বান্দরবানলিড

পাহাড়ে আয়ের হাতছানি দিচ্ছে সম্ভাবনাময় কাজুবাদাম চাষ

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা ॥
কাজু বাদাম অত্যন্ত সুস্বাধু ও পুষ্টিকর খাবার। বর্তমানে দেশব্যাপী এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি আমাদের দেশে যে নতুন, তা নয়। অনেক আগে থেকে অঞ্চলভেদে এর একেকটি নাম রয়েছে। পাহাড়ে মারমা ভাষায় বাদাংসি, ত্রিপুরা ভাষায় বাদাম-বাথাই, চাকমা ভাষায় তাজুবাদাম বা তাংগুলো, বম ভাষায় ক্যাশনাক, আর চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় টাম বা টামগুলা। এর বৈজ্ঞানিক নাম এনাকারডিয়াম অক্সিডেনটেল। ইংরেজি নাম ক্যাশনাট আর বাংলায় কাজুবাদাম নামে পরিচিত। পাহাড়ের আবহাওয়া ও মাটি কাজুবাদাম চাষের উপযোগী হওয়ায় কৃষি বিভাগের মাধ্যমে পাহাড়ে কাজু বাদাম চাষের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ ধারাবাহিকতায় বান্দরবানের লামা উপজেলার ১৬৫ জন কাজু বাদাম চাষীদেরকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, চারা, সার, কীটনাশকসহ সার্বিক সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক কৃষক এ কাজু বাদাম উৎপাদনে লাভবানও হয়েছেন। এদের দেখাদেখি উপজেলার পাহাড়গুলোতে কাজু বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা, এতে দিন দিন বাড়ছে কৃষকের সংখ্যা।

কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত লামা উপজেলায় ১৬৫ জন কৃষক পাহাড়ি ভূমিতে কাজু বাদাম চাষ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৮-২০ সাল পর্যন্ত হর্টিকালচারের মাধ্যমে ১৭ একর, ২০২১ সালে হর্টিকালচার কৃষি বিভাগের মাধ্যমে ৫ একর, ২০২১ সালে হর্টিকালচারের মাধ্যমে ৫ একর, উপপরিচালক বান্দরবান কর্তক ৭ একর, ২০২১ সালে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৪ একর, ডিএই প্রকল্প হতে ১৭ একরসহ মোট ১৬০ একর জমিতে কাজু বাদামের বাগান সৃজন করেন কৃষক। ইতিমধ্যে ৩১৭৬১টি গাছের মধ্যে ৪৩০০টিতে ০.৩১ মেট্রিক টন ফলনও এসেছে। বাণিজ্যিক সফলতা থাকায় এবং এ অঞ্চলের আবহাওয়া, মাটি কাজুবাদাম চাষের উপযোগী হওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলকে কাজুবাদাম চাষের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের দ্বার বলা যায় বলে মন্তব্য করেন কৃষি বিভাগ। সম্প্রতি কাজু বাদাম ও কপি গবেষণা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক শহীদুল ইসলাম উপজেলায় সৃজিত বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন করেন। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা বিনতে সালাম, উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অভিজিৎ বড়–য়া, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপন চৌধুরী ও চাষী মংক্যহ্লা মার্মা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে লাভের দিক বিবেচনা করলে কাজুবাদাম একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল। কেননা এই কাজুবাদাম শুধু বাদাম নয়। এর বহুমাত্রিক ব্যবহার বিদ্যমান। বলা যায় একই অঙ্গে বহুরূপ। বাদামের খোসা থেকে উৎপাদিত তৈল দিয়ে উৎকৃষ্টমানের জৈব বালাইনাশক, ভিনেগার, এলকোহল তৈরি করা যায় বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত রয়েছে। বাদামের সঙ্গে লাগোয়া উপরের ফল থেকে জুস তৈরি করা যেতে পারে। এ কাজু এ্যাপল ফলে ৮০ শতাংশ জুস থাকে। উহা অনেক ঔষধিগুণ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। এ জুসে কমলালেবুর চেয়ে ছয়গুণ বেশি ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এসব প্রক্রিয়াজাত জুস বিক্রি করেও অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। প্রতি ৩.৫-৪.০ কেজি খোসাযুক্ত বাদাম থেকে ১ কেজি প্রক্রিয়াজাত বাদাম পাওয়া যায়। যার গড় বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৮০০-১২০০ টাকা। আর খোসাযুক্ত বাদামের কৃষক পর্যায়ে মূল্য ৫০-৬০ টাকা। মূলত: প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ বাদামের অধিক মূল্য পাওয়া সম্ভব। তাই প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বর্তমানে রাঙ্গামাটি, বান্দরবানের মুসলিমপাড়ায় এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা রয়েছে। উৎপাদান বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি করা দরকার। পার্বত্য এলাকায় সরকারিভাবে একটি কফি ও কাজুবাদাম গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের চাষি মংক্যলা মার্মা জানিয়েছেন, বান্দরবানের থানচি উপজেলা হতে বীজ সংগ্রহের মাধ্যমে গজালিয়া ইউনিয়নে ১০ একর জায়গা জুড়ে প্রথম কাজু বাদামের চাষ করেন তিনি। কিছু গাছের ফলনসহ তার বাগানে বর্তমানে ৩ হাজার গাছ রয়েছে।

অপরদিকে বান্দরবানে প্রথম কাজুবাদাম চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এলএ অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইফতেখার সেলিম জানায়, এলএ অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় ২ একর জমিতে উচ্চ ফলনশীল কাজু বাদামের চারা উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। প্রাথমিকভাবে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে উন্নতজাতের ৬ লাখ কাজু বাদামের বীজ আনা হয়েছে এবং চারা উৎপাদন করে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলা এবং আশেপাশের জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোপূর্বে বান্দরবানে কোনো কাজু বাদামের চারা উৎপাদনের নার্সারি ছিলনা। তখন জেলায় কাজুবাদামের চাষে আগ্রহীও ছিলো না চাষিরা। বর্তমানে আমাদের নার্সারি শুরুর পর থেকেই বান্দরবানে কাজু বাদামের চাষ বেড়েছে।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রতন চন্দ্র বর্মন জানান, কাজুবাদাম চাষীদের কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে প্রশিক্ষনের পাশাপাশি চারা,সার,খুঁটি,বেড়াসহ সব ধরনের সহযোগীতা করা হচ্ছে। এখানে বহু পতিত ভূমি রয়েছে যা কাজুবাদাম চাষের মাধ্যমে আবাদের আওতায় এনে কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে পারেন। তিনি আরা বলেন, বিশ্ব বাজারে কাজুবাদামের ব্যাপক চাহিদা থাকায় অর্থকরী ফসলের মধ্যে কাজুবাদাম একটি। এর বাণিজ্যিক সফলতা থাকায় এবং এ অঞ্চলের আবহাওয়া, মাটি কাজুবাদাম চাষের উপযোগী হওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলকে কাজুবাদাম চাষের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের দ্বার বলা যায়। এ অঞ্চলের মানুষদের আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে হাতছানি দিচ্ছে কাজুবাদাম। একারনে কৃষকরা দিনদিন আগ্রহী হয়ে উঠছে কাজুবাদাম চাষে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button