নীড় পাতা / পাহাড়ের সংবাদ / খাগড়াছড়ি / পাহাড়ে খুনোখুনি থামছেই না
parbatyachattagram

পাহাড়ে খুনোখুনি থামছেই না

পার্বত্য চুক্তির পর পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে বিরোধ ও সংঘাত যেন কমছেই না। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের ভ্রাতৃঘাতি বিবাদ, অন্তঃদ্বন্দ্ব আর খুনোখুনির ঘটনায় বলির পাঁঠা হচ্ছেন সাধারণ পাহাড়িরাই বেশি। আর গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই ১১ মাসে রাঙামাটি জেলার শুধু বাঘাইছড়ি ও রাজস্থলী উপজেলায় প্রাণ গেছে ২২জনের। আগে শান্তিচুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ দু‘টি গ্রুপ থাকলেও বর্তমানে আরো নতুন দুটি দলে দ্বিধাবিভক্ত অংশের আবির্ভাব মূলত সাধারণ পাহাড়িদের মাঝে নতুনভাবে ভাবনা যোগ করে।

আদর্শগত দ্বন্দ্বের চেয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্রমেই দ্বন্দ্ব, সংঘাত, আতংক এবং ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তিন পাহাড়ে। চুক্তির ২২ বছরে এই সংঘাতে মারা গেছে অন্তত প্রায় হাজার খানেক মানুষ। যারা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের জের ধরে হামলা পাল্টা হামলা, চোরাগোপ্তা হামলা, মুখোমুখি গোলাগুলির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া পঙ্গুত্ব বরণ, অপহরণ, গুমের ঘটনায় আরো অসংখ্য পাহাড়ি ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের শিকার হন। অবশ্য ঘটনার শিকার অর্ধেকের বেশিই জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ, জনসংহতি সমিতি (এম এনলারমা) ও ইউপিপিএফ (গণতান্ত্রিক) এর নেতাকর্মী বা সমর্থক।

ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত দৃশ্যমান হলেও আঞ্চলিক কোন সংগঠনই তা মানতে রাজি নয়। তারা বলছে, আদর্শগত সংগ্রাম চললেও তারা ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছেন না। আবার প্রত্যেকেই ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের নিরসনও চান।

পুলিশি তথ্য অনুযায়ী রাঙামাটি জেলার গত বছরের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে অপহরণ ১৩টি, আপহৃত ব্যক্তি ১৮জন। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে নিহত ৪১জন, মামলা ২৫টি। চাঁদাবাজি মামলা হয়েছে ৫৩টি, চাঁদাবাজি মামলায় আটক ৬২।

সাধারণ পাহাড়িরা বলছেন, অধিকার আদায় করতে চাইলেও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত ও নিজেদের মধ্যে অহেতুক বিরোধে জড়াতে বন্ধ করা জরুরি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক পাহাড়ির অভিযোগ, শহর কিংবা শহরতলীর তুলনায় দূর পাহাড়ের পাহাড়িরা অনেকাংশেই অসহায় ও নিরূপায়। পৃথক চারটি ধারার রাজনীতির কাছে জিম্মি তারা। একটি দলের পক্ষে অবস্থান বা সমর্থন করলে অন্যদলটি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। প্রায়ই তাদের (জনগণকে) বিচারের মুখোমুখি হতে হয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের কাছে। প্রতিবাদ বা নিরব থাকলেও খুন, গুম ও বা অপহরণ হতে হয়। এসব হতে বাদ পড়েন না হেডম্যান বা কার্বারি, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এমনকি গ্রামের বয়স্ক মুরব্বিরাও।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর জন্য আজ পাহাড়ে এতো সংঘাত। তারা তখন চুক্তি বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ চারটি আঞ্চলিক সংগঠন হতো না। তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হউক এটা আমরা সব সময় চাই। এর জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর কারণে এটি বন্ধ হচ্ছে না। তারা মুখে হানাহানি বন্ধের কথা বললেও সাধারণ পাহাড়িরা তাদের কথা বিশ^াস করেনা। তরা উভয়ে বিশ^াস ঘাতক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এনলারমা) দলের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে কোন হত্যাকান্ডের সাথে আমাদের দল জড়িত ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যাদের বেশি ক্ষতি হবে তারাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে। আমরাও চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরচামান থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা বলেন, শাসক গোষ্ঠীর কারণে পাহাড়ে সংঘাত বন্ধ হচ্ছেন। গত গত ১০ নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় জেএসএস ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলগুলো ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত ও হানাহানি বন্ধে সকলকে ঐক্যবন্ধ হওয়ার আহ্বানকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। কিন্তু তারপরও কি বন্ধ হচ্ছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু লারমা) বলেন, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন চাই। চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পার্বত্য এলাকায় সমস্যা সমাধান হবে না। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের লক্ষেই তো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল কিন্তু ২২ বছর হতে চললেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। সুতরাং মৌলিক বিষয়গুলো যতদিন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা বলতে পারি না পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধান হয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে চুক্তি নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, পাহাড়ে শান্তি স্থাপনের জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে তাহলে এখানে শান্তি আসতে বাধ্য। শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে পাওয়া না পাওয়ার থেকে সংগঠনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাশাও। আর এই কারণে হানাহানির সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাণহানির ঘটনা কমাতে হলে রাষ্ট্রকে ও শান্তিচুক্তির পক্ষে বিপক্ষে যেসব দল রয়েছে তাদেরকে সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে, তাহলেই পাহাড়ে শান্তি স্থাপন হবে বলে আমি মনে করি।

শিক্ষাবিদ প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমার মতে পাহাড়ে শান্তি ফিরাতে হলে সবপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। আন্তরিকতাই কোন ধরণের ফাঁকফোঁকর থাকা যাবে না। তাহলেই পাহাড়ে অবশ্যই শান্তি ফিরবে। আমরা সকলে চাই পাহাড়ে হানাহানি বন্ধ হউক। হানাহানি কখনোই শান্তি বরে আনে না।

প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, পাহাড়ের হত্যাকান্ড একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে শান্তিচুক্তির সম্পাদনকারী উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা স্থাপন করতে পারলেই পাহাড়ে শান্তি ফিরবে বলে আমি মনে করি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

চুরির মামলা করে নিজেই ফেঁসে গেলেন বাদী !

রাঙামাটিতে মিথ্যা চুরির মামলায় বাদীর কারাদ- দিয়েছেন আদালত। জেলার কাউখালী থানার আর্দশগ্রাম নিবাসী আবুল কাসেমের …

Leave a Reply