রাঙামাটি

পাহাড়জুড়ে এখনো ধসের ক্ষত

চার বছরেও শুকায়নি,এখনো চলছে জোড়াতালি

শুভ্র মিশু
পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসে ক্ষত চিহ্ন চার বছরেও শুকায়নি। ২০১৭ সালের ১২জুন দিবাগত রাত ও ১৩ জুন ভোর রাতের প্রবল ভারী বর্ষণ বজ্রপাতে পাহাড় ধসে শুধু পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ যায় ১২০জনের, সেই রাতের বৃষ্টিতে তিন পাবর্ত্য জেলা ও চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল হাজারো পরিবার।

সড়ক ধস ও মাটি পড়ে রাঙামাটির সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধসহ ভেঙ্গে পড়েছিল বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৩৬ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল শত শত মানুষের ঢল। সেই ভয়াল দিনটির চারটি বছর পেরেুলেও এখনো পুরোপুরি সংস্কার হয়নি জেলার সড়কপথ, পানি সরবরাহ লাইন।

সে সময় পাহাড় ধসের কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় সম্পর্কে গঠিত কমিটির সুপারিশের তেমন বাস্তবায়নেও চোখে পড়ে না, তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি ক্ষতগুলো স্থায়ী সংস্কারে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

# ঝূঁকিতে বসবাস ১০ হাজারের বেশি পরিবার
# সড়ক গুণছে সংস্কারের প্রহর
#সড়কের উপর এখনো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের পানি সরবরাহ লাইন

২০১৭ সালের ১২-১৪ জুন তিন পার্বত্য জেলায় ৯ শত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল যা দেশের ২মাসের বৃষ্টিপাতে অধিক। যার মধ্যে ১২-১৩জুন রাঙামাটিতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৬৫মিলিমিটার। এতে যেমন জেলায় শত শত ঘরবাড়ি পাহাড়ের মাটি পড়ে বিলীন হয়ে যায়, সড়কের পাশের অসংখ্যা বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়ে বন্ধ হয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহের লাইন ফেটে বন্ধ হয়ে পড়ে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, রাঙামাটি চট্টগ্রাম মহাসড়কের শালবন এলাকায় পাহাড় ও সড়ক ধসে পড়ায় ও অন্তত ৩৫টি স্থানে মাটি পড়ে রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়ক এবং সড়কের অসংখ্য স্থানে ছোট বড় অংশে মাটি পড়ে ও সড়কের পাশের মাটি ধসে পড়ায় রাঙামাটি বান্দরবান ও রাঙামটি খাগড়াছড়ি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় কার্যত সারাদেশের সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় রাঙামাটির। তখন কাপ্তাই রাঙামাটি নৌ-পথই হয়ে উঠেছিল জেলার যোগাযোগের ভরসা।

জেলায় ১০দিন পর রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়ক আবারো চালু করা হয়। শালবনে তৈরি হয় অস্থায়ী বেইলী ব্রিজ । জেলায় গত ১৮-১৯সালে সড়কের ভাঙ্গা অংশগুলো সংস্কারে ব্যবহার করা হয়েছিল বল্লি থেরাপি (কাঠে খুঁটি), যা প্রতিবছরই নতুন নতুন করে করা হতো, এতে ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রে কোটি কোটি টাকা। ২০২০সালে জেলার সড়কের বেশকিছু স্থানে শুরু হয় লোহার পাইপ দিয়ে বল্লি থেরাপি। যা এখনো টিকে থাকলেও কত সময় টিকবে তা বলতে পারছেন না কেও। তবে আশার বিষয় জেলার বেশকিছু স্থানে শুরু হয়েছে সড়ক রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম।

শহরের রাঙাপানির মত সড়কগুলোতে এখনো ক্ষত সাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগের দাবি, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ অফিসের অধীন ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্থ সড়কের বিভিন্ন কিলোমিটারে হাইপ্রতিরক্ষা মূলক আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জেলায় ১৫১টি স্পটে ৫হাজার ৪শত ৭০মিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ কাজ চলমান আছে। এছাড়াও এই প্রকল্পের আওতায় নালা হবে ৭ হাজার ৭শত ৩০ মিটার, কংক্রিটের স্লোপ প্রটেকশন ৭২হাজার বর্গমিটার কাজ চলমান। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪৯ কোটি টাকা। এতে জেলার ঝূঁকিতে থাকা সবগুলো সড়কেরই স্থায়ী সংস্কার কাজ করা হবে।

