ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

পাহাড়ে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ‘হাম’, তিন জেলায় ৯ শিশুর মৃত্যু

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) মতো সংক্রমণ রোগের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে পার্বত্য জনপদে দেখা দিয়েছে আরেক সংক্রমণ রোগ হামের প্রাদুর্ভাব। এ পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় ‘হামে’ আক্রান্ত হয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার বিকেলে পার্বত্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার প্রত্যন্ত এক ত্রিপুরা গ্রামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। বর্তমানে ওই ত্রিপুরা গ্রামে আরও অর্ধশতাধিক শিশু ‘হাম’ আক্রান্ত রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার বিকেলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ত্রিপুরা অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রাম রথিচন্দ্র কার্বারিপাড়ায় হাম উপসর্গ নিয়ে ধ্বনিকা ত্রিপুরা নামের নয় বছরের এক শিশু মারা। সে ওই পাড়ার রঞ্জন ত্রিপুরার কন্যা সন্তান। বর্তমানে রথিচন্দ্র কার্বারিপাড়া নামক এই ত্রিপুরা পাড়ায় আরও অর্ধশতাধিক শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ রয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশুরই বয়স ১০ বছরের কম। বর্তমানে ওই পাড়ায় পান্থই ত্রিপুরা (৯) নামে আরও এক শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৮/১০দিন আগে থেকে সেখানকার শিশুদের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দেয়। আক্রান্তদের শরীরে জ্বর এবং লালগুটি দেখা যায়। দুর্গম এলাকা এবং গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় কেউ চিকিৎসা সেবা নিতে পারেনি। তবে স্থানীয়ভাবে শুধু প্যারাসিটামল খাওয়াচ্ছিলেন শিশুদের। কিন্তু শনিবার ধ্বনিকা ত্রিপুরার মৃত্যুর পর গ্রামে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর পরপরই রোববার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়। বিষয়টি জানার পর একটি মেডিকেল টিম সেখানে গিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়। মেডিকেল টিম এলাকায় পৌঁছার পর অর্ধশতাধিক শিশুদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিমের কাছে হাজির হয়েছেন অভিভাবকরা। এর মধ্যে ২-১জন শিশুর শারীরীক অবস্থা খুব ভাল নয়। এর মধ্যে শনিতা ত্রিপুরা নামের সতেরো বছরের এক কিশোরী রোগাক্রান্ত হয়ে এসেছেন চিকিৎসার জন্য। বাকিদের সকলের বয়স ১০ বছরের কম।

ওই এলাকার সারেন্দ্র ত্রিপুরা জানান, তার দুই ছেলে মেয়ে খঞ্জন ত্রিপুরা (০৭) এবং মেরিনা ত্রিপুরা (০৬) হামে আক্রান্ত। স্থানীয় ভাষায় তারা একে বলেন ‘লুতি’। স্থানীয় চরণ বিকাশ ত্রিপুরা (৩৮) জানান, স্থানীয়রা সকলেই ছড়া, কুয়া ও ঝর্ণার পানি ব্যবহার করেন। তবে পানি পান করার জন্য অনেকেই তা ফুটিয়ে পান করেন।

স্থানীয় রথিচন্দ্র কার্বাবিপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধ্বনিময় ত্রিপুরা জানান, ‘মৃত ধ্বনিকা ত্রিপুরা তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। সে হামে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেয়া হয়নি। সর্বশেষ তার শরীরের লালগুটিগুলোও শুকিয়ে গিয়ে প্রচÐ জ্বর ছিল।’

দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তনয় তালুকদার জানান, আক্রান্তদের লক্ষণ হামের সাথে মিল রয়েছে। তবে পরীক্ষা ব্যতিত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আক্রান্তদের মধ্য থেকে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে পান্থই ত্রিপুরাকে হাসপাতালে এনে ভর্তি করানো হয়েছে। এছাড়া এলাকার অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনে সে পাড়াতে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, ‘ঘটনার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক এবং ওষুধ নিয়ে সেখানে পৌঁছেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে রাঙামাটির দুর্গম সাজেক ইউনিয়নের অরুণপাড়া ও লংথিয়ান পাড়া নামের এই দু’টি ত্রিপুরা পাড়ায় গত ফেব্রæয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখনো সাজেক ইউনিয়নের অরুণপাড়া, লংথিয়ান পাড়া, তারুং পাড়া, হাইচপাড়া ও কমলাপুর পাড়ায় ১৩৬ শিশু হাম আক্রান্ত রয়েছে। তাদেরকে চিকিৎসা প্রদান করছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টিম। এছাড়া গত ২৫ মার্চ বিকেলে সাজেকের লংথিয়ান পাড়ার বাসিন্দা অনীল মোহন ত্রিপুরার হাম আক্রান্ত পাঁচ ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় গুরুতর অসুস্থ পাঁচ শিশুকে সেনবাহিনী ও বিজিবির সহায়তায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) নেয়া হয়। বর্তমানে ওই পাঁচ শিশু সুস্থ রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে রোববার বিকেলে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আহসান হাবিব জিতু জানিয়েছেন, ‘সাজেকে এখনো পর্যন্ত ১৩৬ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আগে যে মেডিকেল টিমগুলো সেখানে চিকিৎসা প্রদান করছিলো, তারা চলে এসেছেন। গত শনিবার নতুন একটি মেডিকেল টিম সেখানে চিকিৎসা প্রদানের পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে আগের ১৩৬ জন শিশু ছাড়া নতুন কেউ হাম আক্রান্ত হয়নি। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকেই এখন সুস্থের দিকে।’

এদিকে গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পুরাতন লাইল্যা মুরুং পাড়ায় হাম আক্রান্ত হয়ে দুতিয়া মুরুং (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনার ওই পাড়ার আক্রান্ত আরও ৩৪ শিশুকে ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদুল হক।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব প্রত্যন্ত গ্রামে শহুরে এলাকার মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছায় না। বিশেষ করে এসব প্রত্যন্ত গ্রামে যাতায়াত অসুবিধার কারণেও স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠকর্মীরা পৌঁছাতে পারেন না। এছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে টিকাভীতি ও নানান ধরণের কুসংস্কার বিশ্বাস থাকায় অনেকেই নিজেদের শিশুদের টিকাগ্রহণ থেকে বিরত রাখেন। এসব কারণেই মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকাগুলো বিভিন্ন সময়ে নানান রোগের প্রার্দুভাব দেখা দেয়।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button
Close