ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

পাহাড়ে ১৫ মাসে খুন ৬৩!

রাঙামাটির সবুজ পাহাড়ে দিন দিন বাড়ছে রক্তের হোলি খেলা। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও আধিপত্য বিস্বারকে কেন্দ্র করে একের পর এক সংগঠিত হচ্ছে হামলা ও বিভিন্ন খুন। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে পাহাড়ে গত ১৫ মাসে ৬৩ জন নারী-পুরুষ প্রাণ হারিয়েছেন বিভিন্ন সংঘর্ষে।

এক নজরে হত্যাকান্ডগুলো:
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়াম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) এর ঘোষণার চারদিন পরেই ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর নানিয়ারচর সতেরোমাইল ও আঠারোমাইলের মধ্যবর্তী চিরঞ্জীব দোজরপাড়া এলাকার নিজবাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়ে ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্য অনাধি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫)। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে অনাধি সমর্থিত দল ইউপিডিএফ (প্রসিত)।

ওই দিনই রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে এ হত্যাকান্ডের জন্য আওয়ামী লীগ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসকে দায়ী করে। এছাড়া একইদিনে বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
একদিন পর ৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরে নিজ বাসায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খীসাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে ১৬ ডিসেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় ইউপিডিএফকর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ (প্রসিত) এ হত্যাকান্ডের জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে।

২০১৭ সাল পেরুয়ে ২০১৮ সালের শুরুতেই ৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তংচঙ্গ্যাকে গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ জেএসএসকে দায়ী করে। এই দিনেই পার্বত্য অঞ্চলের অন্য এক জেলার খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা মিঠুন চাকমাকে। ইউপিডিএফ এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেন। তবে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দায় অস্বীকার করেন।

ঐ বছরের ৩০ জানুয়ারি বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনাতেও জেএসএসকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ কর্মীরা।

এর প্রতিবাদে রাঙামাটিতে সে সময় হরতাল পালন কওে জেলা ছাত্রলীগ। ২১ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনিও ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত কর্মী ছিলেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ (প্রসিত) কর্মী দীলিপ কুমার চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ইউপিডিএফের হরিনাথ পাড়ার সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে ১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের (প্রসিত) কর্মী নতুন মনি চাকমাকে।

১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুবছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। প্রায় এক মাস পরে ১৯ এপ্রিল মুক্তি পান তারা দুইজন। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে ইউপিডিএফ (প্রসিত)।

১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউপিডিএফের (প্রসিত) এক সদস্য। এ হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেএসএসের (এমএনলারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। তারা হলেন- পঞ্চায়ন সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমা (২৯)।

১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামে একজন নিহত হন। তিনিও ইউপিডিএফর দুই গ্রুপের বিরোধের কারণে প্রাণ হারান। ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (এমএন লারমা) মধ্যে গোলাগুলিতে সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৪০) নামে এক ইউপিডিএফ সমর্থিত কর্মী নিহত হন।

এরপরের মাসে ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ে সামনে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমাকে। এসময় তার সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এর একদিন পর ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা। একই সঙ্গে দলটির নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনক চাকমা এবং তাদের গাড়িচালক সজীব।

ঐবছরের ১৭ আগস্ট খাগড়াছড়ি স্বনির্ভর এলাকায় ইউপিডিএফ (প্রসিত) দলের মূল কার্যালয়ে হামলা চালায় দুর্র্বৃত্তরা এতে ঘঠনাস্থলেই ৬জন মারা যায়।

এছাড়াও ২০১৮ সাল ও চলতি বছরে বিভিন্ন সময়ে রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়িতে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছিলো। সর্বশেষ গত ১৮ মার্চ পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন শেষে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়ন থেকে ফেরার পথে উপজেলার নয়মাইল এলাকায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে প্রিসাইডিং অফিসার ও আনসার সদস্যসহ সাতজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৬ জন। এ ঘটনার ২৪ ঘন্টা না পেরুতেই রাঙামাটি বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এসব ঘটনার পরিপেক্ষিতে পার্বত্য জেলা জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অমলেন্দু হাওলাদার বলেন, পাহাড়ের মানুষ আগে সকলে মিলে শান্ত পরিবেশে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বাস করতো। কিন্তু দিন দিন পাহাড়ে আলাদা হওয়ার প্রবণতা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকেই অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছি।

খাগড়াছড়ির স্থানীয় সাংবাদিক অপু দত্ত বলেন, ‘জেএসএস’র (সন্তু লারমা) আগে একক আধিপত্য ছিলো। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায় এই আধিপত্যে অনেকেই ভাগ বসিয়েছে। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলো ভাগ করে নিয়ে চাঁদাবাজি করছে। পাহাড়ের যে হত্যাকান্ড গুলো হচ্ছে তার একমাত্র কারণ পাহাড়ের চাঁদাবাজী ও আধিপত্য বিস্তার বলে মনে করেন এই সংবাদকর্মী।

রাঙামাটির স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ের চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের কথা বলে আসছেন। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির একমাত্র কারণ অবৈধ অস্ত্র। এ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার সহ পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের জন্য তিনি অভিযান চালানো আহ্বান জানান প্রশাসনকে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button