রাঙামাটিলিড

বাঘাইছড়ি : ‘দ্য ব্যাটেলফিল্ড অব সিএইচটি’

সশস্ত্র সংঘাতে বিপন্ন সম্ভাবনা

সুহৃদ সুপান্থ
প্রথম কে কবে কি কারণে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলো পাহাড়ে,সেই ইতিহাসের টিকিটিও মিলল না অনলাইনে হণ্য হয়ে খুঁজেও,তথ্য উপাত্তের ভান্ডারেও নেই পর্যাপ্ত রসদ। কিন্তু ইতিহাস বলছে,পাহাড়ের চার আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র অস্ত্রবাজদের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র আপাতত আয়তনে দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ি’ই। এটা বোঝার জন্য খুব বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ারও দরকার নাই, পাহাড়ে প্রায়শই অনুষ্ঠিত অস্ত্রের ঝনঝনানির দিকে নজর দিলেই মিলবে এর সত্যতা। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান মেলা কঠিন,তবে একথা সবাই স্বীকার করবেন একবাক্যেই, পাহাড়ে সবচে বেশি প্রাণ ঝরেছে এই উপজেলাতেই। এই উপজেলায় শুধু জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র ২৮ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন গত ১০ বছরে !

অরণ্যসুন্দরী বাঘাইছড়ি
একসময় যার অধিকাংশ এলাকাই কাচালং ও মাচালং নামে পরিচিত ছিলো সেই বাঘাইছড়ি উপজেলা মূলত ছিলো সংরক্ষিত বন। গভীর অরণ্যে ঢাকা ছিলো বলে এখানে বাঘের উপদ্রব বেশি ছিল এবং উপজেলায় অনেকগুলোপাহাড়ী ছড়া থাকায় এর নামকরণ করা হয় ‘বাঘাইছড়ি’।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ এর কাঁধের কাজ শেষ হওয়ার পর রাঙ্গামাটি শহরের আশে-পাশের নীচু অংশের এবং রাঙামাটি, বরকল, লংগদু, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, নানিয়ারচর এবং কাপ্তাই এ ৭টি এলাকায় অধিবাসীবৃন্দকে পাকিস্তান সরকার কাচালং নদীর দুই পাশে কাচালং এলাকায় পুনর্বাসিত করে। যার কারণে ১৯৬৩ সালে প্রায় দশ হাজার চাকমা অধিবাসী ভারতের বিভিন্ন অংশে চলে যায়। বাঘাইছড়ি পূর্বে রামগড় মহকুমার দীঘিনালা থানার অধীনে ছিল। অধিবাসীদের পায়ে হেঁটে দীঘিনালা আসা-যাওয়া অনেক কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ হওয়াতে ১৯৬৮ সালের ৮ই আগাস্ট রাঙামাটি সদর মহকুমার আওতায় বাঘাইছড়ি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৬৩ সালে ২৪শে মার্চ তারিখে থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।

৩০ জেলার চেয়েও বড় যে উপজেলা
আয়তনে দেশের সবচে বড় জেলা রাঙামাটি আর দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ি। আবার ভৌগলিকভাবেই এই উপজেলার গুরুত্ব পাহাড়ের অন্য যেকোন উপজেলার চেয়ে বেশি। এই উপজেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য,পূর্বে মিজোরাম। দক্ষিনে লংগদু উপজেলা আর পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা। নয়নাভিরাম সাজেক উপত্যকা কিংবা পাবলাখালি অভয়ারণ্য এই উপজেলাতেই অবস্থিত। ১৯৩১.৮২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলার জনসংখ্যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ৯৬ হাজার ৮৯৯ জন। অথচ জনসংখ্যার ঘনত্ব মাত্র ৭৭ জন। সারোয়াতলী, খেদারমারা, বাঘাইছড়ি, মারিশ্যা, রূপকারী, বঙ্গলতলী, সাজেক আর আমতলী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় থানা দুটি সাজেক ও বাঘাইছড়ি। কাচালং নদীবর্তী এই উপজেলার বড় অংশটিই বৃক্ষ আচ্ছাদিত। ৪ লক্ষ ৪ হাজার ৯২৮ একর বনভূমির বিপরীতে এখানে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৩০ হাজার ৬৭৭ একর। আয়তনে দেশের প্রায় ৩০ টি জেলার চেয়েও বড় এই উপজেলা।

