ব্রেকিংরাঙামাটিলাইফস্টাইললিড

পানিতে ভাসলো বিষন্ন বৈসাবি’র ফুল

প্রতিবছর উৎসবের রঙে রঙিন পার্বত্য তিনজেলায় সাড়ম্বরে পালিত হওয়া বর্ষবরন ও বিদায়ের মহান অনুষ্ঠান বৈসাবি’র কোন  প্রাণ নেই এবার। বিশ্বব্যাপি মরণ ভাইরাস করোনার কারণে যখন মৃত্যুর মিছিলে প্রাণ হারিয়েছে এক লাখেরও বেশি মানুষ,সেই সময় বিষন্ন পৃথিবীর মতো বিষন্ন পাহাড়েও নেই উৎসব, উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা বা বড় কোন আয়োজন। তবুও মন খারাপ করা সকালে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে কেউ কেউ পানিতে ভাসিয়েছেন বিজুর ফুল।সামাজিক বা এলাকাবাসির উদ্যোগে নয়, ব্যক্তিগতভাবেই কেউ কেউ পালন করছেন সামাজিক নানা রীতি।  ২৯ চৈত্র রবিবার পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় শুরু হয়েছে বৈসাবি’র মূল আনুষ্ঠানিকতা।

প্রতিবছর সাধারণত ঐতিহ্যবাহী পোষাকে  গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে  শুরু হয় বৈসাবি উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ফুলবিজুর দিন সকালে রাঙামাটি শহরের রাজবনবিহারের পূর্ব ঘাটে ফুল বিজু উৎসবে কর্ণফুলী নদীতে ফুল ভাসায় চাকমা তরুণীরা। তবে এ বছর করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় বৈসাবি’র সব আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে দলবেঁধে বা কোনও সংস্থা থেকে পানিতে ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠান আয়োজন না করলেও পাহাড়িরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসিয়ে উৎসবটি অনাড়ম্বরভাবে পালন করতে দেখা গেছে।

পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ বেদনাই যেনো ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বালায় পাহাড়ের মানুষ। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো দিনের বেদনা ভুলে নতুন দিনের প্রত্যয়ের কথা জানায় ফুল ভাসাতে আসা পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা। পানিতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তাঁরা গঙ্গা মাকে শ্রদ্ধা জানায়। পাহাড়িদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ফুল হচ্ছে একটা পবিত্র জিনিস।

অন্যদিকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী ‘ফুল বিজু’র পরপরই তরুণীরা নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। বয়স্কদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। ফুল ভাসানোর পর বয়স্কদের স্নান করানো হয়। বয়স্কদের শরীরে পানি ঢেলে তাদের আশীর্বাদ কামনা করেন তরুণ-তরুণীরা। দেওয়া হয় নতুন পোষাক।

কাল (৩০ চৈত্র) চৈত্রের শেষ দিনে শুরু হবে মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচন রান্না করা হয়। বহু প্রকার সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করা হয়। পাহাড়িদের বিশ্বাস, এই পাঁচন খেলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া একদিনে সাত পরিবারে এই পাঁচন খেলে সর্বরোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। বিজুর দিনে পাহাড়িদের বাসায় পাহাড়ি-বাঙালি সবাই যায়। এদিন ফুটে ওঠে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। তবে এবছর সরকারিভাবে উৎসব পালন না করলেও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার কারণে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই এইসব ছোটছোট আয়োজন করছেন।

অন্যদিকে সাংগ্রাইয়ে একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের সকল দুঃখ, অবসাদ দুর করে নতুন বছরে শুদ্ধ মননে জীবন শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পার্বত্যাঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী। প্রতিবছরই বাংলাদেশ মারমা সংস্কৃতি সংস্থার(মাসস) এর আয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে পানি খেলা বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। তবে এবছরও করোনা ভাইরাসের কারণে পানি খেলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

এছাড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে বৈসাবি’র আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আসছে। বৈসাবি’তে গ্রামীণ বাংলার বিভিন্ন খেলাসহ পাহাড়ি ঐতিহ্যগত বিভিন্ন খেলা যেমন-ঘিলা খেলা, তুম্রু খেলা প্রভৃতির খেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া ফুলবিজুতে রাতের আকাশে পানুস বাতির ঝলক দেখা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। বৈসুকের ‘বৈ’ সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ ও বিজু, বিষু ও বিহুর ‘বি’ নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামে পালন করা হয়। পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে উৎসবে একীভূত করার জন্য এই সংক্ষিপ্ত নামটি প্রচলন করা হয়।

প্রতিবছর এই সময়ে অজস্র অনুষ্ঠান,মেলা,সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নানা আয়োজনে মুখর থাকা পাহাড় এবার প্রাণহীন। মৃত্যুর ভয়ে সারাবিশ্বের মানুষের মতো পার্বত্য জনপদের মানুষও ঘরবন্দী। তবুও মন খারাপ করা বিষন্ন এই দিনে সবার প্রত্যাশা,আসছে বছর করোনামুক্ত পৃথিবীতে বিপুল উদ্যোমে ফের পালিত হবে মহা সাড়ম্ভরে পাহাড়ের প্রাণের উৎসব ‘বৈসাবি’।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button
Close