীকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা, দেশের বিপর্যস্ত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ সচিবালয়সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস, নতুন প্রতিষ্ঠান সৃজন, সংবিধান প্রণয়ন, প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন, চীন ও সৌদি আরব ব্যতীত বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ও সংস্থার স্বীকৃতি অর্জন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রগঠন এবং সে রাষ্ট্রটি যাতে সঠিক পথে বিকশিত হতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল দপ্তর, সংস্থা, কোর্ট, কমিশন, কর্পোরেশন, বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তিনি স্থাপন করেন। জাতীয় পতাকা, রাষ্ট্রভাষা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় ফুল, ফল, পশু, পাখি, জাতীয় কবি, জাতীয় স্মৃতিসোধ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শহিদ মিনারসহ সকল জাতীয় প্রতীকগুলো চিহ্নিত ও ঠিক করে দেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি সংস্কৃতি ও সভ্যতা যাতে বিশ্বের বুকে গৌরবের সাথে টিকে থাকতে পারে সেজন্য তিনি সকল নামকরণ বাংলাতেই করতেন। যেমন রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোর নাম পদ্মা, মেঘনা, যমুনা প্রভৃতি। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকসমূহের নাম সোনালি, রূপালি, জনতা, অগ্রণী ব্যাংক কত মায়াময় মধুর নাম। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি। পার্লামেন্টের নাম জাতীয় সংসদ। তিন বাহিনীর ইংরেজি নামের পরিবর্তে বাংলা নাম যথা আর্মির বদলে সেনাবাহিনী, এয়ারফোর্সের বদলে বিমানবাহিনী, নেভির পরিবর্তে নৌবাহিনী প্রভৃতি নামের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব বিরাজমান। উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের উড়োজাহাজ গুলোর নামকরণ করেছেন বাংলায়। আকাশ-তরী, শ্বেতবলাকা, ময়ুরপঙ্কী, মেঘদূত, রাঙাপ্রভাত, অরুণ আলো, আকাশপ্রদীপ, রাজহংস প্রভৃতি। এ নামগুলো বাংলাকে যারা ভালবাসে তাদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়, মোহিত করে।
আজ বিশ্বসভায়ও বঙ্গবন্ধুর নাম সমাদৃত। ১৯৭৪-এ তিনি দরাজ গলায় বিশ্বসভায় বাংলা ভাষা শুনিয়েছেন। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এখন ইউনেস্কোর বিশ্বস্বীকৃত দলিল। তাঁর নামে ইউনেস্কো ক্রিয়েটিভ ইকনোমি বিষয়ে প্রবর্তন করেছে ‘বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক পুরস্কার,’ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছে বঙ্গবন্ধু চেয়ার, জাতিসংঘের আলোচনায় ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়েছে মুজিব বর্ষ। মহাকাশেও এখন উড্ডীন আছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিশ্বের প্রায় ২৪টি ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা টেইলর এন্ড ফ্রান্সিস গ্রুপ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রামের উপর সংগৃহীত ও সম্পাদিত পাকিস্তানের গোয়েন্দাসংস্থার গোপন দলিল ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২১ সালে মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলার মানুষের ধানক্ষেতে ফুটিয়ে তোলা ‘শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে দৃষ্টিনন্দন প্রতিকৃতি গিনেস বুকে স্থান করে নিয়েছে। ভেতো-বাঙালির সোনার বাংলার সবুজ ধানক্ষেতে বঙ্গবন্ধুর এই প্রতিকৃতি যেন তাঁরই লালিত স্বপ্নের নন্দিত রূপায়ন।
এসব বিচারে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে পারি ‘বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ’। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অসম্পূর্ণ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : সহযোগি অধ্যাপক,ইতিহাস বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ‘কার্পাসমহল থেকে শান্তিচুক্তি’ বইয়ের লেখক

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button