ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

পাহাড়ে বেড়েছে ধর্ষণ,বাড়ছে প্রতিবাদও

সারাদেশেই নারী, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের প্রথমদিন থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কয়েকজন নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকারও হয়েছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে পাহাড়ি নারী ও শিশু। কয়েকটি ঘটনায় ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে খুন ও হত্যাচেষ্টা করা হয়।

পাহাড়ে প্রতিনিয়ত নারী ধর্ষণের এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; নিয়মিত ঘটনাই বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, ‘এসব ঘটনার সাথে সুপরিকল্পনা ভাবে শাসকগোষ্ঠীও জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি জাতিগত নিপীড়নের একটি অংশ।’

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও বেসরকারি তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই আটমাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১৫ জন নারী, কিশোরী ও শিশু ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে ২০১৮ সালের প্রথমদিন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের উত্তর গঞ্জপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির এক শিশুকে অফিস রুমে নিয়ে ধর্ষণ করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম। এরপর ২৭ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের থলি পাড়ায় ৪৫ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী গ্রামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ধর্ষণ চেষ্টার সাথে জড়িত সন্দেহে এলাকাবাসী মোঃ ইমান আলীকে (৩৫) ধরে পুলিশেও সোপর্দ করে। জানা গেছে, ইমান আলী খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়াডের অমর পুরগামের মো. আব্দুল লতিফের ছেলে। সে পেশায় একজন টিউবওয়েলের মিস্ত্রি।

এরপর ৮ মার্চ খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার গোমতি এলাকায় খাবার পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৪ বছর বয়সী এক ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। এঘটনার পনেরো দিনের মাথায় ২৫ মার্চ একই উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের রনেশ কার্বারি পাড়া এলাকায় ৮ম শ্রেণী পড়ুয়া এক পাহাড়ি ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এতে ব্যর্থ হয়ে তাকে সে কুপিয়ে জখম করা হয়।

১৩ এপ্রিল বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুক পাতা ইউনিয়নের বালুঝিড়ি বিদ্যামণি পাড়ায় ৪ যুবক মিলে ১৪ বছর বয়সী এক পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণ করে। এবং ২৯ মে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ির উপজেলার মাইসছড়িতে দশম শ্রেণির তিন ছাত্রীকে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

১৬ জুন বান্দরবানের লামায় ম্যা হ্লাউ মারমা নামে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে নিজবাড়িতে ধর্ষণের পর হত্যা করার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনার ৫দিন পর ২১ জুন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্কে বেড়াতে গিয়ে কয়েকজন যুবক দ্বারা এক ত্রিপুরা কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়।

এরপর ৯ জুলাই রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের কাশখালী এলাকায় স্থানীয় বাজার থেকে ফেরার পথে ২৫ বছর বয়সী মারমা নারী ধর্ষণের শিকার হয়। এরপর ১৬ জুলাই খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ১নং খাগড়াছড়ি ইউনিয়নের নুনছড়ি রোয়াজাপাড়া ৯ম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক ত্রিপুরা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়।

২৫ জুলাই রাতে বান্দরবান শহরে পুলিন কান্তি দাশ নামের এক ব্যক্তি দ্বারা চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পর মেয়েটির মা বাদী বান্দরবান সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ঘটনার নাথে জড়িত পুলিনকে আটক করেও পুলিশ। ২৮ জুলাই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল নামক স্থানে কৃত্তিকা ত্রিপুরা (পুর্ণাতি) নামে ৫ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ১১ বছর বয়সী এক ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায়ও ওই শিশুর মা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দীঘিনালা থানায় একটি মামলা করেন।

গত ২ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়ায় পাহাড়ি যুবক কর্তৃক সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৫) ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পরে ওই ছাত্রীকে খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এরপর ৪ আগস্ট রাঙামাটির লংগদ ুউপজেলার ভাসন্যা আদাম ইউপি’রচাইল্যাতলী গ্রামে শওকত নামে এক যুবক দ্বারা ১৬ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী পাহাড়ি কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। গ্রামবাসীরা ধর্ষণের ঘটনায় মো. শওকতকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

গত ৬ আগস্ট (মঙ্গলবার) খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন গোমতি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের উদয়কুমার কার্বারিপাড়ায় নিজ বাড়িতে এক পাহাড়ি নারী ধর্ষণের শিকার হয়। সর্বশেষ ৭ আগস্ট (বুধবার) রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টাকালে একজনকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশকে দিয়েছে স্থানীয়রা। অভিযুক্ত মো. মনসুর (৩৫) বাঘাইছড়ি সদরের মুসলিম ব্লক এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

পাহাড়ে বিগত আটমাসে ১৫ নারী, শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। বেশ কয়েকটি ঘটনায় বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনও করা হয়েছে।

সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের বান্দবানের সভাপতি ডনাই প্রু নেলী বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কেবল ধর্ষণ নয়, কয়েকজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করাও হয়েছে। আমরা এখনো হত্যার তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাইনি। তাহলে রির্পোটের বিলম্ব হওয়ার কারণ কী? আর বিশেষ করে এসব ধর্ষণের ঘটনায় সেটেলার যুবকরাই জড়িত হয়েছে। তাই আমি মনেকরি পার্বত্য চট্টগ্রামে এটি জাতিগত নিপীড়নের অংশ।’

বারবার এসব ঘটনার পুনঃরাবৃত্তিতে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে দায়ী করে নারী অধিকারকর্মী টুকু তালুকদার বলেন, ‘পাহাড়ের নারীরা জুমে বা বাইরে একা কাজ করতে অভ্যস্ত। নারীদের একা পেয়ে ধর্ষকরা সে সুযোগে ধর্ষণ করছে। বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে, আসামীও আটক হয়েছে। কিন্তু আইনের ‘ফাঁকফুাক’ দিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। রাষ্ট্রের আইনে যে শাস্তি আছে, সেটা বাস্তবায়িত হলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো না।’

ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা জানান, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের ধর্ষণ সমতলের মতো কোনো সাধারণ সামাজিক ব্যাধি নয়; বরং শাসকগোষ্ঠী পাহাড়ি জনগণের ওপর জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ধর্ষণ ও যৌন হামলাকে সুপরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করে আসছে। এ ধরণের ঘটনায় উল্লেখ্য যোগ্য ভাবে কারোই বিচার হয়নি। আর বারবার এ ঘটনার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দায়ী। এবং এই একটি মাত্র কারণে অপরাধীরা বারবার জঘন্য অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।’

মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘পাহাড়ে বারবার ধর্ষণ সংঘটিত হচ্ছে। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি এখন নিয়মিত ঘটনায় রূপ নিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন আসামীরা ধরা পড়েও ছাড়া পেয়েছে। আমরা মনেকরি এ ধরণের ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে আইনের সর্বোচ্চ শাসন প্রয়োজন।’

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button