বান্দরবানব্রেকিংলিড

পাথর উত্তোলনের মহোৎসব

ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বান্দরবানের রুমায় প্রাকৃতিক সম্পদ পাথর উত্তোলনের মহোৎসবে মেতেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা উজ্জল ধর। স্থানীয়দের কাছে পাথর খেকু নামে পরিচিত উজ্জল ধর রুমা উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি এবং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি। রুমা উপজেলা বাজারে একটি সোনার দোকানও রয়েছে প্রভাবশালী এ নেতার। অনুমোদন ছাড়া অবৈধ পন্থায় খাল, ঝিরি, ঝর্ণা খোদাই করে প্রাকৃতিক পাথর উত্তোলনের কারণে পানির উৎস স্থলগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ধংস হয়ে যাচ্ছে আশপাশের প্রকৃতিও। শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে রুমা এবং সোনাই-চেমা খাল’কে ঘিরে গড়ে উঠা পাহাড়ী গ্রামগুলোর মানুষেরা।

স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলার রুমা উপজেলার পলি, কোলাদি এবং নাইতিং তিনটি মৌজায় অনুমোদন ছাড়ায় রুমা খাল, সোনাই চেমাখালের আশপাশের ঝিড়িঝর্ণা গুলো থেকে অবাদে প্রাকৃতিক সম্পদ পাথর উত্তোলন করছেন। রুমা খালের ক্যোওয়াইবওয়া পাড়া, পুনর্বাসন পাড়া, নারীকেল পাড়া, ক্যম্বুয়াপাড়া চারটি স্থানে এবং সোনাইখালের ৩টি স্থানে দু’শতাধিক শ্রমিক দিয়ে পনেরদিন ধরে পাথর উত্তোলন করছেন। খালের পাড়ে বাঁশের বেড়া এবং পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে শ্রমিকদের থাকার ঘরও। শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক। যদিও শ্রমিকদের পরিচালনাকারী মাঝিরা দাবি করছে তারা (শ্রমিকরা) কক্সবাজারের চকরিয়া এবং মহেশখালীর বাসিন্দার। এদিকে অবৈধ পন্থায় উত্তোলন করা পাথর পরিবহণের জন্য বুলডোজার দিয়ে পাহাড় কেটে চার কিলোমিটার রাস্তাও তৈরি করা হচ্ছে।

বুলড্রোজার চালক মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, রুমা খাল থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য বুলড্রোজার দিয়ে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। বুলড্রোজারের তেল’সহ আনুসাঙ্গিক সব খরচ ব্যবসায়ীদের। আমি শুধু ঘন্টায় ১৫শ টাকা চুক্তিতে চার কিলোমিটার রাস্তা তৈরির কাজটি নিয়েছি।

রুমা খালের পুনর্বাসন পাড়ার বাসিন্দার খ্যাইসামং মারমা অভিযোগ করে বলেন, আমাকে না জানিয়ে উজ্জল বাবু আমার জায়গা থেকে শ্রমিক লাগিয়ে পাথর উত্তোলন করছে। আমার সঙ্গে কোনো কথাও বলেনি, নিষেধ করার পরও তারা শুনছেনা। আমি কোথায় গেলে বিচার পাব জানিনা।

উজ্জল ধরের নিয়োজিত পাথর শ্রমিকদের মাঝি তপন দাশ ও মো: কাসেম বলেন, চার-পাঁচটি ভাগে বিভক্ত হয়ে শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন এবং স্তুপ করে রাখার কাজ করছে। দেড় শতাধিকেরও বেশি শ্রমিক এখানে ১৫ দিন ধরে কাজ পাথর সংগ্রহের কাজ করছে। প্রতি ঘনফুট ১০ টাকা হিসেবে পাথর উত্তোলন করে স্তুপ করা হচ্ছে। রুমা খাল থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার ঘনফুট পাথর উত্তোলন করা হবে।

বোমাং সার্কেলের ৩৫৬ নং পলি মৌজা হেডম্যান চিংসাঅং মারমা অভিযোগ করে জানান, ব্যবসায়ী উজ্জল ধর আমার নাম ব্যবহার করে অনুমোদন ছাড়ায় রুমা খাল থেকে প্রাকৃতিক পাথর উত্তোলনে করছে। পাথর উত্তোলনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় মৌজা প্রধানের দায়িত্ব থেকেও আমি কিছুই করতে পারছিনা। তবে মৌজা প্রধান হিসেবে আমি পাথর উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি।

রুমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শৈমং মারমা জানান, পাথর উত্তোলন এবং পরিবেশ ধংসের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষেরাই জড়িত। উজ্জল ধর অর্থের লোভ দেখিয়ে স্থানীয় পাহাড়ীদের ব্যবহার করছে পাথর উত্তোলনে। পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারেনা। রুমা এবং চেমা খাল ঘিরেই অনেকগুলো পাহাড়ী গ্রামে গড়ে উঠেছে। যুগযুগ ধরে পাহাড়ী গ্রামগুলোতে বসবাস করে আসছে মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম জনগোষ্ঠীরা। কিন্তু পাথর উত্তোলনের দ্রুত নীতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্রামগুলোতে। পাথর উত্তোলনের ফলে খাল এবং ঝিরি ঝর্নাগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের মানুষ ঝিরি-ঝর্ণা আর খালের পানি পান করে জীবন বাঁচায় এবং চাষাবাদ করে শষ্য উৎপাদন করে। কিন্তু পাথর না থাকলে পানির সংকটে জীবন বিপন্ন হতে পারে। আমরা উদ্বিগ্ন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছে নিরীহ বাসিন্দারাও। কিন্তু আমরা অপারগ, চোখে দেখেও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছিনা।

এদিকে অনুমোদন ছাড়ায় অবৈধ পন্থায় পাথর উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি উজ্জল ধর বলেন, আমি একা নয়। আরো অনেকে পাথর উত্তোলন করছে। বাঙ্গালী হওয়ায় আমার নামটি বেশি শোনা যাচ্ছে। সড়ক উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য রুমা এবং চেমা খাল থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। অনুমোদন কারোর নেই।

রুমা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা থানছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, পাথর উত্তোলন শাস্তিমূলক অপরাধ। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। পাথর উত্তোলনকারীদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে অনেক তথ্যই আমার অজানা। পাথর উত্তোলনকারী অসাধু ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, ঝিরি ঝর্ণা থেকে পাথর উত্তোলনের কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি। অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। রুমায় পাথর উত্তোলন কাজে নিয়োজিত ৯ শ্রমিককে আটক করে কারাদ- দেয়া হয়েছে। তবে উন্নয়ন কাজের স্বার্থে কিছু পাথর উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × two =

Back to top button