করোনাভাইরাস আপডেটব্রেকিংরাঙামাটিলিড

বিএফডিসি’র মাছ আহরণ বন্ধের দাবি রাঙামাটিবাসির

করোনা ঝুঁকির মধ্যেও রাঙামাটি শহর ও কাপ্তাই বিএফডিসি মৎস অবতরণ কেন্দ্রে মাছ আহরণ ও পরিবহন অব্যাহত রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এখনই এটি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন রাঙামাটির বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ,জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদরা। বাংলাদেশ মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কেন্দ্রের ‘খামখেয়ালী’র কারণে করোনা ঝুঁকিতে পড়েছে রাঙামাটিবাসি, এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর বলেন, যখন দেশে সবকিছুই মানুষের জীবন রক্ষার জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে,তখন বিএফডিসি এটা কেনো খোলা রাখছে আমার বোধগম্য নয়। যদি খারাপ কিছু হয়, এর দায় কে নেবে ? এখন তো হ্রদে মাছও নাই। অযথা মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার মানে কি !’

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মোঃ শাহ আলম বলেছেন, আগে মানুষের জীবন,তারপর ব্যবসা। মানুষ বাঁচলে ব্যবসা অনেক করা যাবে। এইভাবে মানুষের জীবন নিয়ে বাজি খেলার মানে হয়না। বিএফডিসির মাছ পরিবহনের ট্রাকে করে মানুষও পরিবহন করা হচ্ছে। বিষয়টি দু:খজনক। আমি এই মুহুর্তেই কাপ্তাই লেকে মাছ আহরণ বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।’

রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দু:খজনক। সরকার যখন ‘সামাজিক দুরত্ব’ বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে,তখন ফিসারীতে এত মানুষের উপস্তিতি অবশ্যই টেনশনের। আমি মনে করি এখনই ফিসারী বন্ধ করা উচিত। প্রয়োজনে ব্যবসায়িরা যদি ক্ষতিগ্রস্ত মনে করেন তবে তাদের বিষয়টি ভবিষ্যতে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

(ফাইলছবি)……. বিএফডিসি চত্বরে ট্রাকে তোলা হচ্ছে মাছ পরিবহনের জন্য

রাঙামাটি পৌর নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব এম জিসান বখতেয়ার জানিয়েছেন, ‘মাছ পরিবহনের গাড়িসহ অন্যান্য সেবার গাড়িগুলো রাঙামাটি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা করে। আবার গাড়িরচালক ও সহকারীদের সঙ্গে এ খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মেলামেশায় এক ধরণের জনসমাগম হয়ে থাকে। এতে করে রাঙামাটিও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই আমি অনুরোধ করব সেহেতু ক’দিন পড়ে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ হবে, সেহেতু আপদকালীন সময় বিবেচনা করে রাঙামাটি থেকে বাহিরে মাছ পাঠানো এখনই বন্ধ করা হোক।’

রাঙামাটি পৌরসভার যে ওয়ার্ডে বিএফডিসি’র অবতরণ কেন্দ্র অবস্থিত,সেই ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘প্রতিদিনই রাঙামাটি থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামী মাছ পরিবহনসহ কাঁচামালের গাড়িগুলো যাতায়াত করছে। বেশির ভাগই গাড়িই ঢাকা কেন্দ্রীক। অথচ করোনাভাইরাসের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রয়েছে ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ। পরিবহন চালক-সহকারীরা এসব এলাকাতেই আসা-যাওয়া করছে। তাদের অবশ্যই সতর্কতায় রাখতে হবে। এছাড়া এসব গাড়িতে করে প্রতিদিন ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকা থেকে বিভিন্ন মানুষ রাঙামাটিতে প্রবেশ করছে। এতে করে ঝুঁকিতে পড়ছে প্রিয় রাঙামাটি। আমি এই বিষয়টি বিশেষভাবে দেখার জন্য জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি।’

রাঙামাটি পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান বাবু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়া ভূমিকা পালন করছেন মাছ আহরণ বন্ধের দাবিতে। নিজেরে টাইমলাইনে তিনি লিখেছেন-‘ কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হোক,জরুরী জরুরী জরুরী…নয়তো রাঙামাটির বাইরে মাছ যাওয়া বন্ধ করা হোক।’

