নীড় পাতা / ব্রেকিং / প্রাণ ফিরলো প্রাণের পার্কে
parbatyachattagram

প্রাণ ফিরলো প্রাণের পার্কে

দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবারো প্রাণ ফিরে পেলো রাঙামাটি পার্ক। জেলা শহরের একমাত্র পার্কটিতে ২০০৫ সালে তৎকালিন পৌর চেয়ারম্যান একটি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিলে দীর্ঘ মামলার জটিলতা শেষে প্রায় দেড় দশক পর আবারো শিশুদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে শিশু পার্ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ১৯৮৪ সালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন রাঙামাটি পৌরসভাকে ‘রাঙামাটি পার্ক’ নামে এই পার্কটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দেয়। পরবর্তীতে পৌর কর্তৃপক্ষ পার্কটিতে বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ ও বাগান করেন। এক সময় পৌরসভা পার্কটির নাম পরিবর্তন করে ‘রাঙামাটি পৌর পার্ক’ নামকরণ করে। ২০০৫ সালে এসে রাঙামাটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ পার্কটির বেশিরভাগ গাছ কেটে ও বাগানটি নষ্ট করে পার্কের ওপর কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের কাজ শুরু করে। এতে বাধা হয়ে আসে ফজলে এলাহী নেতৃত্বাধীন সংগঠন ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। প্রবীণ সংবাদকর্মী সুনীল কান্তি দে’কে সামনে রেখে সঙ্গী হিসেবে হেফাজত সবুজ, জসিম উদ্দীন, ঈশান আক্তার, তৌফিক হাসান লিটু, সৈকত রঞ্জন চৌধুরী,মিথুন ধ্রুব,হাসান কবির,নজরুল ইসলাম,তানজীর মেহেদীসহ গ্লোবাল ভিলেজের একঝাঁক নবীনদের সাথে নিয়ে সেদিন গ্লোবাল ভিলেজ’র নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ কাজে বাধা দেন। এতে তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় নানা অপপ্রচার, হুমকি ও মারধর। পরবর্তীতে গ্লোবাল ভিলেজ পরিবেশবাদী জাতীয় সংগঠন ‘বেলা’র সাহায্যে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ বন্ধ রাখতে হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট বিষয়টি আমলে নিয়ে পার্কের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করে। হাইকোর্টের ‘স্থিতিবস্থা’ জারির পর বিশ্বব্যাংক তাদের বরাদ্দকৃত ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ফিরিয়ে নেন। এই ঘটনার আগ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনেরও জানা ছিল না পার্কটি জেলা প্রশাসনের অধীনে। শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় পৌরসভাকে। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন পার্কটির দায়িত্ব বুঝে নেন। ২০১৩ সালে সাবেক পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর ভূট্টো, রিটকারি ফজলে এলাহী ও জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামালের মধ্যে পার্কের বিষয়ে সমঝোতা হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, পৌর মেয়র নিজ উদ্যোগ ও খরচে পার্কের ওপর নির্মিণাধীন স্থাপনা অপসারণ করবে এবং পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন পার্কের ভেতর গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করবে। পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো নির্মিণাধীন স্থাপনা উচ্ছেদের পর জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল পার্কের ভেতর গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন। এরপর জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিন, জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নানও পার্কটির সংস্কার কাজ করেন। পরবর্তীতে বর্তমান জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ দায়িত্ব নেয়ার পর পার্কের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তিনি জেলা প্রশাসনের ফান্ড থেকে পার্কে বাগান ও ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করেন। এছাড়া এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে পার্কে কিছু সংস্কার কাজ শেষে রাইড বসানো হয়।