এই উপজেলায় নিয়ন্ত্রন কেনো জরুরী ?
বাঘাইছড়ি উপজেলার সাথেই ভারতের দুই রাজ্য ত্রিপুরা এবং মিজোরাম এর সীমান্ত থাকায় এবং সেই সীমান্তের বড় একটি অংশ দুর্গমতার কারণে অরক্ষিত। ফলে এই অঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতায় নিয়োজিত আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলা। বিপুল বনবিস্তৃত এই উপজেলায় সশস্ত্র গ্রুপগুলোর গোপনে লুকানোর জায়গাও প্রচুর। আবার আইনশৃংখলাবাহিনীর অভিযান শুরু হলেও পালানোর সুযোগও অবারিত। ফলে চারটি আঞ্চলিক দলের কাছেই সমান গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলা। ধারণা করা হয়, পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র যাতায়াতের নিরাপদ করিডোরগুলোর একটি সম্ভবত এই উপজেলাতেই ! মিজোরাম ও ত্রিপুরাতে একাধিক পার্বত্য চট্টগ্রামমুখি অস্ত্রের চালান আটক হওয়ার ঘটনা তারই সত্যতার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে।

উপজেলায় কার নিয়ন্ত্রন এখন কোথায় ?
পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে যে বিরোধ ও লড়াই,তার যতটা আদর্শের,তারচে বেশি আধিপত্য বিস্তারের। তবে বন পাহাড় বিস্তৃত দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ির পূর্ণ নিয়ন্ত্রন এদের কারো হাতেই নেই। এই উপজেলার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সারোয়াতলি,বাঘাইছড়ির পূর্ণ নিয়ন্ত্রন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির হাতে,সাজেক এবং বঙ্গলতলীর প্রায় পুরোটাই ইউপিডিএফ এবং জনসংহতির কাছে,সামান্য কিছু অংশে নিয়ন্ত্রন আছে জনসংহতি(এমএনলারমা)’রও এবং বাঘাইছড়ি পৌরসভা,মারিশ্যা,খেদারমারা’র পূর্ণ নিয়ন্ত্রন জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) ও তাদের বন্ধুপ্রতীম ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক)’র হাতে। আর বাঙালী অধ্যুষিত আমতলী ইউনিয়নে আঞ্চলিক দলগুলোর কোন নিয়ন্ত্রন না থাকলেও কমবেশি যাতায়াত আছে।
তবে এইসব নিয়ন্ত্রনও খুব একটা চিরস্থায়ী নয়,নানান প্রেক্ষিত ও সুযোগের সদ্ব্যবহারে নিয়ন্ত্রন যেনো আঁটোসাঁটো হয়,তেমনি ঢিলেঢালাও হয়ে যায় কখনো সখনো।

কেনো ব্যাটলফিল্ড বাঘাইছড়ি ?
বাঘাইছড়িই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র উপজেলা, যেখানে আঞ্চলিক চারটি দলেরই সশস্ত্র শাখার অবাধ বিচরণ ও নিয়ন্ত্রন আছে। আছে দাপুটে অবস্থানও। বিস্তির্ণ বনপাহাড় ঘেরা এই জনপদের দুর্গমতাই সবচে প্রিয় এই অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর। সশস্ত্র তৎপরতার কারণে আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী কখনো অভিযান পরিচালনা করলে দ্রুত গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন কিংবা সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সুযোগের চূড়ান্ত সদ্ব্যবহারের জন্যই মূলত: বাঘাইছড়ি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে আসার সময় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা ৭ নির্বাচনী কর্মীকে হত্যার পরও দ্রুতই দুর্গম বনে চলে যায় হামলাকারিরা। ফলে আইনশৃংখলাবাহিনীর ব্যাপক অভিযানেও তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

কার কতজন মারা গেলো বাঘাইছড়িতে
পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সংঘাতে গত ২৪ বছরে ঠিক কতজন মারা গেছেন এই সংক্রান্ত সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। কোন সংগঠনই সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য জানাতে পারেনা। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবেই জানানো হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল অবধি তাদের ৮৩ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে,যার মধ্যে ৫৮ জনকে হত্যার জন্য তারা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে এবং ২৫ জনকে হত্যার জন্য প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)কে দায়ি করেছেন। সংগঠনটি বলছে,২০১০ সালের পর তাদের ২৮ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে শুধুমাত্র এই বাঘাইছড়িতেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রাঙামাটির নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও মহালছড়িতে শক্ত অবস্থান এই দলটির,এইসব উপজেলার সাবেক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রায় সবাই তাদেরই নেতা। বর্তমানেও দীঘিনালা ছাড়া বাকি তিন উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন দলটির নেতারা।