রাঙামাটি মৎস ব্যবসায়ি সমিতির সাধারন সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিসারি খোলা রাখার ঘটনায় মানুষের ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া আমরাও দেখছি। শনিবার বিএফডিসির ব্যবস্থাপক আমাদের ডেকেছিলেন। আমরা তাকে স্পষ্টভাবেই বলেছি, এই কঠিন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আমরা তাকে পরামর্শ দিয়েছি,যেহেতু ১ মে থেকে স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ থাকে,সেই বন্ধটি ১৫ দিন এগিয়ে নিয়ে এসে এই ১৫ এপ্রিল থেকেই বন্ধ করে দেয়ার জন্য এবং খোলার সময় ১৫ দিন আগে খোলার জন্য। কিন্তু তিনি রাজী হচ্ছেন না। আমরা বিনীতভাবে রাঙামাটির প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি,রাঙামাটিবাসির স্বার্থেই যেনো এখনই মাছ আহরণ বন্ধ করে দেয়া হয়।’

(ফাইল ছবি) প্রতিদিন কয়েকশত বোট আসে হ্রদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ নিয়ে এই ঘাটে

কাপ্তাই হ্রদ মৎস ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি মো: কবির বলেন-‘এইভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার তো কোন মানেই হয়না। আমরাও চাই বিএফডিসি মৎস আহরণ এখনই বন্ধ করুক। কিন্তু ওনারা নিজেদের লাভের বিষয়টি চিন্তা করে বন্ধ করতে চাইছেন না। অযথা আমরা রাঙামাটিবাসির গালাগালি ও অপবাদ শুনতেছি। আমরা টাকা পয়সা দিয়ে কি করব,জীবনই যদি না বাঁচে। আমরাও চাইনা আমাদের কারণে কারো মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হোক।’

রাঙামাটির বিশিষ্ট মৎস ব্যবসায়ি মোঃ মাহাফুজ বলেন, এই সময়ে ফিসারি খোলা রাখার কোন মানেই হয়না। জীবনের চেয়ে তো ব্যবসা বড় হতে পারেনা। কিন্তু বন্ধের সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারিনা,বিএফডিসিকেই নিতে হবে। বর্তমানে এভাবে চললে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। হ্রদে মাছ নেই,আবার যা মাছ পাচ্ছি,তাও বিক্রি করতে পারছিনা। এতে আমাদেরও ক্ষতি হচ্ছে আবার জেলার মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ায় সবাই আমাদের গালাগাল করছে।’

শুধু রাজনীতিবিদ,নাগরিক অধিকারকর্মী,ব্যবসায়ি কিংবা জনপ্রতিনিধিই নয়,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ,বিএফডিসি’র মাছ আহরণ বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন।

রাঙামাটি শহরের কাঠালতলী এলাকায় অবস্থিত বিএফডিসি কার্যালয়ের সম্মুখভাগ

তবে ‘ আগামী ১ মে নির্ধারিত সময়ের আছে মাছ আহরণ বন্ধ হওয়ার কোন ভাবনা আপাতত নেই’ জানিয়ে বিএফডিসি রাঙামাটির ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যে ট্রাক চালকরা প্রতিদিন মাছ নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন তারা রাঙামাটিতে ফিরে আসার পর তাদের শরীরে এবং গাড়ীতে প্রয়োজনীয় স্প্রে করা এবং তাদের পৃথকভাবে থাকার জন্য আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।’ হ্রদের বিভিন্ন স্থান থেকে আস্থা শতাধিক জেলে বোটের লোকদের ও বিএফডিসি চত্বরে সামাজিক দূরত্ব কিভাবে নিশ্চিত করবেন,এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-‘ সবকিছু পুরোপুরি সম্ভব না,সবখানে কি সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে ? এটা সম্ভব না।’ মাছ আহরণ বন্ধ করার বিষয়ে তিনি বলেন,‘ বিষয়টি আমাদের হাতে নেই, এটা উপর থেকে আসতে হবে।’ মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণের কারণে ‘ করোনার কোন প্রভাব’ পড়বেনা বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ১৯৬১ সালে প্রমত্তা কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার। এর ফলে নদীর উজানে তৈরি হয় ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল হ্রদ,যা ‘কাপ্তাই হ্রদ’ নামেই পরিচিত। ১৯৬৪ সাল থেকে এই হ্রদের মৎস আহরণ,বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এর দায়িত্ব পালন করে আসছে বাংলাদেশ মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)। প্রতিবছর মে মাসের ১ তারিখ থেকে ৩ মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয় হ্রদে সকল প্রকার মাছ আহরণ। এই সময়ে হ্রদে ছাড়া হয় কার্প জাতীয় মাছের পোনা। মূলত এই মাছের পোনার বংশবৃদ্ধির জন্যই বন্ধ রাখা হয় মাছ আহরন ও বাজারজাতকরণ।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button