নীড় পাতা / ব্রেকিং / পার্বত্য মন্ত্রী হচ্ছেন কে ?

পার্বত্য মন্ত্রী হচ্ছেন কে ?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য তিন জেলা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন পাহাড়ের তিন জেলার ‘জনপ্রিয়’ ‘প্রভাবশালী’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ’ তিন নেতাই। নিজ নিজ জেলায় নেতাকর্মীদের ‘আস্থা ও ভরসা’র প্রতীক হয়ে উঠা তিন নেতা দীপংকর তালুকদার,বীর বাহাদুর এবং কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’কে ঘিরেই মূলত আবর্তিত হয় তিন জেলার দলীয় রাজনীতি। দীর্ঘসময় ধরেই দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই দুই নেতার ইমেজও নিজ জেলায় বেশ পরিচ্ছন্ন। জনপ্রিয়তায় স্ব স্ব জেলায় তাদের ধারেকাছেও নেই কেউ। তবে বিজয়ের মিছিলেও তিন প্রার্থীর রয়েছে সুদীর্ঘ সংগ্রামী ও ঐতিহ্যের ইতিহাস। ১৯৯১ সাল থেকে টানা বিজয়ী হয়ে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বীর বাহাদুর নিজেকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন এক উচ্চতায়। অন্যদিকে ১৯৯১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা ছয় নির্বাচনে চারবার বিজয়ী দীপংকরও নিজের ব্যক্তিত্ব আর ত্যাগ আর ছাত্রজীবন থেকে দল করার ঐতিহ্য তাকে তৈরি করেছে ‘দাদা’ হিসেবেই। অন্যদিকে বিরোধে বিবর্ণ খাগড়াছড়ি আওয়ামীলীগ ২০১৪ সাল থেকে কুজেন্দ্রকে খুঁজে পাওয়ার পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনিও। ফলে এবার কে হবেন পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সেটা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিশ্লেষন। কে হচ্ছেন পার্বত্য মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী সেটা নিয়েই এখন পাহাড়জুড়ে চলছে নানান বিশ্লেষন।

পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের ইতিহাস : পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সহ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। ৬৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারি নিয়ে এই মন্ত্রনালয় পরিচালিত হয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ,পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড,ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরনার্থী প্রত্যাবাসন ও পুর্নবাসন এবং অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুর্নবাসন বিষয়ক টাস্কফোর্স এই মন্ত্রনালয়ের অধীনস্থ সংস্থা।

মন্ত্রনালয়ের শুরুতেই এইখানে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান সেইসময়কার খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং আওয়ামীলীগের প্রবীণ নেতা কল্পরঞ্জন চাকমা। মূলত: পার্বত্য চুক্তি সাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই নেতাকে মূল্যায়ন করা হয় এই মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব অর্পন করে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনেই পরাজিত হন তিনি এবং পরাজয়ের পর রাজনীতি থেকেই সড়ে যেতে হয় তাকে। ২০০১ বিএনপি ক্ষমতায় এলে এই মন্ত্রনালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পান মনিস্বপন দেওয়ান। ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলের পর সেনাসমর্থিত জরুরী সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি হিসেবে এই মন্ত্রনালয়ের দায়িথ্ব পান চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামীলীগের মন্ত্রীসভায় পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হন রাঙামাটির দীপংকর তালুকদার। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দীপংকর তালুকদার পরাজিত হলে সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হন বান্দরবানের বীর বাহাদুর।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারপর গত ১৮ বছরেও আজ অবধি কেউই এই মন্ত্রনালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হতে পারেনি । এমনি এক অবস্থায় এবার তিনজেলার তিন আসন থেকে নির্বাচিত তিন সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে আছেন অদ্ভূত এক সমীকরণে।

দীপংকরই কি তবে হচ্ছেন পার্বত্যমন্ত্রী ?
দীপংকর তালুকদার এই মন্ত্রনালয়ে ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল অবধি আওয়ামীলীগ সরকারের পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন,এবার তার সামনে আবারো একই মন্ত্রনালয়ে পূর্ণমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা। প্রবীন ও পরীক্ষিত এই নেতার সম্ভবত এইটাই ছিলো শেষ নির্বাচন।
আঞ্চলিক দুটি প্রভাবশালী দলের জোর বিরোধীতা ছিলো তার মনোনয়ন পাওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচিত হওয়ার প্রতিটি স্তরেই। ছিলো সরকারি দলের মধ্যেই থাকা তার বিরোধীদের অপপ্রচার ও অপচেষ্টা। সব প্রতিকূলতা জয় করে শেষাবধি বিস্ময়করভাবেই জয়ী হওয়া দীপংকর তালুকদার,চমকে দিয়েছেন জেলা থেকে কেন্দ্র, তৃণমূল থেকে শীর্ষ সব নেতৃত্বকেই !
ফলে তিন সংসদ সদস্যের মধ্যে এবার সম্ভাবনার দৌড়ে তিনিই সবচে বেশি এগিয়ে আছেন মন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে। একই সাথে তিনি বর্তমানে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে পাহাড়ে আওয়ামীলীগের একক কেন্দ্রীয় নেতাও। ধারণা করা হচ্ছে,ইতোপূর্বে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দীপংকর এবার হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রী। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই,সবসময় ত্যাগ বা জনপ্রিয়তার মূল্যায়নও হয়না। ফলে আদৌ কি পাহাড় পরিচালনাকারি মন্ত্রনালয়টির দায়িত্ব তিনি পাচ্ছেন কিনা,তা নির্ভর করছে,তার দলের প্রধান নিয়ন্ত্রক ও দলীয় প্রধান,তারই নেত্রী শেখ হাসিনার উপর।