বর্তমান চলমান প্রকল্পের আওতায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার গতিপথের কি কি পরিবর্তন হয়েছে, মাটির গুণাগুন পরীক্ষাসহ পাহাড় ধসের ঝূঁকিতে থাকা স্পট চিহ্নিতকরণ এবং ঝূঁকি এড়াতে কোন স্পটে কি করতে হবে সেগুলো এই জরিপের মাধ্যমে বের করা হবে।

জেলা শহরের তবলছড়ি সড়কে ও রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের শিল্পকলা একাডেমী এলাকায় সড়কের ওপর তিন-পাঁচ ফুট জায়গা দখল করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহ লাইন। যা পাহাড় ধসের চার বছরেও সড়ানোর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৭ সালে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় সম্পর্কে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে ভূমি ধসের কারণ হিসেবে দুর্বল মাটির গঠন, অতি বৃষ্টিপাত, চাষাবাদ, অবৈধ বসতিস্থাপন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, বৃক্ষ নিধন, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবহার করে পাহাড় শাসন না করা, অবৈধভাবে পাহাড় কর্তন, ভূমিকম্পের মত কারণগুলো চিহ্নিত করে।

কমিটি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে ঝূঁকিতে বসবাস করা লোকজনকে আশ্রয়ন ও গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে স্থানান্তর করা, পাহাড় কাটা বন্ধ করার জন্য ইটভাটাগুলো ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, দূর্যোগের ফলে পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণ, পাহাড়ে ঢাল রক্ষায় অধিক হারে পরিবেশ বান্ধব ও পাহাড় রক্ষাকারী বৃক্ষ রোপন, পাহাড় কাটার কুফল সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানোসহ বেশকিছু প্রস্তাবনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।

পাহাড় ধস থেকে প্রতিকার পেতে ও প্রাণহানী কমাতে সেসব প্রস্থাবনার সিংহভাগই প্রতিপালন চোখে পড়ে না। বিগত বছরগুলোর জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে জেলা শহর সহ জেলার বিভিন্নস্থানে ঝূঁকি নিয়ে বসবাস করছে ১০হাজারেরও বেশি পরিবার। প্রতিনিয়ত পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানগুলোতে পুণরায়সহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গড়ে উঠছে বসতী।
তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, পাহাড় কাটা রোধে কঠোর হয়েছে প্রশাসন, তেমনি ভাবে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ , যেখানেই পাহাড় কাটার খবর আসছে সেখানেই তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওয়ায় গৃহহীনদের গৃহ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে নিয়ে প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কাজ চালমান আছে।

রাঙামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে জানান, আমরা এই পানি সরবরাহ লাইন সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাদের রাস্তার রিটেইনিং ওয়ালের কাজ শেষ করলে তখন রাস্তার নিচ দিয়ে নিয়ে যেতে পারবো, তার আগে এগুলো সরানো সম্ভব হবে না।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আরেফিন জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্থ সড়কের সকল স্পটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংস্কারে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ৫হাজার ৪শত ৭০ মিটার রির্টানিং ওয়ালের কাজ চলমান আছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভবিষ্যতে করণীয় বিষয়েও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একটি জরিপ চালানো হবে। প্রকল্পের প্রথমে বেশি ঝূঁকিতে থাকা সড়কগুলো আগে সংস্কার করা হচ্ছে, বাকিগুলো বর্ষা মৌসুম শেষ হলে করা হবে।

দুষ্টচক্রকে কোন ভাবে ছাড় দেওয়া যাবে না…জেলা প্রশাসক

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে নিয়ে পাহাড় ধস রোধে পূর্বের বিভিন্ন প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কাজ অব্যহত আছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর যেখানে পাহাড়কাটা, পাথর উত্তোলন, বালু উত্তোলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, দুষ্টচক্রকে কোন ভাবে ছাড় দেওয়া যাবে না।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button