রাঙামাটিলিড

পাহাড়েও বাজলো ঘণ্টা

মিশু মল্লিক ॥
বলা হয়ে থাকে মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর মধ্যে শিক্ষাজীবনের সময়গুলোই সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর। সেই মধুর উপভোগ্য সময়গুলোকেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল মহামারী করোনা। দীর্ঘ ১৮ মাস শিক্ষাঙ্গন থেকে দূরে রেখেছিল শিক্ষার্থীদের। সুদীর্ঘ সেই দূরত্বকে ঘুচিয়ে আবারো ছাত্র-ছাত্রীদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাঙামাটির স্কুল-কলেজগুলো।

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী রবিবার থেকে সারাদেশের সাথে তাল মিলিয়ে রাঙামাটির প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুলে দেয়া হয়েছে। রবিবার সকাল থেকে স্কুল কলেজগুলোর গেটে শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের অভিভাবকরাও এসেছিলেন স্কুলে। দীর্ঘদিন পর সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পেরে স্বস্তী প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক।

অভিভাবক পার্থ সেন বলেন, আজ প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল আমাদের সন্তানরা শ্রেণী কার্যক্রমের বাইরে। বাসায় থাকতে থাকতে ছেলেমেয়েরা মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল, স্কুল খুলে দেয়াতে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি অনুভব করবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণে তাদের ক্ষতিটাও ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের দ্রুত করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় আনার দাবি জানান।

স্কুল খুলে দেয়ার আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠদানের উপযোগী করার নির্দেশনা থাকলেও অনেক স্কুলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটা কিছুটা অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। কিছু স্কুলে এখনো চলছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ। তবে রাঙামাটির বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পাঠদানের উপযোগী করে তোলা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের নিউ রাঙামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাটি পাবলিক কলেজ, রাঙামাটি সরকারি কলেজ, রাঙামাটি সিএইচটি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ মুখে রয়েছে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা এবং শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা। যেসকল শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে তাদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।

এই বিষয়ে নিউ রাঙামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পারভীন ফেরদৌসী বলেন, আমরা সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আজ থেকে আমাদের শ্রেণী কার্যক্রম শুরু করেছি। দীর্ঘ ১৮ মাসের দূরত্ব পেরিয়ে আবারো ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।

রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলন চাকমা জানান, স্কুলে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রত্যেক ছাত্রীদের স্যানিটাইজ করা, তাপমাত্রা পরিমাপ এবং মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করেছি। ক্লাসে বসার ক্ষেত্রের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণতোষ মল্লিক জানান, অনেকদিন পর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে পেয়ে আমরা সকলেই আনন্দিত। আমরা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। এই কারণেই স্কুল প্রাঙ্গনে আইশোলেশন সেন্টার প্রস্তুত রেখেছি।
রাঙামাটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর তুষার কান্তি বড়–য়া বলেন, আজকের দিনটি খুবই আনন্দের দিন। দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর শিক্ষার্থীদের স্বশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে আজ থেকে সারাদেশে পাঠদান শুরু হলো। আমাদের কলেজে একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণীর পাঠদান শুরু হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের যাতে প্রতিদিন দুটি করে ক্লাস করতে পারে আমরা সেভাবে আমাদের রুটিন তৈরি করেছি। তিনি আরো বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সরকার যদি দ্রুত ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসে তাহলে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের কোন সম্ভাবনা তৈরি হবে না।

দীর্ঘদিন পর আবারো শ্রেণীকক্ষে পাঠদান শুরু করতে পেরে শিক্ষকদের মধ্যেও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। আনন্দ ছিল শিক্ষক ও কর্মচারীদের কন্ঠেও। শিক্ষক মুজিবর রহমান বলেন, আমরা আবারো শ্রেণীকক্ষে পাঠদান শুরু করতে পেরেছি যা শিক্ষার্থী এবং আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক। এই ধারাবাহিকতা যাতে বজায় থাকে সেই কামনাই করি। নিউ রাঙামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী মোঃ মনসুর বলেন, অনেকদিন পর ছেলেমেয়েদের স্কুলে দেখে খুব ভালো লাগছে।

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠা রাঙামাটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের কন্ঠেও ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আনন্দের অনুভূতি প্রকাশ করে রাঙামাটি পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী তুলি চাকমা বলেন, অনেকদিন পর ক্যাম্পাসে আসতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে। বন্ধু বান্ধব এবং শিক্ষকদের সাথে দেখা হলো, ক্লাসে বসতে পারলাম তাই খুবই আনন্দ লাগছে।

রাঙামাটি সিএইচটি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী অভিজিৎ চাকমা বলেন, অনেকদিন পর আবারো ক্লাসে ফিরতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমাদের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা হোক। তাহলে আমাদের আর শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে যেতে হবে না।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button