হাইকোর্টে রিটকারী পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী বলেন, কমিউনিটি সেন্টার করার বরাদ্দ ছিল শিশু পার্কের নিচের অংশ থেকে। অর্থাৎ মূল পার্কটিকে ঠিক রেখেই এর পরিকল্পনা আর অর্থায়ন হয়েছিল। কিন্তু পৌর চেয়ারম্যানের এক নিকটাত্মীয় কাজটির ঠিকাদার হওয়ায় পার্কটির মূল জায়গার উপরেই কমিউনিটি সেন্টারের নির্মাণ কাজ শুরু করে। আমরা এর প্রতিবাদ করি। কিন্তু চেয়ারম্যান তাতে সাড়া না দিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে থাকেন। এক পর্যায়ে আমরা হাইকোর্টে রিট করি। এলাকার লোকজন পার্কটি পৌর কর্তৃপক্ষের বলে জানত। কিন্তু রিট করার পর বিভিন্ন কাগজ-পত্র দেখে বুঝতে পারি আসলে পার্কটি পৌরসভার নয়। এটির প্রকৃত মালিক জেলা প্রশাসন। কোর্ট পার্কটির মালিকানা জেলা প্রশাসনের হাতে দিয়ে এটির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন।

তিনি আরো বলেন, পার্কে কাজ বন্ধ রাখার আন্দোলন জানালেও চেয়ারম্যানের কিছু অনুসারী আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে বিতর্ক প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধর করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। চেয়ারম্যানের আরেক অনুসারি যিনি বর্তমানে বেঁচে নেই, তিনি শারীরিকভাবে আমাকে লাঞ্চিতও করেন। এতোকিছুর পরও আমরা আমাদের আন্দোলন থেকে সরে যায়নি। সেই দিন থেকে আজো যারা এই আন্দোলনে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত পার্কটি তার প্রাণ ফিরে পাওয়ায় আমি খুব খুশি।

এলাকাবাসী জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পার্কটি অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকায় দিন দিন এটি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। তারা জানান, দিনের বেলায় মাদকসেবিরা পার্কে আড্ডা দেয়। এছাড়া পার্কের পাশ দিয়ে স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় ছাত্রীদের নানাভাবে টিজ করে বখাটেরা।

সাবেক পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো বলেন, আমি পৌর মেয়র হওয়ার পর সাংবাদিক ফজলে এলাহী আমার সাথে দেখা করে পার্কটির নির্মাণাধীন স্থাপনা উচ্ছেদের অনুরোধ জানান। আমিও এই এলাকার সন্তান হিসেবে আমিও মনে করি পার্কটি থাকা উচিত, তাই ২০১৩ সালে আমি, জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল ও রিটকারি ফজলে এলাহীর মধ্যে সমঝোতা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে পার্কটি প্রাণ ফিরে পাওয়ায় খুব ভালো লাগছে।

সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান কাজী নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি সেসময়ে সরাসরি আন্দোলনে না থাকলেও আন্দোলনকারীদের সাথে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। পার্কটি ধ্বংস না করেও উন্নয়ন কাজ করা যেতো, কিন্তু সেদিন যারা করতে চেয়েছেন তারা হয়তো বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেননি।

জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর পার্কটিকে কিভাবে প্রাণ সঞ্চার করতে পারি সে চেষ্টাই ছিল। আমি সবসময় পার্কটির বিষয়ে কাজ করে গেছি। পার্কটির উন্নয়নে উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার ধর্না দিয়েছি। তারাও প্রথমে পার্কটি সংস্কারে বরাদ্দ দেয়, এখন রাইড বসানোর জন্য উন্নয়ন বোর্ড বরাদ্দ দেয়। রাইড বসানোর পর শিশুদের জন্য পার্কটি খুলে দেয়া হয়েছে। সকলের আন্তরিকতায় পার্কটি আবারো প্রাণ ফিরে পেলো বলে তিনি জানান।

বুধবার উদ্বোধন শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, পার্কটির সংস্কারে আমরা এই পর্যন্ত দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এরই মধ্যে এক কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বাকী এক কোটি টাকাও শীঘ্রই ছাড় দেয়া হবে। প্রয়োজনে আরো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে বলে জানান চেয়ারম্যান।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

তবলছড়ি কালিমন্দির পরিচালনার দায়িত্বে আশীষ-পংকজ-অরূপ

রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহি শ্রী শ্রী রক্ষা কালিমন্দির এর নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। গত রবিবার অনুষ্ঠিত এক …

Leave a Reply