ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

ফের জনসংহতি-ইউপিডিএফ বিরোধের আঁচ পাহাড়ে !

‘বিশেষ কর্মী বাহিনীকে’ প্রত্যাহার করার দাবি ১১৫ কার্বারির

পাহাড়ের দুই প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  এবং প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ( ইউপিডিএফ) এর মধ্যে আবারো বিরোধ এবং ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পানছড়ি উপজেলার ১১৫ জন কার্বারি সাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দুই দলের মধ্যেকার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

গণমাধ্যমে পাঠানো এই বিবৃতিতে তারা  ‘খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার কার্বারীরা নতুন করে ভ্রাতৃঘতি সংঘাতের আশঙ্কা দূর করতে ইউপিডিএফের সাথে হওয়া সমঝোতার শর্ত মেনে চলার জন্য জেএসএসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।’ তারা বলেন, ‘জেএসএস ইউপিডিএফের সাথে তাদের সম্পাদিত সমঝোতা লঙ্ঘন করে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করার ফলে এই নতুন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে উভয় দলের উচ্চ পর্যায়ের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উক্ত সমঝোতা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

বিবৃতিতে কার্বারীবৃন্দ ‘উভয় পার্টির তথা জনগণের জন্য হিতকর উক্ত সমঝোতা লঙ্ঘনকে অসঙ্গত, অপ্রত্যাশিত ও জাতীয় স্বার্থের পরিপিন্থী একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং ‘সমঝোতা লঙ্ঘনকারী পক্ষকে অবিলম্বে ভুল স্বীকার করে প্রতিপক্ষ দলের নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে নিজেদের ‘বিশেষ কর্মী বাহিনীকে’ প্রত্যাহারপূর্বক নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা’ দুর করার দাবি জানান।

পানছড়ি ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত প্রতিরোধ কমিটি কর্তৃক ২০ অক্টোবর ২০২০ তিনটি স্থানে আয়োজিত সভায় উপস্থিত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ১১৫ জন কার্বারী তাদের স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান।

সংবাদ মাধ্যমে প্রেরিত উক্ত বিবৃতিতে কার্বারীগণ বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, পানছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে নতুন করে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বাঁধার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’

একই সাথে তারা `বহু কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত’ উক্ত সমঝোতার সকল শর্ত মেনে চলার জন্য উভয় দলকে অনুরোধ জানান।

বিবৃতিতে কার্বারীগণ ২০১৮ সালের উক্ত সমঝোতাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে সংলাপ শুরু করতে উভয় দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একমাত্র বৃহত্তর ঐক্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মাধ্যমেই জনগণের ন্যায্য অধিকার অর্জিত হতে পারে। অপরদিকে নিজেদের মধ্যে সংঘাত—হানাহানি জাতির জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে। গত ২২/২৩ বছর ধরে চলা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত জাতি ও জনগণের জন্য ক্ষতি ছাড়া কোন মঙ্গল বয়ে আনেনি।’

বিবৃতিতে তারা জাতীয় স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা ইউপিডিএফ ও জেএসএস ব্যতীত অন্যন্য পাহাড়ি দল ও গ্রুপগুলোকেও সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

কার্বারীগণ বিবৃতিতে সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে আরও লক্ষ্য করছি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইদানিং পাহাড়ি নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন তথা ধর্ষণ ও গণধর্ষণ এবং ভূমি বেদখলের ঘটনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ’ তারা নারী নিযাতনের এসব বর্বর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

উক্ত যৌথ বিবৃতিতে কার্বারীগণ ইউপিডিএফ, জেএসএসসহ সকল দল ও সংগঠনকে নিজেদের মধ্যেকার সকল প্রকার বৈরীতা ভুলে গিয়ে একজোট হয়ে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পৃথক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে সশস্ত্র গেরিলা সংগঠন শান্তিবাহিনী গঠন করেন তৎকালিন সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। ১৯৮২ সালে নিজের একদল বিপদগামি সহযোদ্ধার হাতে কয়েকজন সহযোদ্ধাসহ নিহত হন তিনি। কিন্তু ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত পাহাড়ে শান্তিবাহিনীর হামলায় মারা যায় অজস্র মানুষ। যাদের মধ্যে সাধারন বাঙালী-পাহাড়ী ছাড়াও ছিলেন আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্য,সরকারি কর্মচারি,জনপ্রতিনিধি,রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অনেকেই। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সাথে এক সমঝোতা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দুই দশক পর গেরিলা জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র শান্তিবাহিনীর সদস্য। কিন্তু সেই সময়ই চুক্তির বিরোধীতা করে গঠিত হয় পাহাড়ীদের আরেক আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)। আর শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্ আর নিজের রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে  রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি,যার নেতৃত্বে ছিলেন সন্তু লারমা। কিন্তু এই দুই দলের সশস্ত্র লড়াইয়ে ১৯৯৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী। এরই মধ্যে ভাঙ্গনের শিকার হয় দুটি দলই ।

সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সুধাসিন্ধু-পেলে-রূপায়ন দেওয়ানের নেতৃত্বে ২০০৯ সালে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) ভেঙ্গে ২০১৬ সালে তপনজ্যোতি চাকমা-জলোয়া চাকমার নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউপিডিএফ-গনতান্ত্রিক। চারদলের পাল্টাপাল্টি সশস্ত্র হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই পুরোনো বিভেদ ভুলে ২০১৮ সালে ‘কৌশলগত ও আত্মরক্ষার’ স্বার্থে সমঝোতা চুক্তি করে সন্তু লারমার জনসংহতি ও প্রসীতের ইউপিডিএফ।  এই ঐক্যের ফলে গত দুই বছর দৃশ্যত পরষ্পরের উপর হামলা করেনি তারা,বরং সংঘবন্ধ হয়ে হামলা করেছে নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন দল গড়া প্রতিপক্ষের দিকেই।  অন্যদিকে এই দুই দল ভেঙ্গে গড়া সংস্কারপন্থী জনসংহতি এবং  ইউপিডিএফ-গনতান্ত্রিকও নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ‍তোলে বাঁচার তাগিদেই !

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনাপ্রবাহে সন্তু লারমার জনসংহতি ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর মধ্যে বিরোধের বিষয়টি নানাভাবে আলোচিত হচ্ছিলো।  পানছড়ির ১১৫ কার্বারির বিবৃতির মাধ্যমে সেটি আরো স্পষ্ট হলো। এখন দেখার বিষয় গত দুই বছরের কথিত সমঝোতা কিংবা মধুচন্দ্রিমা শেষে এই বিরোধ কোথায় গিয়ে পৌঁছায়।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + ten =

Back to top button