প্রকৃতিপুরাণরাঙামাটিলিড

পুড়ছে সবুজ পাহাড়, বিপন্ন পরিবেশ-প্রতিবেশ

ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্যও

শংকর হোড়
সবুজ পাহাড় পুড়ছে জুমের আগুনে। এতে নষ্ট হচ্ছে মাটির গুণাগুণ। পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। সাধারণত পাহাড়িরা বংশ পরম্পরায় পাহাড়ে জুম চাষের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। একটি পাহাড়ে কয়েকবছর ধান, মরিচ, মারফাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে জুম চাষিরা। কয়েকবছর পর পাহাড়টি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হলে অন্য একটি পাহাড়ে চাষাবাদ শুরু করে। চৈত্র-বৈশাখ মাসের শুকনো মৌসুমে পাহাড়ে আগুন দিয়ে সব পরিষ্কার করার পর বর্ষার বৃষ্টির পরপরই জমি চাষাবাদের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাহাড়ে আগুন দেয়ার কারণে পাহাড়ের পর পাহাড় আগুনে পুড়ে যায়। এতে শুধু বিভিন্ন প্রাণি ধ্বংস হচ্ছে না, নষ্ট হয় মাটির গুণাগুণ, ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতিও। তবে গত বেশ কয়েক বছর ধরে জুম চাষের ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে জুম চাষিরাও সমতল জমি না পেয়ে নিরুপায় হয়ে জুম চাষে নিযুক্ত থাকতে হচ্ছে। তবে বর্তমানে জুম চাষের স্থানে অনেকেই মিশ্র ফলের চাষ শুরু করেছে।

জুমিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুমে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল ফাল্গুনে তোলা শেষ হওয়ার পর চৈত্র ও বৈশাখের শুকনো মৌসুমে পরবর্তী বছরের জমি প্রস্তুতির জন্য ঝোঁপজঙ্গল ও আগাছা পরিষ্কারের জন্য পাহাড়ে আগুন দেয়া হয়। শুকনো মৌসুম হওয়ায় এসময় এক জায়গায় আগুন লাগিয়ে দিলে পাহাড়ের পর পাহাড় পুড়ে ন্যাড়া হয়ে যায়। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় ঝোঁপ-ঝাড় পরিষ্কার করা শ্রমসাধ্য বিষয়। এজন্য বছরের পর বছর পাহাড়িরা পাহাড়ে ফসল ফলানোর জন্য আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার করে। এরপর বর্ষা মৌসুমে জমি চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা হয়। এদিকে পাহাড়ে বছরের পর বছর আগুন দেয়ায় নষ্ট হচ্ছে জমির গুণাগুণ। ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। মাটি পুড়ে গুণাগুণ নষ্টের পাশাপাশি নরম হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষায় পাহাড়ে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। জুমের আগুনে সবুজ পাহাড়গুলো পোড়ানোর কারণে তাপমাত্রাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে রাঙামাটিতে। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে আগুন দিয়ে আদিপদ্ধতিতে জুম চাষ করে সারা বছরের খাদ্যশস্য ঘরে তুলতে পারলেও জুমচাষ প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিপন্ন করার পাশাপাশি মাটি ক্ষয় এবং প্রাণিজসম্পদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে দেয়। তাই পাহাড়ে পরিবেশসম্মতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রাত হলেই রাঙামাটি শহর থেকে বিভিন্ন পাহাড়ে আগুনের শিখা দেখা যায়।

প্রকৃতি ও ইকো ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করা রাইন্যা টুগুনের পরিচালক ললিত সি. চাকমা বলেন, জুমচাষ একটি বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি। আদিকাল থেকে পাহাড়ের মানুষ এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আসছে। নির্দিষ্ট এলাকা আগুনে পুড়িয়ে চাষাবাদ করলে জুমচাষ কোনওভাবে ক্ষতিকারক নয়। তবে মাঝে-মধ্যে অসতর্কতার কারণে পাহাড়ের পর পাহাড় পুড়ে যায়। এজন্য অনেকে জুমচাষের বিপক্ষে। তবে জুমচাষিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো তারাও এমন শ্রমসাধ্য চাষাবাদ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতো। দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই নির্ভর করছে জুমচাষের উপকারিতা ও অপকারিতা-বলেন ললিত সি. চাকমা।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বলেন, এবার বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে এখনো জুম চাষ শুরু হয়নি। আপাতত পাহাড়ে আগুন দিয়ে চাষিরা জমি পরিষ্কারের কাজ করছে। তিনি বলেন, আদি যুগ থেকে চাষিরা জুম চাষ করে আসছে, তাই তো হুট করে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ বন্ধ করা যাবে না। তবে আমরা তাদেরকে বলেছি, যতদূর সম্ভব মাটিকে ডিস্টার্ব না করে মাটির উর্বরতা নষ্ট না করে জমি পরিষ্কার করার জন্য। এতে চাষাবাদের জন্য মঙ্গলজনক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রফিকুজ্জামান শাহ্ জানান, বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন বনভূমি বা পাহাড়ে কেউ আগুন দেওয়ার অপচেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রতিহত করা হয়। মূলতঃ জুম চাষিগণ পাহাড়ে চাষ করার জন্য আগুন দিচ্ছে। তিনি জানান, আগুন দেয়ার ফলে পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি পুড়ে গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে যে সমস্ত উপকারি অণুজীব আছে সেগুলো ধ্বংস হয়। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমির উর্বরতা ক্ষয় সাধিত হয়। যার ফলে ভূমিধসের শঙ্কা তৈরি হয় এবং বন্যপ্রাণীর খাবার সংকট দেখা দেয়। যার ফলে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসে।

ষাটের দশক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম নিয়ন্ত্রণে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা(ডিএফও) জি এম মোহাম্মদ কবির বলেন, জুম চাষ সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব না। যেহেতু এই চাষের ওপর বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী এখনো নির্ভরশীল। তারপরও আগের চেয়ে জুম চাষ অনেকটাই কমেছে। এখন জুম চাষিরা লেবু, কলাসহ বিভিন্ন মিশ্র ফল চাষের দিকে ঝুঁকছে। তিনি বলেন, জুম নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় চাষিদের সচেতনতায় দীর্ঘসময় ধরে কাজ করে আসছে, যার সুফল আমরা পাচ্ছি। চাষিরাও আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছে। ডিএফও আরো বলেন, আমরা চাষিদের বলেছি, যদিও আগুন দিতে হয় তাহলে যতটুকু জমিতে চাষ করা হবে, ততটুকু ফায়ার লাইন করে দিয়ে আলাদা করে দিলে তাহলে পাহাড়ের পর পাহাড় আগুনে পুড়ে যাবে না। এতে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button