parbatyachattagram

নৌকায় ফিরছে পাহাড়ী ভোট

‘পাহাড়ীরা আওয়ামীলীগকে পছন্দ করেনা কিংবা ভালোবাসেনা, প্রত্যাখ্যান করেছে’-এমন অপপ্রচারকে পেছনে ফেলে এবার বিপুল সংখ্যক পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ভোটার নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন,হুমকি বা চাপ নয়,বাস্তব অসংখ্য কারণেই এবার নৌকা প্রতীক ও দীপংকর তালুকদারকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। বিপুল সংখ্যক বাঙালী ভোটারদের ভোটের পাশাপাশি এবার চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা,তঙ্গচঙ্গ্যা,পাংখোরা নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামীলীগের প্রার্থীর বিজয়ে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভোটের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাহাড়ীদের ভোট মাঝখানে কমে যায়। এর জন্য আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক দলগুলোর ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সশস্ত্র রাজনীতিকে দায়ি করা হলেও,জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়ে থাকে,চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং জুম্ম স্বার্থবিরোধী কাজ করায় দীপংকরকে ভোট দেয়না পাহাড়ীরা। তবে ভোটের হিসাব বলছে, মাঝের দুটি নির্বাচন বাদ দিলে অতীতের মতো এবারের নির্বাচনেও বিপুল সংখ্যক পাহাড়ীর ভোট পড়েছে নৌকায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৩ টি কেন্দ্রে ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৯ ভোট পেয়ে ১ লক্ষ ৮ হাজার ৩৬ ভোট পাওয়া জনসংহতি সমিতির স্বতন্ত্র প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারকে ৫১ হাজার ২৫৩ ভোটে পরাজিত করেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আকস্মিক পরাজয়ে হতবিহ্বল দীপংকর টানা পাঁচ বছর মাঠে পড়েছিলেন নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে। তারই ফল পেলেন হাতেনাতে এবারের নির্বাচনে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষন করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেকোন কারণেই হোক পাহাড়ীদের ভোট তেমন একটা পাননি দীপংকর। বিশেষত চাকমা জনগোষ্ঠির ভোট। ধারণা করা হয়,আঞ্চলিক দলগুলোর অব্যাহত প্রচার,অপপ্রচারের প্রভাবেই কমেছে দীপংকরের ভোট। যদিও আওয়ামীলীগের দাবি,অপপ্রচার ও হুমকির কারণেই সাধারন পাহাড়ীরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি,সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা জোর করে ভোট কেড়ে নিয়েছিলো। পাশাপাশি সশস্ত্র হামলা ও হুমকি দিয়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদেও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এলাকাছাড়া করা হয়। অনেক নেতাকর্মীই নির্বাচনে মাঠে কাজ করতে পারেননি। তাই দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত হতে হয়। তবে এবার পরিস্থিতি ছিলো ভিন্ন। আঞ্চলিক দলগুলোর অব্যাহত হুমকি,ভয়ভীতি ও চাপকে উপেক্ষা করে এবার মাঠেই ছিলেন আওয়ামীলীগ ও সহযোগি সংগঠনগুলোর পাহাড়ী নেতাকর্মীরা। একই সাথে আইনশৃংখলাবাহিনীও রাখে দৃঢ় অবস্থান। ফলে আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র কর্মীরাও নির্বাচনে খুব একটা নড়াচড়া করতে পারেনি। এরই ফল পেয়েছে আওয়ামীলীগ।

নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে,২০১৪ সালের নির্বাচনে জুড়াছড়ি উপজেলায় আওয়ামীলীগ ভোট পেয়েছিলো মাত্র ২৯৯ টি। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর ওই উপজেলা থেকে তরুন নেতা জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমাকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য করা হয়। তরুণ এই নেতা ওই উপজেলায় আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন। ফলে সেখানে একটা বলার মতো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে আওয়ামীলীগ। কিন্তু সেই উত্থানে ভীত জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে শুরু হয় ওই উপজেলায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নেতাকর্মীদের উপর হামলা শুরু করে ২০১৭ সালের শুরুতেই। এইসময় নিহত হয় আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা,আহত হয় অনেকেই। দল ছাড়তে বাধ্য করা হয় অসংখ্য নেতাকর্মীকে। কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন জ্ঞানেন্দু চাকমাসহ দলটির নেতাকর্মীরা। ফলে যেখানে ২৯৯ ভোটও না পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো সেখানে এবার ১৮৮৭ ভোট পায় দলটি। অথচ প্রবল চাপে থাকা এই উপজেলা আওয়ামীলীগের টার্গেটই ছিলো জনসংহতির এই ঘাঁটি থেকে ১ হাজার ভোট। সেখানে আরো সাড়ে আটশ ভোট বেশি পাওয়ায় খুশি দলটির নেতাকর্মীরা।
জুড়াছড়ি উপজেলা থেকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা বলেছেন, এইবার জুরাছড়ি উপজেলায় আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাস,চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে। হুমকি ভয় না থাকলে এই ভোট আরো অনেক বেশি বাড়ত। মানুষ নিপিড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে।
জনসংহতি সমিতির আরেক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বরকল উপজেলায়ও এবার ভোট বিপ্লব হয়েছে নৌকার পক্ষে। আওয়ামীলীগের দুই প্রভাবশালী নেতা সন্তোষ চাকমা ও সবীর কুমার চাকমার নেতৃত্বে এই উপজেলায় বেশ সংঘবদ্ধ প্রচার চালায় দলটি। আর এর সুফলও পায় দলটি। ফলে এই উপজেলায় বেশ ভালো ভোট পেলো আওয়ামীলীগ। এবার এই উপজেলায় ঊষাতনের ১৭ হাজার ৩৫০ এর বিপরীতে নৌকার ভোট ছিলো ৬ হাজার ৯৪১। এই ভোটে খুশি আওয়ামীলীগ।
বরকল উপজেলা থেকে মনোনীত জেলা পরিষদ সদস্য সবীর কুমার চাকমা বলেছেন, ২০১৪ সালে নৌকা প্রতীকে ভোট না দেয়ার কারণে এই জেলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হয়েছে এবং পাহাড়ীরা যে আশায় তাদের নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছিলো,তার কিছুই করতে পারেনি তাদের সেই প্রতিনিধি। ফলে এবার আর মানুষ ভুল করেনি। তারা সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে এবং তারা বুঝতে পেরেছে জননেতা দীপংকর তালুকদার ছাড়া এই জেলার মানুষের সুখ দুঃখ অন্য কেউ এইভাবে বোঝেনা।

রাঙামাটি পৌর এলাকার বাইরে পাহাড়ী অধ্যুষিত ছয় ইউনিয়নেও এবার মোটামুটি ভালো ভোট পেয়েছে আওয়ামীলীগ। এইসব স্থানে প্রায় আড়াইহাজার ভোট পায় দলটি। এই ভোটও বেশ সন্তোষজনক মনে করে সদর আওয়ামীলীগের নেতারা। সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সজল চাকমা চম্পা বলেছেন, আঞ্চলিক দলগুলোর হুমকি ভয় ভীতি উপেক্ষা করে পাহাড়ীরা আবারো নৌকাকে ভোট দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে জাতীয় রাজনীতির ¯্রােতধারায় অংশ নেয়ার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের মূল¯্রােতে সম্পৃক্ত হতে হবে। তারা বুঝে গেছে,পাহাড়ী বাঙালি ঐক্যের প্রতীক জননেতা দীপংকর তালুকদারই একমাত্র নেতা এই জেলায়,যার মধ্যে সব জাতি ধর্মের মানুষ সুখে শান্তিতে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে বসবাস করতে পারবে।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও লেখক অভয় প্রকাশ চাকমা বলেছেন,পাহাড়ীরা গতবারের ভুল এবার অনুধাবন করে নৌকা প্রতীককে ভোট দিয়েছে। গতবার রাঙামাটি থেকে নৌকা বিজয়ী না হওয়ায় রাঙামাটি উন্নয়নবঞ্চিত ছিলো। এবার সেই ভোট অনেক বেড়েছে। আঞ্চলিক দলগুলোর হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত না থাকলে এই ভোট আরো বাড়তো।’

