নীড় পাতা / ফিচার / অরণ্যসুন্দরী / বগালেক : আকাশ পাহাড় জলের মিতালি যেখানে
parbatyachattagram

অনেক দিন ধরে কেওক্রাডং, বগালেক এবং মুনলাই পাড়া যাওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু কোনভাবে ব্যাটে বলে মিলছিল না। অবশেষে গত ৪ সেপ্টেম্বর দেখে এলাম পাহাড়ের ভাঁজে লুকায়িত এই সৌন্দর্যগুলো। পাহাড় যে রহস্য, বিষ্ময়ে ভরা জায়গাগুলোতে গেলে তা বোঝা যায়।

৬জনের টিম নিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে আমাদের যাত্রা শুরু। বান্দরবান বাসস্টেশন থেকে জীপ রিজার্ভ করে দুই ঘন্টার যাত্রায় প্রথমে গেলাম রুমা উপজেলায়। এখানে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপিসহ আপনার বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে। সবকিছুই আপনার নিরাপত্তার স্বার্থে। পুরো কাজটিতে আপনাকে গাইড সহযোগিতা করবে। বলে রাখি এসব স্পটে যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই গাইড নিতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আমরা রওনা হলাম বগালেকের উদ্দেশে। জিপে করে প্রায় ১৭ কিলোমিটারের যাত্রাপথ। পথে বেশ কয়েকটি জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীকে তথ্য দিতে হয়। সবুজ পাহাড়ের বুকে পিচ ঢালা পথ ধরে অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন বগালেকে পৌঁছে যাবেন বুঝতেই পারবেন না। তবে বগালেকের শেষ খাঁড়া পাহাড়টিতে উঠতে আপনার বুক কেঁপে উঠবে নিশ্চিত। বগালেকে পৌঁছে প্রথমে আপনাকে স্থানীয় সেনাবিহীন ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। তারপর… বগালেক আপনার!

বান্দরবান থেকে বগালেক পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটারের যাত্রা পথ। সময় সব মিলে সাড়ে তিন ঘন্টা। আর এ লম্বা সময় জার্নি শেষে যখন আপনার চোখের সামনে প্রত্যাশিত বগালেক তখন উচ্ছ¡সিত হওয়াটা স্বাভাবিক। সেখানকার আর্মি ক্যাম্পের পাহাড় থেকে পুরো লেকটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। চারদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাধার বগালেক। ইচ্ছে করবে এখনি নেমে লেকের পানিতে লাফালাফি করতে। এ যেন আকাশ, পাহাড়, জলের মিতালী। প্রকৃতি ঢেলে দিয়েছে এক রাশ সবুজের ছোঁয়া।

সরকারি তথ্য বাতায়ন বলছে, রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নে ২হাজার ৭শ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত লেকটি। প্রায় ১৫ একরের এ লেক গঠন শৈলী দেখে মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার মিঠা পানির হ্রদ এটি। অবশ্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ শহীদুল ইসলাম ২০০৫ সালে প্রথম বগালেকের পরিমাপ করেন। তার দাবি অনুযায়ী, বগালেকের উচ্চতা ১হাজার ৭৩ ফুট এবং গভীরতা ১১৫ ফুট।

এত পাহাড়ের উচুঁতে কিভাবে হলো এই জলাধার। কৌতুহল হল জানবার। সেই আগ্রহ থেকে খোঁজ নেয়া। রহস্যঘেরা লেক সৃষ্টি নিয়ে রয়েছে নানা গল্প। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ড্রাগন হত্যা। এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও পর্যটক সহযোগী পানুয়াম বম বলেন, স্থানীয়দের ভাষ্য মতে বহু বছর আগে বগালেক এলাকায় প্রায় ৬০ পরিবার ¤্রাে সম্প্রদায় বসবাস করতো। একটি ড্রাগন তাদের গৃহপালিত পশু খেয়ে ফেলতো। পরে স্থানীয়রা ড্রাগনটিকে হত্যা করে তার মাংস গ্রামে বিতরণ করে দেয়। ওই রাতে রাতে স্থানীয় এক বৃদ্ধা স্বপ্নে দেখেন ড্রাগন হত্যার কারণে গ্রামটি তলিয়ে যাচ্ছে। পরের তিন সকাল হওয়ার আগেই তিনি গ্রামটি ছেড়ে যান। সূর্য উঠার পর ¤্রাে সম্প্রদায়ের বসবাসকৃত এলাকাটি তলিয়ে যায়। যার কারণে এই লেকের সৃষ্টি।

গঠনার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে পাহাড়ের প্রবীণ সাংবাদিক চৌধুরী আতাউর রহমানের লেখাতে। ১৯৮৩ সনে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় বগালেক নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনি ড্রাগন হত্যার গল্পটি উঠে আসে।
লেকের রহস্য রয়েছে আরো! স্বাভাবিকভাবে বগালেকের পানি নীল স্বচ্ছ হলেও ৩ থেকে ৪ বছর পর পর লেকের পানি ঘোলা হয়ে যায়। রং অনেকটা কাদামাখা পানির মত ঘোলাটে। তিন থেকে চার দিন পানির রং ঘোলাটে থাকার পর আবার স্বাভাবিক রং এ ফিরে আসে। তবে কেন এমন ঘটনা তা এখনো অজানা।

বর্তমানে এই লেকের সৌন্দর্য পর্র্যটকরা উপভোগ করতে পারলেও লেকে নামার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এই সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞার কাগজ আপনাকে রুমায় তথ্য দেয়ার সময় পূরণ করতে হয়। যেখানে আপনি লেকে নামবেন না মর্মে অঙ্গিকার করা লাগে। যদিও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঘাটের কাছে নেমে গোসল করা যায়। মূূলত লেকের পানিতে নেমে পর্যটকসহ ৪জনের মৃত্যু হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর্মি ক্যাম্প থেকে একটু সামনে গেলেই বগালেকের মূল গ্রাম দেখা যাবে। বর্তমানে প্রায় ৩৬টি বম পরিবার এখানে বসবাস করে। ছোট্ট গ্রাম এবং লেকটিকে যেন সযতেœ আগলে রেখেছে বড় বড় পাহাড়গুলো। এখানে বিদ্যুৎ নেই। সোলার ভরসা। তবে মোবাইল বা ব্যাটারি চার্জ দেয়ার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ঘুরতে যাওয়ার মানুষের কাছে এখানকার পরিচিত নাম লাল এং সিয়াম বম। সবাই সিয়াম দিদি নামেই চেনে তাকে। আলাপকালে জানান, ২০০৪ সালের দিকে তিনিই প্রথম কটেজ নির্মাণ করেন। বর্তমানে তার ৬টি কটেজ রয়েছে। মূলত মাটি থেকে উপওে মাচাং করে তৈরিকৃত ঘরকে এখানে কটেজ বলা হয়। তিনি নিজে একটি দোকান চালান। পর্যটকরা তার কটেজে থাকার পাশাপাশি রয়েছে খাবারের সুবিধা।

ভরা পূর্ণিমাতে আমাদের সময় কাটে লেকের পাড়ে। লেকের পাড়ে বারবিকিউ’র আয়োজন, মাথার উপর পূর্ণিমার আলোতে কোলাহলমুক্ত বুনো প্রাণ প্রকৃতির শব্দ যেন বলে যায়… এইতো জীবন!

Micro Web Technology

আরো দেখুন

অর্ধশত কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে নীতিশ-সমরেশ বিরোধ

পৈত্রিক প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে রাঙামাটি শহরের শশী দেওয়ান পাড়ায় …

Leave a Reply