করোনাভাইরাস আপডেটপাহাড়ের সচলচিত্রব্রেকিংরাঙামাটিলিড

প্রতিকূলতায়ও কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণে রেকর্ড

মৌসুমের শেষ দিকে নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) হানা। এর আগে ছিল শীত মৌসুমে তীব্র ঠান্ডার ধাক্কা। এসব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে এবারও রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ রেকর্ড হয়েছে। তবে শেষ দিকে করোনার হানা ও শীতকালীন সময়ে তীব্র ঠান্ডায় বেগ পেতে না হলে এবার অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে মাছ আহরণের পরিমাণ আরও বাড়ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি মৌসুম ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ থেকে ১২ হাজার ৬১৬ টনের অধিক মাছ আহরিত হয়েছে। এই অর্থবছরে বিএফডিসি’র রাঙামাটি প্রধান কেন্দ্র, মহালছড়ি ও কাপ্তাই উপকেন্দ্রে মোট ৮ হাজার ৫০৬ টন মাছ অবতরণ করা হয়। অবতরণ করা মাছের বিপরীতে বিএফডিসির রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাঙামাটিতে মোট ১০ হাজার ৪৭৪ টনের অধিক মাছ আহরিত হয়েছে। বিএফডিসির বিপণী কেন্দ্রে অবতরণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৩৮০ মাছ। অবতরণ করা মাছের বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়ে ছিল ১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাছ আহরণ বেড়েছে ২ হাজার ১৪২ টন ও রাজস্ব আদায় বেড়েছে আড়াই কোটি টাকারও বেশি।

বিএফডিসির আগের অর্থবছরগুলোর মাছ আহরণের হিসেব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছের আহরণের রেকর্ড হচ্ছে। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে কাপ্তাই হ্রদে ৮ হাজার ৮১৩ টন মাছ আহরণ হলেও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেকর্ড পতন হয়ে আহরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৭ হাজার ৭২৫ টনে। তবে পরবর্তী মৌসুম থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ রেকর্ড হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে হ্রদে মাছ আহরণ হয়েছে ৮ হাজার ৬৪৪ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৮৯ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ হাজার ৯৭৪ টন, ২০১৯-১৮ অর্থবছরে ১০ হাজার ১৫২ টন। তবে আহরিত মাছের মধ্যে কেঁচকি, চাপিলা, মলা ও দেশি মলাসহ অন্যান্য ছোট মাছের আধিক্য বেশি।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২ হাজার ৬১৬ টনের অধিক মাছ আহরণের বিপরীতে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। যা বিগত অর্থবছরের চেয়ে রেকর্ড। এই অর্থবছরের প্রথম দিকে আমাদের অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে ব্যাপকহারে মাছ আহরিত হয়েছে। তবে শেষ সময়ে এসে করোনা এবং শীতকালীন মৌসুমে তীব্র ঠান্ডায় কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মৌসুমের প্রথম আহরণের মাত্রা বাড়ায় শেষ দিকে আহরণ কম হলেও আমরা রেকর্ড করতে পেরেছি। এ মৌসুমে শীতকালে তীব্র ঠান্ডার কারণে অনেক জেলে ঠান্ডায় মাছ আহরণ করেননি, এতে করে শীত মৌসুমেও আহরণ কমেছে। অন্যদিকে মৌসুমের শেষ মাসে করোনার কারণে আহরণের ধারাবাহিকতায় ধসে নেমে ছিলো। সর্বোপরি পূর্বে আহরণের ফসল শেষে যোগান দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আমরা টার্গেটে পৌঁছাতে পেরেছি।

বিএফডিসি রাঙামাটি কেন্দ্রের মার্কেটিং অফিসার বৃন্দাবন হালদার বলেন, মৌসুমের শেষ সময়টাতে যেখানে পল্টনে দৈনিক ১৮-২০ টন মাছ অবতরণ করা হতো করোনার প্রভাবে এ বছর সেটা ৮-১০ টনে নেমে ছিলো। অন্যান্য মৌসুমের মত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবার আহরণ ও রাজস্ব দুটোই আরো অনেক বাড়ত।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধজলাশয়সমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎও। কাপ্তাই হ্রদের আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। যা বাংলাদেশের পুকুরসমূহের মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। ১৯৬১ সালে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও এটি রাঙামাটিতে মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। অন্যদিকে মৎস্য উৎপাদনের মধ্যদিয়ে রাজস্ব আদায়েও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এই হ্রদটি। কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি, হ্রদে অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরাসহ হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিবছরের পহেলা মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে তিন মাস মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয় নতুন মৌসুম। আগস্ট থেকে পরবর্তী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই নয়মাসকে মৌসুম ধরা হয়।

সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসেবে কাপ্তাই হ্রদে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে পুরো জেলার প্রায় সাড়ে ২২ হাজার জেলে। বছরের নয়মাস তারা হ্রদে মাছ ধরলেও মাছ শিকার বন্ধকালীন তিন মাস তাদের অলস সময় কাটাতে হয়। আগে তিনমাস মাস বন্ধকালীন সময়ে জেলেদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল দেওয়া হলেও বিগত দুই বছরে দেয়া হয়নি। এবছর করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও যদি জেলেদের ভিডিএফ কার্ডের মাধ্যমে জেলেদের চাল বিতরণ করা না হয় তবে আরও খাদ্য সংকটে ভূগবে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার জেলে পরিবার।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button