রাঙামাটির সবচে বড় এবং বেশি ভোটার এলাকা বাঘাইছড়ি উপজেলা। এই খানে এবার রেকর্ড পরিমাণ ভোট পেয়েছে নৌকা। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমার অসাধারণ নেতৃত্ব ও পরিশ্রম আর জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র নেতা সুদর্শন চাকমা ও তার কর্মীবাহিনীর প্রচেষ্টায় এই উপজেলায় ২৪ হাজার ৪৬৪ ভোট পায় নৌকা। বিপরীতে বেশ শক্ত সাংগঠনিক ভীত থাকা সত্ত্বেও এই উপজেলায় নৌকার কাছে পরাজিত হয় সিংহ। এখানে সিংহের প্রাপ্ত ভোট ছিলো ২২ হাজার ৮৩০।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেছেন,গতবারের মতো এবার আঞ্চলিক দলগুলো ভোটকেন্দ্র দখল করতে পারেনি। আইনশৃংখলাবাহিনী তৎপর থাকায় এবার ভোট সুন্দর হয়েছে। জেএসএস যখন বুঝতে পেরেছে ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম করা যাবেনা,তারা এলাকায় এলাকায় গিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে ফোর্স করেছে । ভোটাররা কেন্দ্রে এসে অনেকদিন পর তাদের পছন্দের প্রতীক নৌকায় ভোট দিয়েছে। আমার বিশ^াস, চাপ ও ভয়ভীতি না থাকলে নৌকা আরো অনেক বেশি ভোট পেতো।’

শুধু জুড়াছড়ি,বরকল,বাঘাইছড়ি’ই নয় পাহাড়ী ভোটার অধ্যুষিত বিলাইছড়িতে ৫ হাজার ১৬০ ভোট,নানিয়ারচরে ৬ হাজার ৫৫৬ ভোট নৌকার বিজয়ের পালে হাওয়া লাগিয়েছে। সেই সাথে ছিলো কাপ্তাই,কাউখালী আর অবশ্যই লংগদু উপজেলার ব্যাপক ভোট বিপ্লব। তবে আওয়ামীলীগের নেতারাও বেশ স্বস্তিতে যে,তাদের বিরুদ্ধে গত কয়েকবছর ধরে পাহাড়ীরা নৌকাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এমন অপপ্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারায়।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর বলেছেন, ১৯৯১,১৯৯৬ সালের ভোটের ফলাফল দেখলেই বুঝবেন পাহাড়ী বাঙালী সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা দীপংকর তালুকদার। কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাস এবং ভোট ডাকাতির কারণে সাধারন পাহাড়ীরা ভোটও দিতে পারছিলো না। এবার আইনশৃংখলা বাহিনীর শক্ত পদক্ষেপের কারণে মানুষ যখনই ভোট দিকে পেরেছে,তখন তারা ঠিকই প্রিয় প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে আওয়ামীলীগ ও দীপংকর তালুকদারের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক দলগুলোর অপপ্রচার,মিথ্যাচার ও অপবাদগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেছে। তিনি পাহাড়ী-বাঙালি ঐক্যের প্রতীক,অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক,সেটাই আবার প্রমাণিত হয়েছে। ’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটি যুব রেড ক্রিসেন্ট’র সহশিক্ষা কার্যক্রমের  প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

যুব রেড ক্রিসেন্ট রাঙামাটি ইউনিট’র সহশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় দুইদিন ব্যাপী রেড ক্রস/ রেড ক্রিসেন্ট মৌলিক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen − nine =