মন্ত্রীসভায় বীরবাহাদুরকে চায় বান্দরবানবাসি
বীর বাহাদুরকে বলা হয় পার্বত্য রাজনীতির সৌভাগ্যের বরপুত্র। ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ সাল অবধি প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা বিজয়ী হওয়া এই সংসদ সদস্য,সর্বশেষ সরকারের পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের দুইবারের চেয়ারম্যানও। দায়িত্ব পালন করেছেন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকও। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তাদের সাথেও ছিলো তার ভ্রাতৃপ্রতীক সম্পর্ক। একইসাথে বান্দরবানের গণমাধ্যমকর্মীদের সাথেও রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ফলে জনপ্রিয় এই নেতা আবারো পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পাক, এটা চাইছেন তার অনুসারিরা। একই সাথে প্রতিমন্ত্রী নয়,পূর্ণমন্ত্রীত্ব পাক তিনি,এই দাবি জানাচ্ছেন তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় অনলাইনগুলোতেও। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর পছন্দের তালিকায়ও তিনিই আছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
তবে টানা ছয়বার নির্বাচিত এই নেতা পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এবার কিছুটা হলেও পিছিয়ে থাকছেন তার সিনিয়র নেতা দীপংকর তালুকদার বিজয়ী হওয়ায়। তার উপর বিগত মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে বাকি দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে খুব একটা না যাওয়া এবং উন্নয়ন বরাদ্দ বন্টনে বান্দরবানকেই বেশিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়ায় সমালোচিত হয়েছেন তিনি। ফলে বান্দরবাসি জেলাবাসির কাছে যতটা জনপ্রিয় তিনি,তারচে বেশি অজনপ্রিয় তিনি বাকি দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িবাসির কাছে। তবুও আলোচনায় জোরেসোড়েই আছেন এই নেতা। একক সংখ্যাঘরিষ্ঠ সরকারের নতুন মন্ত্রীসভায় পার্বত্য মন্ত্রনালয় কিংবা অন্য কোন মন্ত্রনালয়ে তাকে দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

খাগড়াছড়িতে ফিরবে কি মন্ত্রীত্ব ?
বাকী দুই পার্বত্য জেলার চেয়ে খাগড়াছড়ি আওয়ামীলীগের বিরোধ ও গ্রুপিং অনেক বেশি। কয়েকজন নেতা ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ ও সমীকরণে দাঁড়িয়ে বরাবরই চেষ্টা করেন দলীয় মনোনয়ন পেতে। আছে প্রভাবশালী আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ এর আধিপত্যও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিন পার্বত্য জেলার চেয়ে এই জেলাতেই সবচে বেশি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগের নৌকার প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল চাকমা। ২০১৪ সালে এই জেলায় তৎপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার প্রাক্কালে ইউপিডিএফ এর তীব্র বাধার চেষ্টাকালে মূলতঃ কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা আপ্রান ও আগ্রাসি প্রচেষ্টায় সফল হয় জনসভাটি। তারই পুরষ্কার পান তিনি দলীয় মনোনয়ন পান শেখ হাসিনার আস্থার প্রতীক হিসেবে এবং বিজয়ী হয়েও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখেন। এবারও সব সমীকরণকে ব্যর্থ করে দিয়ে বিজয়ী তিনি। তিনি এবং তার অনুসারিরা চাইছেন, ১৯৯৮ সালের পর আবার মন্ত্রীত্ব ফিরে আসুক এই জেলায় এবং কুজেন্দ্রই হোক পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী। ইতোমধ্যেই খাগড়াছড়িবাসির পক্ষ থেকে দাবিও বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। নানান সমীকরণে কুজেন্দ্রকেও তাই মন্ত্রীসভায় দেখাটা অস্বাভাবিক নয়।

তবে যত বিশ্লেষনই করা হোক না কেনো,রূঢ় কঠিন বাস্তবতা হলো,কোন বিশেষ জেলাবাসির আকাংখা কিংবা দাবি নয়,শেষাবধি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় এবং সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে পাহাড়ের তিন নেতার ভাগ্য। তবে এটা নিশ্চিত যে, এই তিনজনেরই কেউ একজন হচ্ছেন এবারের মন্ত্রীসভার পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী। তাই এখন অপেক্ষার পালা,কে সেই জন ? দীপংকর-বীর বাহাদুর নাকি কুজেন্দ্র কে পাচ্ছেন পার্বত্যমন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব, চাকমা-মারমা নাকি ত্রিপুরা কোন জনগোষ্ঠি থেকে থাকছে পাহাড় নিয়ন্ত্রনকারি মন্ত্রনালয়ের নেতৃত্ব।

আরো দেখুন

আত্মীয়-স্বজনের ঘরেই ঠাঁই পেল অগ্নিদুর্গতরা

মাসুম, বয়স ৮ বছর। সকাল বেলার নাস্তা সেরে ঘর থেকে বের হয়েছিলো বন্ধুদের সাথে খেলতে। …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fifteen + 20 =