অন্যদিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) জানিয়েছেন,গত ২৪ বছরে তাদের ৩৫০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর তাদের ৩৫০ জন নেতাকর্মী আঞ্চলিক বিভিন্ন দলের হাতে খুন হয়েছেন। তবে এদের মধ্যে ঠিক কতজন বাঘাইছড়িতে মারা গেছেন সেই সম্পর্কে তাৎক্ষনিক জানাতে পারেননি তিনি।

অন্যদিকে বেশ কিছুদিন ধরেই সকল যোগাযোগের বাইরে থাকা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির নেতাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি এই সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে। সংগঠনটির ইমেইলে বার্তা পাঠিয়েও জবাব মেলেনি বাহাত্তর ঘন্টাতেও।

তবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভাষ্য,এই উপজেলায় সংগঠনটির অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে গত এক দশকে।

ভয়ের নাম বাঘাইছড়ি
রাঙামাটি থেকে নৌপথে আর খাগড়াছড়ি থেকে সড়কপথে যোগাযোগের এই উপজেলাটি সম্ভবত দেশের সবচে দুর্গম উপজেলা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ কিংবা পাহাড়ী নদীর মতো এখানকার রাজনীতিও বেশ সর্পিল। এখানে যাবতীয় উত্থান পতন বাঁক বদল হয় নিমিষেই। নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের গাড়ীবহরে গুলি করে হত্যা, উপজেলা সদরে পিআইও অফিসে ঢুকে এক ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা, একটি দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি-সাংগঠনিক সম্পাদককে একযোগে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপ কিলিং হয়েছে এই উপজেলায়। সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় নিজের কাছেও লাইসেন্সধারি অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করতে হয় এই উপজেলার নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানকেও। আইনশৃংখলাবাহিনীর বিপুল উপস্থিতিও এখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে পারেনা সাধারন মানুষের। ভৌগলিক অবস্থান ও দুর্গমতার কারণে এইসব অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে সফল হওয়াও বেশ কঠিন সরকারি বাহিনীগুলোর। ফলে বাঘাইছড়ি দৃশ্যত ভয়েরই এক জনপদ। যেখানে জীবন হাতে নিয়ে চলাফেরা করেন একজন সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিও। আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জীবন যেনো কচু পাতায় ভাসমান এক টুকরো জল’ই ।

ঝুঁকিতে সাজেক’র ট্যুরিজম
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে পর্বতকণ্যা সাজেক। বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত নয়নাভিরাম এই স্থানটিকে অনেকেই আদর করে ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’ও বলছেন। সেখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট,কটেজ,হোটেল। সাজেককে ঘিরে সম্প্রসারিত সম্ভাবনাময় পাহাড়ের পর্যটন। কিন্তু বাঘাইছড়িতে একের পর এক সহিংসতার ঘটনায় প্রভাব পড়ছে সাজেককেন্দ্রিক পর্যটনেও। মানুষ ভয় যাচ্ছে,কারণ পর্যটকবাহি গাড়ীতেও একাধিকবার সশস্ত্র হামলা হওয়ায় সেখানে এখন যাওয়া-আসা’র কাজটি পুরোটাই হয় আইনশৃংখলাবাহিনীর বিশেষ প্রহরায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ে। ফলে বিপুল সম্ভাবনার এই স্থানটির পর্যটনও ঝুঁকিতে পড়েছে সশস্ত্র সংঘাতে।

তবে বাঘাইছড়ি কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের এইসব হত্যাকান্ড কিংবা আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র দাপট নিয়ে খুব একটা কথা বলতে চাননা আইনশৃংখলাবাহিনীর দায়িত্বশীলরা। পুলিশের বাঘাইছড়ি সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল চৌধুরী বলেছেন-‘ এসব আপনারা সবই জানেন,কেনো কি কারণে হয়,আমরা এসব নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে চাইনা। কোন ঘটনা ঘটলে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে। আমরা ঘটনার পর তদন্ত করে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করি।’

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button